মশাবাহিত রোগ

শুক্রবার, ৩ মে ২০১৯

ড. মো. জগলুল হায়দার ইকবাল

সমগ্র পৃথিবীতে ৩০০০-এর অধিক প্রজাতির মশার বসবাস। এই মশাদের কোনো কোনো প্রজাতির মশা জীবন বিধ্বংসী রোগ যেমন- ম্যালেরিয়া, ফাইলেরিয়া, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলোফিবার ও এনসেফালাইটিস প্রভৃতির শক্তিশালী বাহক হিসেবে ভূমিকা রাখে। মশার অন্য সদস্যরা মানুষকে দংশন করে যন্ত্রণাদায়ক অস্বস্তিকর অবস্থার সৃষ্টি করে। অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ একটি মশা প্রজাতির নাম এডিস এজিপটাই (অবফবং ধবমুঢ়ঃর), এই মশা দিনের শুরুতে অর্থাৎ সূর্যোদয়ের পর (উষা) ও দিনের শেষে অর্থাৎ সূর্যাস্তের পূর্বে (গোধূলী) মানুষসহ অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের দংশন করে। এডিসের তিনটি প্রজাতিই (অবফবং ধবমুঢ়ঃর, অবফবং ধষনড়ঢ়রপঃঁং অবফবং ঢ়ড়ষুহবংরবহংরং) ডেঙ্গু জ্বরের জন্য দায়ী ভাইরাসের বাহক। তাদের মধ্যে একমাত্র অবফবং ধবমুঢ়ঃর প্রজাতিটি সারা পৃথিবীতে ডেঙ্গু জ্বরের ভাইরাস বিস্তারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অবফবং ধষনড়ঢ়রপঃঁং মশকী (স্ত্রী মশা) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক।

জীবন চক্র : পূর্ণাঙ্গ মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে, অতঃপর ১-২ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে লার্ভা বের হয়। লার্ভা ৪টি দশা অতিবাহিত করার পর পিউপাতে রূপান্তরিত হয়। পিউপা হতে ১-২ দিনের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ মশার জন্ম হয়।

এই মশকী মানুষের বসতির কাছাকাছি এবং প্রায়ই মানুষের বাসগৃহের অভ্যন্তরে ফুলের টব, পানির ড্রাম, এসি ও ফ্রিজের পিছনের জমানো পানিতে ডিম পারে এবং সেখানে পূর্ণাঙ্গ মশার জন্ম হওয়ার কারণে আথ্রোপোডাজাত ভাইরাসের সুদক্ষ বাহক হিসেবে কাজ করে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মারণব্যাধির বিস্তার ঘটায়। এরা গৃহ মশা নামেও পরিচিত।

রোগের সংক্রমণ পদ্ধতি : মশা তার নিজের ডিমের পরিস্ফুটনের জন্য মানুষ বা মেরুদণ্ডী প্রাণীর রক্ত ভক্ষণ জরুরি। যখন মশা ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত কোনো রোগীকে দংশন করে তখন মশা নিজেই উক্ত ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক হয়ে যায়। পরবর্তীতে এই ভাইরাসে আক্রান্ত মশা-ই দংশনের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির দেহে ভাইরাসের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে রোগাক্রান্ত করে। এভাবে একজন থেকে আরেকজনে ভাইরাসের সংক্রমণ এবং রোগের বিস্তার ঘটে। এ ছাড়াও এক দেশ থেকে অন্য দেশে যানবাহনের (বাস, ট্রাক, রেল, বিমান, জাহাজ) মাধ্যমে ভাইরাস আক্রান্ত মশা স্থানান্তরিত হয়ে সুস্থ মানুষকে রোগাক্রান্ত করে থাকে।

ডেঙ্গুজ্বর : ডেঙ্গুজ্বর (ফবহমঁব ভবাবৎ) ভাইরাসজনিত রোগ যা খুবই যন্ত্রণাদায়ক কিন্তু মারণব্যাধি নয়, তবে রক্তক্ষরণসহ ডেঙ্গু জ্বর ১২-২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটাতে পারে। ডেঙ্গু ভাইরাস প্রায়ই মানুষ থেকে মশা ও মশা থেকে মানুষে স্থানান্তরিত হয়। ডেঙ্গু ভাইরাস খুব দ্রুত ছড়ায় এবং রোগ সৃষ্টি করে।

রোগের লক্ষণ

১. উচ্চ মাত্রায় (১০৪-১০৫ক্ক ফা.) জ্বর,

২. অস্থি ও চোখের পিছনে প্রচণ্ড ব্যথা,

৩. মাংশপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, ৪. অসহনীয় মাথা ব্যথা, ৫. ত¦কে লালচে দাগ (র‌্যাশ) দেখা যায়, ৬. তবে রক্তক্ষরণসহ ডেঙ্গু জ¦রে দাঁতের মাড়ি, নাক মুখ ও পায়ু পথে রক্তক্ষরণ হতে পারে।

চিকুনগুনিয়া জ্বর : জ্বর ও অস্থিসন্ধিতে প্রচণ্ড ব্যথার কারণে শরীরের হাড় ভেঙে চুড়মার হওয়ার মতো অবস্থা হয় বলে সম্ভবত এই ধরনের নামকরণ করা হয়েছে। এই রোগটি ১৯৫২ সালে প্রথম আফ্রিকার তানজানিয়ায় নেওয়ালা জেলার সোয়াহিলি গ্রামে মানুষের মধ্যে উদ্ভূত হয়। এশিয়ার মধ্যে থাইল্যান্ডে ১৯৫৮ সালে প্রথম চিকুনগুনিয়ার আবির্ভাব হয়। ক্রমে ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মরিশাস ও মাদাগাস্কার দ্বীপেও রোগের বিস্তার ঘটছে। ২০১৩ সালে ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জে ও অ্যামেরিকা মহাদেশে এর প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এবার ২০১৭ সালে আমাদের দেশেও এই রোগটি মহামারি আকারে পৌঁছে গিয়েছে।

রোগের লক্ষণ

১. উচ্চ মাত্রায় জ্বর, ২. দীর্ঘদিন পর্যন্ত (প্রায় ১-২ মাস) অস্থিসন্ধিতে ও মাংশপেশিতে প্রচণ্ড ব্যথা, ৩. অসহনীয় মাথা ব্যথা, ৪. ত¦কে লালচে দাগ (র‌্যাশ), ৫. বমির ভাব ও শরীরে শীতল অনুভূতি হতে পারে।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রতিকার : রোগের লক্ষণ অনুযায়ী চিকিৎসা, বিশ্রাম, তরল খাবার খাওয়া, প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ সেবন, অস্থিসন্ধির ব্যথার জন্য ঠাণ্ডা পানির সেক দেয়া প্রভৃতি।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া জ্বর প্রতিরোধের উপায় : প্রতি বছরের গ্রীষ্ম-বর্ষা কাল বা এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের সময়কালে রোগ প্রতিরোধের নি¤েœাক্ত উপায়গুলো গ্রহণ আবশ্যক : ১. আপনার বাসগৃহ ও গৃহের আশপাশের যেকোনো পাত্রের জমানো পরিষ্কার পানি ৩ দিনের মধ্যে ফেলে দিন বা ৩ দিনের বেশি কোনো পাত্রে পানি জমতে না দেয়া। ২. যে কোনো ধরনের অব্যবহৃত পাত্র ধ্বংস করা বা এমন স্থানে সরিয়ে রাখা যাতে পানি জমতে না পারে। ৩. পাত্রের পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার লার্ভা বা পিউপা আছে কিনা লক্ষ্য করুন, থাকলে ফেলে দিন। ৪. এডিস মশার সম্ভাব্য সব বাসস্থান (পানিসহ প্লাস্টিকের বোতল, পানি/কোমল পানীয়-এর বোতল, বাটি, এসির পিছনের ট্রে, ফ্রিজের পিছনের ট্রে, ফুলের টব, বাথরুমের পানির ড্রাম, পরিত্যক্ত টায়ার, মাটির পাত্র/মটকা, বালতি, ডাবের খোসা/নারিকেলের মালা, টিনের কৌটা, নির্মাণাধীন বাড়ির চৌবাচ্চা (রিজার্ভ ট্যাংক), ব্যাটারির শেল, নষ্ট/অব্যবহৃত বেসিন ধ্বংস করুন বা পানি মুক্ত রাখুন।

সহকারী অধ্যাপক

নরসিংদী।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj