সংগ্রামী চেতনার এক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক

সোমবার, ৬ মে ২০১৯

নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রথম শহীদ প্রীতিলতা দেশপ্রেম ও সাহসিকাতার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে গেছেন তা এক অমর উপাখ্যান। ছোটবেলা থেকেই দেশের ভয়ঙ্কর বন্দিদশা তার মনে প্রচণ্ডভাবে রেখাপাত করে। ওই বয়সেই বিল্পবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তার কৌত‚হল বাড়ে। তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে এই কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়ার জন্য খোঁজ খবর শুরু করেন। সহায়তা করেন এক শিক্ষয়িত্রী যিনি বিপ্লবীদের সাহস ও ত্যাগ আদর্শ সম্পর্কে সাবলীলভাবে আলোচনা করতেন যা গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল প্রীতিলতার মনে। আর এক বিপ্লবী গুরু ছিলেন তার নিজের বড় ভাই। এই দাদা ছিলেন বিল্পবী মাস্টারদা সূর্য সেনের গোপন দলের সদস্য। তিনি গোপনে নিষিদ্ধ বিপ্লবী বই লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি আনতেন। সেই বই পড়তেন প্রীতিলতা। এভাবেই নিজেকে তৈরি করেন তিনি সংগোপনে। হয়ে ওঠেন ক্রমান্বয়ে এক মহান বিপ্লবী।

– দিল মনোয়ারা মনু

ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণের অধ্যায়টি অত্যন্ত উজ্জ্বল। আর এই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ে যে ক’জন নারী অংশ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যে উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। একজন সংবেদনশীল নারী এবং সারাজীবন স্বদেশিদের প্রতি যার ছিল গভীর শ্রদ্ধা সেই আত্মসচেতনশীল নারী প্রতিভা বসু ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের সুযোগ্য মা। যিনি নিজের দেশের বন্ধন মুক্তির আন্দোলনে প্রথম শহীদ হিসেবে অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। প্রথম শহীদ কন্যা হিসেবে আজ সম্মান, শ্রদ্ধার শীর্ষে। এই অমিততেজি যোদ্ধা প্রীতিলতা ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলাঘাট গ্রামে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন যেন এক উজ্জ্বল আলোক বর্তিকা হাতে। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম পৌরসভার হেড কেরানি। নাম জগবন্ধু ওয়াদ্দাদার।

প্রীতিলতা ছোটবেলা থেকেই এত মেধাবী, প্রগতিশীল অসাম্প্রাদায়িক চিন্তা-চেতনার অধিকারী ছিলেন যে ওই বয়সেই তিনি স্কুলের পরীক্ষার খাতায় জীবনের লক্ষ্য হিসেবে লিখেছিলেন, মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো ও তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য তিনি তার নিজের জীবন উৎসর্গ করে দেবেন। যে স্কুলে তার শিক্ষা জীবন শুরু সেই খাস্তগীর স্কুলের শিক্ষকেরা সেদিন শুধু বিস্মিত নয়, হতবাকও হয়েছিলেন। সেই সঙ্গে আনন্দ, গর্ব তাদের আশাবাদী করে তুলেছিল।

ছোটবেলা থেকেই দেশের ভয়ঙ্কর বন্দিদশা তার মনে প্রচণ্ডভাবে রেখাপাত করে। ওই বয়সেই বিল্পবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তার কৌত‚হল বাড়ে। তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে এই কর্মকাণ্ড সম্পর্কে ওয়াকেবহাল হওয়ার জন্য খোঁজ খবর শুরু করেন। সহায়তা করেন এক শিক্ষয়িত্রী যিনি বিপ্লবীদের সাহস ও ত্যাগ আদর্শ সম্পর্কে সাবলীলভাবে আলোচনা করতেন যা গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল প্রীতিলতার মনে। আর এক বিপ্লবী গুরু ছিলেন তার নিজের বড় ভাই। এই দাদা ছিলেন বিল্পবী মাস্টারদা সূর্য সেনের গোপন দলের সদস্য। তিনি গোপনে নিষিদ্ধ বিপ্লবী বই লুকিয়ে লুকিয়ে বাড়ি আনতেন। সেই বই পড়তেন প্রীতিলতা। এভাবেই নিজেকে তৈরি করেন তিনি সংগোপনে। হয়ে ওঠেন ক্রমান্বয়ে এক মহান বিপ্লবী।

শুরুতেই যখন এই দলে অন্তর্ভুক্ত হবার ইচ্ছা বড় ভাইয়ের কাছে ব্যক্ত করেন। বড় ভাইয়ের কাছ থেকেই প্রথম আপত্তি আসে, এর কারণ সামাজিক বাধানিষেধ। বিপ্লবী দলে মেয়েদের সদস্য হওয়ার তখন নিয়ম ছিল না। সেখানে অবিবাহিত মেয়েদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। তখন মেয়েরা সবেমাত্র লেখাপড়া শুরু করেছে তাও আবার প্রাইমারি পর্যন্ত। সামাজিক বৈরিতার জন্য ১৯২৭ সাল পর্যন্ত এই দলে নারী সদস্য গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। প্রীতিলতা ইতোমধ্যেই পাঠ্য পুস্তকের বাইরে আধুনিক প্রগতিশীল এবং বিল্পবী ধরণা প্রসূত শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করে তোলেন। যুক্তি-তর্ক এবং প্রবল ইচ্ছার কারণে এক সময়ে তিনি বিপ্লবী ভাইয়ের টনক নড়াতে সমর্থ হন।

বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সেই সময়ে তার মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে ক্ষুধিরাম, বাঘা যতীন, কানাইলাল এবং আমার দেশ নামক চারখানি উল্লেখযোগ্য বই।

১৯২৪ সালে বেঙ্গল অর্ডিনেন্সের অধীনে যখন বিপ্লবীদের ধরা শুরু হয়। তখন প্রীতিলতার বিপ্লবী দাদা তাদের বিপ্লবী বইগুলো তার কাছে লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। এই সুযোগে এই বইগুলো পড়ে প্রীতিলতা বিপ্লবী চেতনায় নিজেকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ পান। তাদের সাহস ত্যাগ বীরত্ব বিপ্লবী চেতনা এবং দেশ প্রেম তখন তার মধ্যে ব্যাপকভাবে অঙ্কুরিত হয়। দাদার সহযোগিতায় তিনি মাস্টার দা’কে মেয়েদের সদস্য হওয়া দরকার বোঝাতে চেষ্টা করেন। মাস্টার দা সব শুনে বিবেচনা করে শুধু শহরে তার তত্ত্বাবধানে কিছু নারী দলে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। এরা হলেন প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত, সরোজনী পাল ও কুমুদিনী রক্ষিত। একজন মুসলমান মেয়েও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কিন্তু তার নামটি জানা যায়নি। যদি নামটি লেখা থাকতো তবে তার নামও এই ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকতো। এরা হাসিমুখে প্রাণ, ঝুঁকি নিয়ে দিনের পর দিন দেশের জন্য কাজ করেছেন। অর্থ সংগ্রহ থেকে, গোপনে খবর আদান প্রদান, নিষিদ্ধ বই লুকিয়ে রাখাসহ নানা ধরনের বিপ্লব সহযোগী কাজ তখন তারা করেছেন। নির্যাতিত হয়েছেন নানাভাবে কিন্তু সাহস ও উদ্যম কখনো হারাননি। প্রতিজ্ঞায় অটল ও অবিচল থেকে জীবন বাজি রেখে কাজ করেছেন।

১৯২৭ সালে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করে ভর্তি হন ইডেন কলেজে। এই কলেজে পড়ার সময় তার অসাধারণ মেধার পরিচয় পেয়ে কলেজের এক অধ্যাপিকা তাকে ‘দীপালি সংঘের’ সদস্য করে নেন। এই দীপালি সংঘ লীলা রায়ের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা শ্রীসংঘ বিপ্লবী দলের একটি শাখা। দেশে বিপ্লবী আন্দোলনের এই সংঘের ভূমিকা ছিল অনন্য সাধারণ। আইএ পরীক্ষায় ১৯২০ সালে মেয়েদের মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করার পর মায়ের উৎসাহে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন শাস্ত্রে বিএ অনার্স ভর্তি হন। কিন্তু অস্ত্রাগার দখল, জালালাবাদ যুদ্ধ ইত্যাদিতে জড়িয়ে পরার কারণে অনার্স পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। বিএ পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি। বিপ্লবী দলের সদস্য হিসেবে তিনি কলকাতার গোপন কারখানা থেকে বোমার খোল সংগ্রহ করতেন। তাকে সহযোগিতা করতেন কল্পনা দত্ত, সরোজিনী পাল, কুমুদিনী রক্ষিত, রেনুকা রায় ও কল্পনা মুখার্জি। প্রীতিলতা এবং তার সাথীরা মিলে ডা. সুহাসিনী মুখার্জিসহ সম্মিলিতভাবে মহিলাদের নিয়ে একটি দল গঠন করে একটি সফল সম্মেলন সম্পাদন করেন। সম্মেলন শেষে একটি স্বেচ্ছাসেবী দলও গঠন করেন তারা।

চট্টগ্রামে ধলাঘাট সংঘষের পর প্রীতিলতা ও সূর্যসেন আত্মগোপন করেন। কিন্তু ১৯৩০ সালে ২৮ এপ্রিল ইউরোপীয়ান ক্লাবে সশস্ত্র রক্ষী পরিবেষ্টিত হয়ে নৈশ আনন্দ উচ্ছ¡াসে মত্ত তখন বিপ্লবীরা এই ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা নেন। শান্তি চক্রবর্তীর নেতৃত্বে এখানে একটি বিপ্লবীদের শক্ত ঘাঁটি গড়ে তোলেন। এই ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা ও পদ্ধতি আলোচনার জন্য একটি সভাও ডাকেন। সেখানে ছদ্দবেশে প্রীতিলতা এবং কল্পনা দত্ত উপস্থিত থাকেন। কল্পনা দত্ত পাহাড়তলীতে ধরা পড়ে যান। পরবর্তী সময়ে প্রীতিলতার নেতৃত্বে ২৩ সদস্যবিশিষ্ট তৈরি দল কাটলী সমুদ্র সৈকতে বোমা ছোড়া এবং বন্দুকের গুলি লক্ষ্যস্থির করার অনুশীলন গ্রহণ করেন।

২৩ সেপ্টেম্বর প্রীতিলতা ও তার সাথীরা মাস্টারদার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অপারেশনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। তারা অস্ত্রগার লুণ্ঠনের সময় লুণ্ঠিত রাইফেল, রিভলবার, বোমা, ভেজালী নিয়ে কাছাকাছি একটি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে থাকেন। তারা যখন ক্লাব আক্রমণ করতে যান তখন সেখানে বলড্যান্স চলছিল। দরজায় ছিল কঠোর পাহারাদারীর ব্যবস্থা। আকস্মিক আক্রমণের হতভম্ব হয়ে তরুণ একজন ইংরেজ কাচের বোতল বিপ্লবীদের উদ্দেশ্যে ছুড়ে মারার সময় প্রীতিলতার অব্যর্থ গুলিতে সে মৃত্যুবরণ করে। পাগড়ি মাথায় সামরিক পোশাক পরিহিত প্রীতিলতা বিপ্লবী সাথীদের পেছনে ফেলে রেলের সড়কে যেয়ে ওঠেন। এমন সময়ে নালার মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক ইংরেজ যুবকের ছোড়া গুলি পেছন থেকে একাকী প্রীতিলতার বুকে এসে লাগে। রক্তক্ষরণ শুরু হয়। তিনি তার কর্তব্য নির্ধারণ করে ফেলেন সঙ্গে সঙ্গে। পোশাকের পকেট থেকে পটাশিয়াম সায়নাইড বিষের পুড়িয়া মুখে ঢেলে দেন। বিপ্লবীদের প্রতি নির্দেশনা ছিল কোনোভাবেই শত্রুর হাতে ধরা দেয়া চলবে না। শত্রুর হাতে ধরা দেয়ার চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। তৎকালীন সপ্তাহিক ইংলিশম্যান পত্রিকার সূত্রে জানা যায়, এই অভিযানে প্রীতিলতাসহ মোট ২৩ জন নারী পুরুষ হতাহত হয়েছিলেন।

নারী মুক্তি আন্দোলনের প্রথম শহীদ প্রীতিলতা দেশপ্রেম ও সাহসিকাতার যে দৃষ্টান্ত তৈরি করে গেছেন তা এক অমর উপাখ্যান। সাহস ও প্রেরণার উৎস। দেশ প্রেমের জন্য অমূল্য জীবন দিতে হবে জেনেও তিনি নীতি ভ্রষ্ট হননি, হননি আদর্শচ্যুত। সংকল্প থেকেও সরে যাননি কখনো। কঠিন সাধনার মধ্যে দিয়ে তিনি মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে নিজেকে তিলে তিলে তৈরি করেছেন জীবন দিয়ে প্রীতিলতা প্রমাণ করেছেন। বিপ্লবী আন্দোলনে ছেলেরা একা নয় মেয়েদেরও সংগ্রামে একাত্ম হয়ে সাহসের সঙ্গে অংশগ্রহণ করতে হবে। ৫ মে তার জন্মদিন। এই মহান বিপ্লবীকে গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞাতায় স্মরণ করছি। জয়তু প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj