বনের রাজা খরগোশ : আবুল কালাম আজাদ

বুধবার, ১ মে ২০১৯

ব্যাঘ্র মামা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ব্যাঘ্রটা কে বুঝতে পেরেছো তো? ব্যাঘ্র হলো বাঘ। হ্যাঁ, আমি বাঘ মামার কথা বলছি। তিনি দাঁড়িয়ে বললেন- আমার থাবা দেখেছ? থাবার মধ্যে নখ দেখেছ? কাউকে একটা থাবা মারা মানেই তার দুই চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়া। আমার দাঁত দেখেছ? এক কামড়ে….! নিশ্চয় জানো, আমার গায়ের শক্তির কথা। জানো আমার ক্ষীপ্র গতির কথা। সুতরাং আমিই হব এই বনের রাজা। আর তোমরা সবাই আমার প্রজা। আমাকে কুর্নিশ করবে। আমাকে দেখলে পথ ছেড়ে দাঁড়াবে।

ব্যাঘ্র মামার কথা শেষ করতে না করতেই কাঁধ ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে দাঁড়ালেন কালো পাহাড়। কালো পাহাড়কে চিনতে পেরেছ? সে হলো মহিষ। গায়ের রঙ কালো। মাথায় ইয়া বড় দুইটা কালো শিং। নিজেই নিজের নাম রেখেছেন কালো পাহাড়। তিনি বললেন, ওই সব থাবা আর দাঁত-নখের কথা বলে কোনো লাভ নেই। ওসব বিড়ালেরও আছে। তাকাও আমার শিং-এর দিকে। এই শিং দিয়ে একটা গুঁতো দেয়া মানে পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি বের হয়ে আসা। আমার শরীরটা কি আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হবে? এই বনের রাজা হবার যোগ্যতা আমারই আছে। তোমরা সবাই আমার প্রজা। আমাকে হুজুর হুজুর করে চলবে।

মটকু মামা ঘ্যাঁত ঘ্যাঁত করে কলা গাছ খাচ্ছিলেন। মটকু মামাকে চিনেছ? হাতির কথা বলছি। তিনি কলা গাছ খাওয়া রেখে বললেন- বলো তো কার ভয়ে বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়? আমার ভয়ে। সেই আমাকে রেখে বাঘ আর মহিষ হতে চায় বনের রাজা। এটা কোনো কথা হলো? বামন হয়ে ওরা চাঁদ ধরতে চাচ্ছে, কিন্তু ধরতে পারবে না। এই বনের মহামান্য রাজা হব আমি। আমার কথা কেউ অমান্য করা মাত্রই শুঁড় দিয়ে তাকে মাথার ওপর তুলে মারব এক আছাড়। এক আছাড়েই ভবলীলা সাঙ্গ।

সভাপতি পণ্ডিত মশাই থরথর করে কাঁপছিলেন। তার হাতে একটা খাতা। কাঁপতে কাঁপতে বারবার হাতের খাতাটা পড়ে যাচ্ছিল মাটিতে। পণ্ডিত মশাইকে চিনছো না? শেয়াল পণ্ডিতের কথা বলছি। তার দায়িত্ব বনের রাজার নাম ঘোষণা করার। তিনি সবার বক্তব্য শুনে যাকে যোগ্য মনে করবেন, রাজা হিসেবে তার নামই ঘোষণা করবেন।

কিন্তু বক্তব্য শোনার পর পণ্ডিত মশাইয়ের মুখে আর কোনো ভাষা নেই। কার নাম ঘোষণা করবেন তিনি? ব্যাঘ্র মামার নাম ঘোষণা না করলে তিনি যে এখনই থাবা মেরে তার চোখ অন্ধ করে দেবেন। কালো পাহাড়ের নাম ঘোষণা না করলে তিনি তো এক গুঁতো দিয়ে পেটের নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে আনবেন। আর মটকু মামা শুঁড় দিয়ে…!

পণ্ডিত মশাই এমন বিপদে আর কোনোদিন পড়েননি। এটাকে মহাবিপদ বলা যায় না। এই বিপদ হলো মহাবিপদের বাপ-দাদার চেয়েও বড়। ঘামতে ঘামতে পণ্ডিত মশাইয়ের শরীরের সব লবণ-পানি বের হয়ে যাবার দশা।

উঠে দাঁড়াল পুঁচকে খরগোশ। বলল- আমার দুইটা কথা ছিল।

ব্যাঘ্র মামা বললেন- পুচকে মিয়ার আবার কী কথা?

খরগোশ বলল- আপনারা সবাই বলছেন, শক্তি ও সাহসে আপনারাই শ্রেষ্ঠ। কিন্তু আমরা ঠিক বুঝতে পারছি না, মূলত কে শ্রেষ্ঠ।

কালো পাহাড় বললেন- এই পুচকে, তোকে কীভাবে বোঝাবো?

-আপনাদের মধ্যে একটা লড়াই হলে ভালো হয়। লড়াইয়ে চূড়ান্তভাবে যে জিতবে সে-ই হবে বনের রাজা। কথায় আছে না, বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলে পরিচয়।

পণ্ডিত মশাইয়ের কাঁপন একটু কমল। মনে মনে ভাবলেন- এই ব্যাটাকেই তো পণ্ডিত বানানো উচিত ছিল।

প্রথমে লড়াই শুরু হলো ব্যাঘ্র মামা আর কালো পাহাড়ের মধ্যে। ব্যাঘ্র মামা কালো পাহাড়ের পা কামড়ে ধরলেন। কালো পাহাড় ঝারা দিয়ে নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়েই মারলেন এক গুঁতো। ব্যাঘ্র মামা লাফ দিয়ে নিজেকে রক্ষা করলেন। বাঘের হুঙ্কার আর মহিষের গর্জনে সারা বন কাঁপতে লাগল থরথর করে। হঠাৎ ব্যাঘ্র মামা লাফ দিয়ে কালো পাহাড়ের ঘাড়ে উঠে বসলেন। কালো পাহাড় ভীষণ এক ঝাঁকুনি দিয়ে ব্যাঘ্র মামাকে সাত হাত দূরে ছিটকে ফেলে দিলেন। কিন্তু বেচারা কালো পাহাড়ের ভাগ্য খারাপ। এত জোরে ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন যে, ঝাঁকুনির চোটে নিজের পা গেল ফসকে। তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন এক গাছের গুঁড়ির ওপর। গাছের গুঁড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে তার শিং দুটো গেল ভেঙে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে এল। শিং ভেঙে গেলে মহিষের আর থাকে কী? কালা পাহাড় তাই হেরে গেলেন।

ব্যাঘ্র মামার আনন্দ দেখে কে? তিনি নেচে নেচে বলতে লাগলেন- দেখলে তো কে রাজা হবার যোগ্য? আমিই হব এই বনের রাজা-বাদশা-সম্রাট।

মটকু মামা বললেন- আগে আমার সঙ্গে লড়াই করো, তারপর নাচ-গান যা করার করো। আমি তো আর মহিষ না। আমি হলাম হাতি, যাকে বলে হস্তি। মোগল সম্রাটদের হস্তি ছাড়া চলতো না, জানো তো?

শুরু হলো ব্যাঘ্র মামা আর মটকু মামার লড়াই। ব্যাঘ্র মামা প্রথমেই কামড়ে ধরলেন মটকু মামার শুঁড়। মটুক মামা পা তুলে দিলেন এক লাথি। ব্যঘ্র মামা মারলেন তার ঐতিহাসিক থাবা। যা হবার তাই হলো। মটকু মামার চোখ গেল কানা হয়ে। মটকু মামাকে আর সামলায় কে? যে তার চোখ কানা করেছে তার একটা কিছু না করে তিনি কি ক্ষান্ত হবেন? তিনি শুঁড় দিয়ে শূন্যে তুলে ব্যাঘ্র মামাকে মারলেন এক আছাড়। এক আছাড়ে ব্যাঘ্র মামার চার পা-ই গেল ভেঙে।

শেষ ফলাফল কী? মহিষের শিং নাই। বাঘ নুলা। আর হাতি কানা।

শিং ছাড়া মহিষ। নুলা বাঘ। কানা হাতি। এরা তো রাজা হতে পারে না। তাহলে বনের রাজা কে হবে? তখন খরগোশ লাফ দিয়ে গাছের বড় এক গুঁড়ির ওপর উঠে আঙুল তুলে বক্তৃতা শুরু করে দিল- বন্ধুরা, রাজা হতে হলে শরীরের শক্তি কোনো বিষয় নয়, দরকার হলো বুদ্ধির। এই তিনজন নিজেদের বুদ্ধির কোনো পরিচয় না দিয়ে শুধুই শারীরিক শক্তির দম্ভ করে গেছেন। এখন তারা তিনজনই পঙ্গু। তারা রাজা হবার অযোগ্য।

তখনই শেয়াল পণ্ডিত ঘোষণা করলেন- আজ থেকে এই বনের রাজা খরগোশ। আমরা সবাই তার পরামর্শ ও আদেশ মেনে চলব।

সব পশু-পাখি একযোগে দাঁড়িয়ে খরগোশকে কুর্নিশ করল। সুর করে গাইতে লাগলো-

দাম্ভিকেরা পেলো সাজা

পুঁচকে হলো বনের রাজা।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj