ইয়াসমিন থেকে রাফি : তালিকা আর কত বড় হবে?

সোমবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

ঠিক কোথা থেকে শুরু করব তাই ভাবছি। খুব বেশি দূর না গিয়ে শুরুটা যদি ১৯৯৫ সাল থেকে করি, তবুও দেখা যায় তালিকা কতটা দীর্ঘ। ১৯৯৫ সালে পুলিশ হেফাজতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় দিনাজপুরের ইয়াসমিনকে। এরপর যেন আর শেষ নেই। প্রতিদিন আতঙ্ক বাড়ছে। বাড়ছে পাশবিকতার ঘটনা। একেকটা ঘটনার নৃশংসতা ছাপিয়ে যায় আগের ঘটনাগুলোকে।

বাচ্চারা যেমন খেলতে গিয়ে কোনো কারণে বনিবনা না হলে একজন অন্যজনের সাজানো খেলনাগুলো এলোমেলো করে দেয়, কিংবা বালির মূর্তি মুহূর্তেই গুঁড়িয়ে দেয়, তেমনি প্রেম, ভালোবাসা কিংবা কু-প্রস্তাবে রাজি না হলেই বলি হতে হচ্ছে অসংখ্য নারীকে। এ যেন এক বিষবৃক্ষ ক্রমেই ছড়াচ্ছে তার ডালাপালা। গ্রাস করছে নারীকে। এর সঙ্গে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও বাড়তে থাকে। শিক্ষাগুরু থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্য, সহকর্মী, এমনকি পরিবহনেও অনিরাপদ নারী।

সিমি, রুমি, তৃষা, মহিমা, বুশরা, শাজনীন, তনু, রিশা, খাদিজা… তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে। কিন্তু প্রতিকার কোথায়? এক একটা ঘটনা দেখে মনে হয়, কত সহজে মেয়েদের জীবনটাকে থমকে দেয়া যায়! কত অবলীলায় হাসি-খুশি প্রাণোচ্ছল জীবনটাকে স্তব্ধ করে দেয়া যায়!

একের পর এক নৃশংস ঘটনাগুলো দাগ কাটে মানুষের মনে। জন্ম নেয় ক্ষোভের। প্রতিবাদী মানুষ প্রতিবাদ করে। রাস্তায় নামে। কিছু দিন চলে আন্দোলন। একের পর এক নতুন নতুন কর্মসূচি আসে। কিন্তু ঘটনাগুলোর কোনো সুরাহা হয় না। বিচার যে একেবারে হচ্ছে না, তা নয়। খুব কম সংখ্যকই আশানুরূপ বিচার পেয়েছে। বিচারের ধীরগতি, প্রভাবশালী মহল দ্বারা প্রভাবিত বিচার এবং অপরাধে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য জড়িত থাকলে মাঝপথে থমকে যাওয়া বিচার প্রক্রিয়া হতাশা বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ।

সম্প্রতি সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে চলছে প্রতিবাদ। ২৭ মার্চ ওই রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা। এ ঘটনায় ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন। ওই দিনই অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে আটক করে পুলিশ। এরপর ৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান রাফি। মাদ্রাসাছাত্রী তার বান্ধবী নিশাতকে ছাদের ওপর কেউ মারধর করছে, এমন সংবাদে তিনি ছাদে যান। সেখানে বোরকা পরা ৪-৫ জন তাকে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তারা রাফির গায়ে আগুন দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে রাফির শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে যায়। ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় মৃত্যুর কাছে হার মানে রাফি।

কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়তে চেয়েছিলেন রাফি। লড়তে চেয়েছিলেন ধর্ষণকামী, নারী নিপীড়ক এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে। যে শুধু নিপীড়ন করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং তাকে তাড়িয়ে বেরিয়েছে প্রতিবাদ না করতে, মামলা তুলে নিতে। বীভৎস এক যন্ত্রণা নিয়ে রাফি লড়েছেন মৃত্যুর সঙ্গে। মৃত্যুর কাছে হার মানলেও সে লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে বেঁচে থাকবে।

দুই পাতার চিঠিতে নুসরাত তার দুই বান্ধবী তামান্না ও সাথীকে উদ্দেশ করে লেখা চিঠিতে গত ২৭ মার্চ ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনাও দিয়েছেন। চিঠিতে রাফি লিখেন, ‘আমি লড়ব শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে, সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করব না। মরে যাওয়া মানে তো হেরে যাওয়া। আমি মরব না, আমি বাঁচব। আমি তাকে শাস্তি দেব। যে আমায় কষ্ট দিয়েছে, আমি তাকে এমন শাস্তি দেব যে তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে। আমি তাকে কঠিন থেকে কঠিনতম শাস্তি দেব। ইনশাআল্লাহ।’

রাফি লড়তে চেয়েছিলেন শেষ নিঃশ^াস পর্যন্ত। সেই কাজটি তিনি করেও গেছেন। কিন্তু যারা আজ রাফির জন্য কিংবা সিমি, রুমি, তৃষা, মহিমা, বুশরা, তনু, রিশার জন্য বিভিন্ন সময় রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, প্রতিবাদ করেছে তারা কতদিন এ লড়াই চালিয়ে যাবেন? আরেকটি নতুন ঘটনায় কি ভুলে যাব আগের ঘটনা?

নারী ও মানবাধিকারকর্মীরা মনে করেন, মূল্যবোধের অবক্ষয় আর বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ঠেকানো যাচ্ছে না এসব ঘটনা। আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই নির্যাতিতরা হচ্ছেন মানবাধিকারবঞ্চিত। ফলে এটি এখন আর ভিকটিমের একার সমস্যা নয়; রাষ্ট্রীয় সমস্যা। তাই জাতীয় এ সমস্যা উত্তরণে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে; কে কোন দল করে, কার কত প্রভাব-প্রতিপত্তি-টাকা এসব না ভেবে কঠোর হতে হবে ঘৃণিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে। সর্বত্র সোচ্চার হতে হবে জনসাধারণকেও। তবেই ভয় পাবে নারী-শিশুদের প্রতি সহিংসতাকারীরা।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj