প্রীতিলতা বিশ্বের মহৎ মানুষদের একজন

শুক্রবার, ৩ মে ২০১৯

ড. অনুপম সেন

আমার জন্ম ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের ৫ আগস্ট। জন্মস্থান চট্টগ্রাম শহরের আইস ফ্যাক্টরি রোডের একটি একতলা পাকা ভবনে। আমার বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম আদালতের একজন আইনজীবী। তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন, পরে আইন পেশায় বিএল ডিগ্রি অর্জন করেন। আমার মাও সে সময়কার মেয়েদের প্রসিদ্ধ বেথুন স্কুলে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়েছিলেন। তার ইংরেজি, বাংলা দুভাষাতেই হাতের লেখা ছিল অত্যন্ত সুন্দর। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশুনা করার কারণে তিনি ভালো ইংরেজিও বলতে পারতেন।

আমার জন্মের সময় যিনি ধাই মা বা ধাত্রী মার কাজ করেছিলেন, তিনি এমনই একজনের মা ছিলেন, যার কথা ভেবে আজো আমার বুক একই সঙ্গে দুঃখ ও আনন্দে ভরে যায়; তিনি এই উপমহাদেশের জোয়ান অব আর্ক প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার। তিনিই সম্ভবত ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রথম এশীয় নারী, যিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে স্বাধীনতার বেদিমূলে আত্মোৎসর্গ করেছিলেন।

১৯৩০ সালে সংঘটিত হয় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে অংশ নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের ৭২ জন যুবক, তরুণ ও কিশোর। তারা চারদিন চট্টগ্রাম শহরকে ব্রিটিশ মুক্ত রেখেছিলেন। সব ইউরোপীয় চট্টগ্রাম শহর ছেড়ে জাহাজে করে পালিয়ে সমুদ্রবক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। সম্ভবত ব্রিটিশ উপনিবেশের আর কোথাও এ ধরনের অসাধারণ বীরত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেনি। অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর জালালাবাদ যুদ্ধে ব্রিটিশরা আবার জয়ী হয়ে চট্টগ্রামের অধিকার ফিরে পায়। এই যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন অনেকে। তাদের মধ্যে ছিলেন ১৬ বছরের কিশোর টেগরা বল ও প্রভাস বল। জালালাবাদ যুদ্ধে বিপ্লবীদের-বিদ্রোহীদের কমান্ডার হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লোকনাথ বল। আমার শ্বশুর মশাই সুবোধ বল ছিলেন লোকনাথ বল ও প্রভাস বলের ছোট ভাই, টেগরা বলের বড় ভাই। তিনিও জালালাবাদ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর ধরা পড়ে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত জেলে ছিলেন; কিশোর থাকায় তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়নি। ত্রিশের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও জালালাবাদ যুদ্ধের পরে বিপ্লবীরা সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম অব্যাহত রাখে। তারই অংশ হিসেবে ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপীয় ক্লাব আক্রমণ করে বিপ্লবীরা- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে। প্রীতিলতা এই অভিযান শেষে ধরা পড়া এড়ানোর জন্য পটাসিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন। প্রীতিলতা ছিলেন অসাধারণ মেধাবী।

তিনি চট্টগ্রামের অপর্ণাচরণ উচ্চ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। কলকাতার বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজিতে ডিস্টিংশন নিয়ে বিএ পাস করেন। তিনি যদি পার্থিব সুখ অন্বেষণ করতেন, তাহলে হয়তো অনেক কিছুই হতে পারতেন। দেশকে ভালোবেসেছিলেন জীবন দিয়ে, দ্বিধা করেননি জীবন বিলিয়ে দিতে দেশের জন্য। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর ব্রিটিশরা চট্টগ্রামের জনগণের ওপর, বিশেষ করে যুবসমাজের ওপর প্রচণ্ডভাবে ক্ষিপ্ত হয়, সবাইকে কড়া নজরদারিতে রাখে। প্রীতিলতার আত্মোৎসর্গের পর তার পরিবারের প্রায় সব পুরুষকেই ব্রিটিশরা চাকরিচ্যুত করে। প্রীতিলতার বাবা-কাকা-মামা সবাই চাকরিচ্যুত হন। তখন বাঁচার জন্য আর কোনো উপায় না থাকায় প্রীতিলতার মা ধাইয়ের কাজ করে জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হন। তিনি কেবল আমার ধাত্রী-মা ছিলেন তাই নয়, প্রসিদ্ধ সাহিত্যিক আবুল ফজল সাহবের সন্তান, আমার বন্ধু আবুল মনজুরেরও ধাই মা ছিলেন।

প্রীতিলতা ও আমার গ্রাম পটিয়ার ধলঘাট। শহরে তাদের বাসা ছিল আসকার দীঘির দক্ষিণ পাড়ে। অবশ্য ধলঘাট আমাদের জন্মস্থান হওয়ায় প্রীতিলতার পরিবারের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের আসা-যাওয়া ও গভীর আত্মিক সম্পর্ক ছিল। ভাবলে কষ্ট হয় যে, দেশের জন্য আত্মোৎসর্গ করায় প্রীতিলতার পরিবারকে কী বিশাল ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল! প্রীতিলতা বিশ্বের মহৎ মানুষদের একজন, কারণ দেশমাতৃকাকে ভালোবেসে তাদের মতোই তিনি নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিয়েছিলেন।

বীরকন্যা প্রীতিলতার ১০৮তম জন্মদিনে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj