আসা যাওয়ার মাঝে : স্বাক্ষর শওকত

শনিবার, ৪ মে ২০১৯

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশে ভারতীয় অভিনয় শিল্পীদের আনাগোনা শুরু। আলমগীর কবিরের ‘সূর্যকন্যা’ থেকে কলকাতার ললনাদের ঢাকার ছবিতে পদচারণা আরম্ভ। এ ছবিতে মিস ক্যালকাটা জয়শ্রী অভিনয় করেন। ‘সূর্যকন্যা’য় কাজ করতে গিয়েই আলমগীর কবিরের সঙ্গে জয়শ্রীর মন দেয়া-নেয়ার সূচনা। পেশাদার সম্পর্ক থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন আলমগীর-জয়শ্রী। একটা সময় তাদের প্রেম পরিণতি পায় বিয়েতে। ১৯৮৯ সালে আলমগীর কবিরের মৃত্যু পর্যন্ত জয়শ্রীর সঙ্গে তার পেশাগত সম্পর্ক দৃঢ় ছিল। অটুট ছিল আলমগীর-জয়শ্রীর সংসার। আলমগীর চলে যাওয়ার পর জয়শ্রী আর ফিরে যাননি নিজের দেশে। থাকেননি ঢাকার মাটিতেও। তিনি পাড়ি জমান ইউরোপে। লন্ডনে পুত্র লেনিনকে আঁকড়ে ধরে আর শিক্ষকতা করে জয়শ্রী কবির তার পুরনো তারকাজীবনকে এক প্রকার ভুলেই আছেন।

সীমানা পেরিয়ে শুধু জয়শ্রী কবিরই এদেশে আসেননি, গত পাঁচ দশকে অসংখ্য ভারতীয় অভিনয় শিল্পী ও নির্মাতা এদেশে এসেছেন। তারা চুটিয়ে কাজ করেছেন। পেয়েছেন জনপ্রিয়তা। অনেকে হয়েছেন সমালোচিত। অনেকে হয়েছেন বিতর্কিত। আসা-যাওয়া তাই বলে থেমে নেই। কিন্তু কাজের সূত্রে এসে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার ঘটনা হাতেগোনা।

জয়শ্রীর পর সুনেত্রা আশির দশকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন ঢালিউডে। অনেকে জানতেনই না, সুনেত্রার বাড়ি বাংলাদেশে নয়। দর্শকরা সুনেত্রাকে এতটাই আপন করে নিয়েছিলেন। সুনেত্রাও ভালোবেসেছিলেন এদেশকে। বিয়ে করেছিলেন বাংলাদেশি যুবককে। নব্বই দশকের শুরুতে সুনেত্রা ফিরে গিয়েছিলেন তার দেশ ভারতে। মাঝখানে নাকি পাকিস্তানে ছিলেন। আর এখন আছেন কলকাতায়। সুনেত্রা যেখানেই থাকুন, তার আসল জায়গা দর্শকদের হৃদয়। তিনি সেখানে শক্ত ঘাঁটি গেড়েই আছেন।

সিনেমার তারকারা ছাড়াও এদেশে কাজের প্রয়োজনে এসেছেন কলকাতার নির্মাতা-কলাকুশলীরাও। তাদেরই একজন রিঙ্গো। ছোটপর্দার জন্য তিনি কাজ করেছেন। কাজ করেছেন বিজ্ঞাপনচিত্রেও। নব্বই দশকের শেষের দিকে তিনি ঢাকায় আসেন। এ সময় ঢাকার শীর্ষ টিভি অভিনেত্রী শমী কায়সারের প্রডাকশন হাউসে কাজ করেন রিঙ্গো। কাজ করতে করতে দুজনে প্রেমে পড়েন। এই প্রেম বিয়েতে রূপ নেয়। সীমান্তের কাঁটাতার জয় করে দুজনের মিলন একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করে। কিন্তু খুব বেশিদিন শমী-রিঙ্গোর বিয়ে টেকেনি। যতখানি ঝড়-ঝাপটা সামলে পরিণতি পেয়েছিল শমী-রিঙ্গোর প্রেম, ততখানি মান রাখতে পারেনি এই প্রেম, সংসার ভেঙে যায় অকালে।

কাজের প্রয়োজনে একটা সময় কলকাতার তারকারা ঢাকায় আসতেন। তাদের চাহিদা ছিল বেশ। সেই চিত্র এখন কিছুটা উল্টোও। ঢাকার শিল্পীরাও কলকাতায় ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন। দুদিক থেকেই আসা-যাওয়া বেড়েছে। এর ফলে শুধু সাংস্কৃতিক সম্পর্কই নতুন মোড় নিচ্ছে না, দুপ্রান্তের মানুষদের হৃদয়ঘটিত সম্পর্কও নতুন পলি পেয়ে উর্বর হচ্ছে।

আরিফিন শুভর স্ত্রী অর্পিতা সমাদ্দার যদিও নায়িকা, গায়িকা, নির্দেশিকা কোনোটাই নন। তারপরও অর্পিতা জয় করেছেন শুভর মন। ফ্যাশন ডিজাইনার অর্পিতার সঙ্গে চিত্রনায়িকা শুভর বিয়ে হয় ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিয়ের আগে খুব বেশিদিনের প্রেম-পরিচয় ছিল না দুজনের। অল্পসময়েই বিয়ের সিদ্ধান্তে পৌঁছান তারা। বিয়ের পর শুভর বরাত খুলে যায়। তিনি ঢাকার মতো কলকাতায়ও অভিনয়ের প্রস্তাব পান। যৌথ প্রযোজনা ছাড়াও কলকাতার স্থানীয় ছবিতে অভিনয় করেন শুভ। যদিও শুভ তার বিবাহিত জীবনকে ভক্ত-দর্শকদের চোখের আড়ালেই রেখেছেন। বিবাহিত নায়কের তকমাটি তাকে যেন কোনোভাবে পীড়িত করতে না পারে তার জন্যই শুভর সার্বক্ষণিক সতর্কতা। ফলে শুভ-অর্পিতার প্রেম সম্পর্কে বেশি কিছু জানা যায় না।

আরিফিন শুভ ও শাকিব খান কলকাতায় শক্ত জমির ওপর দাঁড়াতে চাইছেন। তাদের আসা-যাওয়া বেড়েছে ওপারে। শাকিব খানের সঙ্গে অপু বিশ^াসের বিচ্ছেদের পরপরই টালিগঞ্জের শ্রাবন্তী চ্যাটার্জিও সঙ্গে নায়কের প্রেমের গুঞ্জন ওঠে। এই গুঞ্জনকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে সম্প্রতি শ্রাবন্তী বিয়ের পিঁড়িতে বসে গেলেন। শুভ-শাকিবদের মতো জয়া আহসান, মিথিলারাও মিডিয়ার নজরদারিতে আছেন এখন।

মডেল ফয়সাল আহসানের সঙ্গে বিচ্ছেদের পর জয়া আহসান এখন পাত্রী হিসেবে দুই বাংলায় সবচেয়ে আকর্ষণীয়া। ওপারে একের পর এক প্রশংসিত ছবিতে অভিনয় করে জয়া আছেন সবার আগ্রহের তুঙ্গে। কলকাতার নির্মাতা সৃজিত মুখার্জির সঙ্গে তার প্রেমের গুঞ্জনে দীর্ঘদিন কলকাতার মিডিয়া ছিল উত্তপ্ত। যার আঁচ এসে পড়েছিল ঢাকাতেও। জয়ার পাশে সম্প্রতি নাম লিখিয়েছেন গায়ক তাহসান খানের সাবেক স্ত্রী মিথিলা। তিনিও পাড়ি দিয়েছেন কলকাতায়। শর্টফিল্ম, মিউজিক ভিডিও শেষে হয়তো ফিচার ফিল্মে শেষ হবে তার সফর। এই সফরে তিনি পাশে পেয়েছেন সৃজিত মুখার্জিকে। সৃজিত-মিথিলা প্রকাশ্যে স্বীকার না করলেও কলকাতার মিডিয়া তাদের সম্পর্কের ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত। আগামী বছরই সৃজিত বিয়ে করবেন মিথিলাকে, এ খবর মিডিয়া চেপে রাখেনি। জয়ার পর মিথিলা, শেষ পর্যন্ত কোন ঢাকাই রমণীর গলায় মালা দেন সৃজিত সেটাই এখন দেখার।

বেড়ে গেছে যৌথ প্রযোজনায় ছবির নির্মাণ। দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে নাটক, ওয়েব সিরিজ, রিয়েলিটি শো, হচ্ছে অনেক কিছুই। শিল্পীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। কাজের বাইরেও তাদের মধ্যে সম্পর্ক তীব্র হচ্ছে। সব সম্পর্ক হয়তো পরিণতি পাচ্ছে না। যখনই সম্পর্ক পরিণতি পাচ্ছে, তা হচ্ছে বড় খবর। ইতিহাস বলছে, সম্পর্কের লেনদেন ঢাকা-কলকাতার জন্য কোনো নতুন ঘটনা নয়। এটা ছিল, আছে, থাকবে।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj