আলাদিনের জিন : জাকিয়া রহমান অন্তি

বুধবার, ১ মে ২০১৯

আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষ, আমার দাদু। আমার দেখা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সুদর্শন মানুষ তিনি।

ময়মনসিংহ এডওয়ার্ড স্কুল এবং কলেজের হেডমাস্টার ছিলেন তিনি। আম্মু-আব্বুর বিয়ের পরে আব্বু ঢাকায় চাকরি করতেন আর আম্মুর ময়মনসিংহে থাকা হতো এবং ওখানেই আমার জন্ম।

আমার দাদুর মুরব্বি এবং ভরসা ছিলাম আমি। আর আমার আলাদিনের জিন ছিলেন তিনি। আমার যাবতীয় আবদার এবং ইচ্ছার প্রকাশ ছিল একমাত্র তার কাছেই। দাদুবাড়িতে জন্ম হওয়ার কারণে নয় বরং তার বংশের প্রথম নাতনি এবং তার দাদুভাই বলে তার সঙ্গে আমার খুনসুটি এবং দুষ্টুমির শেষ ছিল না। দাদু আমাকে ডাকতেন ‘টুম্পা’ নামে। দাদুবাড়িতে এটাই আমার নাম। কখনো কোনো কিছুতে ‘না’ শুনতে হয়নি, উপরন্তু আদর দিয়ে মাথায় তুলে রেখেছেন। মানুষটি যে আমার কত প্রিয় এবং পছন্দের, তা হয়তো আমি নিজেও হিসাব করে বলতে পারব না।

এই মানুষটিকে আমি অনেক মিস করি। আহা, যদি আবার ফিরে যেতে পারতাম সেই দিনগুলোতে!

আমার প্রত্যেক জন্মদিনে কেউ হোন আর না হোন, দাদু আমার জন্য অন্য সবার দেয়া জামার চাইতে সুন্দর জামাটা কিনে আনতেন বা ঢাকায় পাঠিয়ে দিতেন। আর প্রত্যেক শুক্রবার নামাজ শেষ করে আমাকে নিয়ে মার্কেটে গিয়ে তখনকার সবচেয়ে দামি ম্যাট লিপস্টিকটা কিনে দিতেন। কারণ ছোটবেলায় খুব লিপস্টিক-পাগল ছিলাম আমি। সে সময় রংবেরঙের লিপস্টিকের কালেকশন ছিল আমার। আর বড়রা আমার কাছ থেকে খালি লিপস্টিক নিয়ে যেতেন বলে দাদু আরো বেশি করে কিনে দিতেন। আমার সাড়ে তিন বছর বয়সে আমি ময়মনসিংহ ছেড়ে ঢাকায় আসি আম্মু-আব্বুর সঙ্গে। আমরা আসার সময় তার যে কী কষ্ট, আসতেই দিতে চাননি। ঢাকায় আসার পর প্রত্যেক মাসে দাদু আমাদের দেখতে আসতেন আর সঙ্গে আনতেন আমার জন্য চিপ্স, চকোলেট আর লিপস্টিক। বাজার থেকে সবচেয়ে বড় মাছটা এনে আমাকে আগে দেখাতেন। তারপর নিজেই কাটতে বসে পড়তেন, এমনকি, আম্মুকেও কাটতে দিতেন না।

এখনো জন্মদিন আসে কিন্তু আগের মতো তার জামা পাওয়ার আশায় বসে থাকা হয় না। ফোনও আসে না প্রত্যেক দিন। প্রত্যেক সপ্তাহে লিপস্টিকও কিনে দেন না কেউ। কেউ বলেন না, ‘আমার দাদুভাই শ্বশুর বাড়ি যাবে, সঙ্গে আমিও যাবো।’ দাদুবাড়িতে গেলে কেউ আর হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলেন না, ‘কিছু কিনে খেয়ো দাদু।’

আমি জানি, এই ভালোবাসা আমি আর কারো কাছ থেকেই পাবো না। তাই তিনি আমার সবচেয়ে পছন্দের মানুষ। আমার আলাদিনের জিন- দাদু, তুমি পরলোকে থেকো আমার ভালোবাসার জাদুতে…

:: ধানমন্ডি, ঢাকা।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj