সব প্রজন্মের মানুষ প্রীতিলতার পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে দেখুক

শুক্রবার, ৩ মে ২০১৯

সেলিনা হোসেন

সময়টি ষাটের দশকের মধ্যভাগ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছি। বাংলায় অনার্স ক্লাসের ছাত্রী। যুক্ত হয়ে পড়ি ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে। পড়তে থাকি মার্কস এঙ্গেলসের বই। সঙ্গে দেশের ইতিহাস। সবচেয়ে বেশি টানে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। মাস্টারদা সূর্যসেন, তারও আগে ক্ষুদিরাম। ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে ক্ষুদিরামকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে তার শেষ ইচ্ছে কি। ক্ষুদিরাম হাসিমুখে বলেছিলেন, আমি বোমা বানাতে জানি। আমাকে সুযোগ দিলে আমি তরুণদের বোমা বানানো শেখাতে চাই।

মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে মাত্র আঠারো বছর বয়সী এই বিপ্লবীর এমন সাহসী উচ্চারণে স্তব্ধ হয়ে যাই। বুকের ভেতরে শীতল ¯্রােত বয়ে যায়। ভাবি, দেশের স্বাধীনতার জন্য অনায়াসে জীবন উৎসর্গ কত সহজ। এ সব বিপ্লবী কত সহজে মৃত্যুকে তুচ্ছ করেছেন। আমাদের জীবনেও কি একদিন এমন সময় আসবে, আমাদেরও কি এমন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে? প্রশ্ন করে ক্ষান্ত হতে পারি না। বুকের ভেতর হাজার জিজ্ঞাসা মনকে কুরে খায়।

সে সময়ে গল্প লিখতে শুরু করেছি। তারও আগে কবিতা লেখা শুরু করেছিলাম। কিছু কিছু কবিতা ছাপাও হয়েছিল বিভিন্ন পত্রিকায়। কিন্তু গল্প লেখার পরে মনে হয়েছিল আমি যা লিখতে চাই তা কবিতায় প্রকাশ করতে পারব না। আমার বড় ক্যানভাস চাই। একদিন উপন্যাস লিখব এমন ধারণা মাথায় দানা বাঁধতে থাকে। এক সময় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হয়ে যায়। ততদিনে পড়েছি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অগ্নিগর্ভ চট্টগ্রামের কথা। শুধু কথা বললে কম বলা হবে, ততদিনে বিপ্লবী প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার আমার স্বপ্নের মানুষ হয়ে গেছেন। আমার করোটিতে সহ¯্র নক্ষত্র হয়ে জ্বলজ্বল করেন। মাস্টার্স পরীক্ষা শেষে ঢাকায় আসি। বাংলা একাডেমিতে গবেষণা সহকারী পদে যোগদান করি। এ প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরিতে অজ¯্র বই। কোনটা ছেড়ে কোনটা পড়ি। মাথার মধ্যে হাজার চিন্তা। তখন পর্যন্ত উপন্যাস লিখতে শুরু করিনি। বড় ক্যানভাসে কাজ করার সাহস করতে পারছিলাম না। এর মধ্যে পূর্ণেন্দু দস্তিদারের প্রীতিলতার ওপরে লেখা বইটি হাতে আসে। বারবার সেই বিবৃতিটি পড়ি, যেটি তিনি চট্টগ্রাম ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করতে যাওয়ার আগে লিখে রেখে গিয়েছিলেন।

কি সাহস! দেশের জন্য আত্মদান করার কি দুর্দমনীয় আকাক্সক্ষা। মাথা ঠিক রাখতে পরি না। বারবারই মনে হয় মানুষটাকে আমি কত ভালোবাসি। বিবৃতির নিচে স্বাক্ষর করে তারিখ লিখেছিলেন ২৩ সেপ্টেম্বর, ১৯৩২। এই একই বছরের ৯ ডিসেম্বর উপমহাদেশের আর একজন নারী বেগম রোকেয়া মৃত্যুবরণ করেছিলেন। কিন্তু সত্তর দশকের সূচনায় আজকের দিনের মতো রোকেয়া তত ব্যাপকভাবে আলোচিত হতেন না। বিপ্লবী প্রীতিলতাকে নিয়ে উপন্যাস লিখব এমন একটি চিন্তা মাথার মধ্যে স্থির হয়ে যায়। যদিও দ্বিধা এবং আশঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পারি না।

পড়তে পড়তে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানতে পারি বিপ্লবী রামকৃষ্ণ বিশ্বাস ক্রেইগ হত্যা মামলায় আলীপুর জেলের মৃত্যু কুঠুরিতে আটক ছিলেন। বিপ্লবী রামকৃষ্ণ ও আলীপদকে চাঁদপুর রেলস্টেশনে ক্রেইগকে হত্যার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু অপারেশন সফল না হওয়ায় দুজনেই কুমিল্লায় ধরা পড়েন। বিচারে রামকৃষ্ণের মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল। আর কালীপদের যাবজ্জীবন। হাইকোর্টে আপিল করার সময় প্রীতিলতা আলীপুর জেলে রামকৃষ্ণের সঙ্গে চল্লিশ বার দেখা করেছিলেন। প্রীতিলতা তখন বেথুন কলেজের ছাত্রী ছিলেন। সূর্যসেনের কঠোর নির্দেশ ছিল যে প্রয়োজন ছাড়া একজন বিপ্লবী আর একজন বিপ্লবীর সঙ্গে দেখা করতে পারবে না। কিন্তু প্রীতিলতা সেই নির্দেশ অমান্য করেছিলেন।

আমার প্রশ্ন ছিল, কেন? কেন অমান্য করলেন? কী এমন গভীর টান ছিল সহজে উত্তর খুঁজে পাইনি। দেখলাম অসাধারণ মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও প্রীতিলতা রাম কৃষ্ণের ফাঁসির পরে পড়ালেখায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। অনার্স পরীক্ষা বর্জন করে চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। আমার প্রশ্ন ছিল, কেন? বিপ্লব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তো পরীক্ষা না দেয়ার সম্পর্ক নেই। তাহলে?

সহজে উত্তর খুঁজে পাই না।

চট্টগ্রামে ফিরে এসে মাস্টারদা সূর্যসেনকে প্রীতিলতা প্রত্যক্ষ সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দেয়ার জন্য অনুরোধ করতে থাকেন। মাস্টারদা তার অনুরোধ উপেক্ষা করলেও প্রীতিলতা হাল ছাড়েন না। দিন দিন সরাসরি কার্যক্রমে অংশ নেয়ার জন্য অনমনীয় হয়ে ওঠেন। আমার প্রশ্ন কেন? মাস্টারদা প্রয়োজন এবং সংযোগ বুঝে যে কাউকে অপারেশনে পাঠাবেন। তার জন্য এমন উদগ্রীব হয়ে ওঠা কেন?

সহজে উত্তর খুঁজে পাই না।

চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরে তিনি যখন বিষপানে মৃত্যুবরণ করেন তখন তার সামরিক পোশাকের পকেটে পাওয়া যায় রামকৃষ্ণ বিশ্বাসের ছবি। এবার আমি আমার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাই। আমার বিন্দু বিন্দুু করে গড়ে ওঠা ধারণা দৃঢ় হয়। আমার বিশ্বাস হয় যে রামকৃষ্ণের প্রতি প্রীতিলতার গভীর ভালোবাসা ছিল। তিনি একজন অসাধারণ বিপ্লবীর চেতনা নিজের ভেতরে সমুন্নত রেখে, নারীর প্রেমকে উপেক্ষা করেননি। যথাযথ মর্যাদার নিভৃতে লালন করেছেন। আমি বিশ্বাস করেছি একজন বিপ্লবীর প্রেমে পড়ায় কোনো অগৌরব নেই। তখনই সিদ্ধান্ত নেই যে রামকৃষ্ণ এবং প্রীতিলতার প্রেম বিষয়ে একটি প্রেমের উপন্যাস লিখব।

বিষয়টি নিয়ে একদিন শ্রদ্ধেয় সত্যেন সেনের সঙ্গে আলাপ করি। সত্যেনদা মৃদু হেসে বললেন, পাগল হয়েছ। প্রীতিলতার বিপ্লবী ধার নষ্ট করা চলবে না। এমন ভুতুড়ে চিন্তা মাথায় এল কেন? আমি সত্যেনদার দিকে তাকিয়ে থাকি। জোরে জোরেই বলি, সনেত্যনদা বিপ্লবীরা কি লোহা দিয়ে তৈরি মানুষ? তিনি একই ভঙ্গিতে বললেন, দেখ সমাজে তার একটা ইমেজ তৈরি হয়েছে। তাকে নিয়ে প্রেমের উপন্যাস লিখলে সে ইমেজ ক্ষুণœ হবে।

আমি তর্কের খাতিরে তর্ক করি না। বিশ^াস থেকেই বলি, প্রীতিলতা মানুষ সত্যেনদা। মানুষের হৃদয়ে অবশ্যই ভালোবাসা থাকবে। তিনি আমাকে ধমক দিলেন। আমি চুপ করে যাই। সত্যেনদার সঙ্গে বাড়াবাড়ি ধরনের তর্ক করব এত সাহস আমার ছিল না।

সুতরাং উপন্যাস লেখার চিন্তা আপাতত স্থগিত হয়ে যায়। আমি অন্য উপন্যাস লিখি। কিন্তু প্রীতিলতাকে ভুলিনি। প্রীতিলতা আমার হৃদয়ে, প্রীতিলতা আমার চেতনায়, আমার মগজে জ্বলজ্বল করে। প্রীতিলতা এই দীর্ঘ বছরের নানা সময়ে আমার সঙ্গী হয়েছিলেন। আশির দশকের কোনো এক সময়ে আমি রণেশ দাসগুপ্তকে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি। বলি, রণেশদা আমি কি রামকৃষ্ণ আর প্রীতিলতাকে নিয়ে একটি প্রেমের উপন্যাস লিখব? তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, ভালো করে বল। আমি আমার আবিষ্কারের বিষয়টি রণেশদাকে জানাই। রণেশদা আমার বিবরণ শুনে বললেন, তোমার ধারণায় যদি সত্য থেকেও থাকে তবে তাকে লিখে প্রতিষ্ঠিত করার প্রয়োজন নেই।

আমি আর কথা বাড়াই না। বুঝে যাই এ বিষয়ে লিখলে আমি কারো সমর্থন পাব না। যদি লেখার সাহস করি তবে সমালোচনার ঝুঁকি সহ্য করার সাহস নিয়ে করতে হবে। এ ছাড়া উপায় নেই। তখন সিদ্ধান্ত নেই যে আমি লিখবই। যে যা ভাবে ভাবুক। একজন বিপ্লবীকে সাহিত্যে আনব না কেন? ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে তার সবটুকু অবদান অক্ষুণœ রেখেই কাজটি করব কিছুতেই বড়দের ধমকে পিছিয়ে থাকব না। অনেকদিন অপেক্ষা করেছি। আর করব না।

যেই ভাবা সেই কাজ। আবার উদ্যোগী হয়ে উঠি। প্রীতিলতার লেখা বিবৃতিটি আরো কয়েকবার পড়ি। বারবার মনে হয় যে নারী এমন বিবৃতি লিখে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যেতে চায় তার বুকভরা ভালোবাসা আমার আঁকতেই হবে। আমি সিদ্ধান্ত নেই যে এই ভালোবাসার শিল্পরূপ নির্মাণের এখনই সময়। আমি আর সময় নষ্ট করতে চাই না। যারা আমার বিরোধিতা করবে তাদের চ্যালেঞ্জ করেই লিখতে শুরু করি। সঙ্গে রাখি প্রীতিলতার বিবৃতির কপিটি। আমি অসংখ্যবার বিবৃতিটি পড়ি। পড়তে পড়তে মনে হয় এই বিবৃতি আমার পরবর্তী প্রজন্মকে পড়াতে হবে। তারপরের প্রজন্ম, তারপরের প্রজন্মকেও পড়াতে হবে। কেউ যদি ইতিহাস বা প্রবন্ধ পড়ে নিজের ঐতিহ্যকে জানতে না চায় তাহলে তাকে সাহিত্যের মাধ্যমে পড়াতে হবে। আমি এই চিন্তা থেকে উপন্যাসটি লিখতে আরো উদ্বুদ্ধ হই।

উপন্যাসটি শেষ হয় এভাবে :

‘মর্গে প্রীতিলতার লাশ।

পোস্ট মর্টেমের জন্য মাথার পাগড়ি টান দিয়ে খুলে ফেললে ছড়িয়ে পড়ে ওর দীঘল কেশ- ঘন, কালো, চকচকে। রামকৃষ্ণের ভাষায়, দোয়েলের পুচ্ছের মতো কেশরাজি। পাখা মেলে উড়ে গেলে ওই কেশরাজি ছড়িয়ে যায় নীলিমায়- যে নীলিমা মানুষেরই হৃদয়- যেখানে দোয়েলের চকচকে ঠোঁটে উঠে আসে ভালোবাসার শস্যকণা। যে শস্যকণা পাবার আশায় প্রসারিত হয় কোটি কোটি হাত। রামকৃষ্ণ বলে, প্রীতিলতা আমি তোমার কেশরাজির অরণ্যে আমার টকটকে লাল হৃদয় ফুল করে গুঁজে দিলাম। কখনো খুলে রেখো না সে ফুল। দেখো যেন ঝরেও না যায়।

প্রীতিলতা হাসে। বলে, আমি যদি বৃষ্টি হই তবে তোমার ওই ফুলে অনবরত সিঞ্চিত হবে জল। যতদিন এই পৃথিবী থাকবে- মেঘ থাকবে- ততদিন আমার চুলে তোমার ফুল থাকবে। আমার কেশরাজিতে প্রোথিত তোমার হৃদয় আমরা রেখে যাব অনাগতকালের মানব-মানবীর জন্য, যারা ভালোবাসাকে দ্যুতিময় করবে। আমাদের মতো বলবে, মহাকাল দুদণ্ড থামো। আরো কিছুক্ষণ ভালোবেসে যেতে চাই।

ভালোবাসার অমলিন ¯্রােতধারায় প্রীতিলতাও একজন মানুষ। তিনি যেমন ছিলেন বিপ্লবী, তেমন মানবী। সুখ-দুঃখ-হাসি-আনন্দ-প্রেম-ভালোবাসায় ভরপুর অবিনশ্বর মানুষ। তার হৃদয়কে নিজের কল্পনায় তুলে এনে সবাইকে বলতে চেয়েছি এই মানবীকে আপনারা খণ্ডিত করবেন না। তার সবটুকু নিয়ে তাকে ঋজু হয়ে দাঁড়াতে দিন। সব প্রজন্মের মানুষ প্রীতিলতার পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে দেখুক। একজন লেখকের সাধনায় আগের প্রজন্মের একজন নতুন নির্মাণে নতুন মাত্রায় জেগে উঠুক।’

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj