বিশেষণ ভারে ভারাক্রান্ত নারী

সোমবার, ২৯ এপ্রিল ২০১৯

কাঞ্চন রানী দত্ত

জ্যোতির কলেজের প্রথমদিন। ছোট জেলা শহরের একটি মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে। কলেজের একজন শিক্ষক বললেন, ছেলেরা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তোমরা কোমলমতি মেয়েরা সেভাবে এগিয়ে যাচ্ছ না। এ কথা শোনার পর জ্যোতি বেশ হতাশ হলো। মনে মনে বলল তাহলে কি ভবিষ্যৎ বলে আমার কিছু নেই।

এরূপ অসংখ্য উদাহরণ ঘরে বাইরে অফিসে রয়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বলা হয় এতজনের মধ্যে এতজন নারী। এই কথাটা তো ঘুরিয়ে বলা হয় না কখনো যে, এতজনের মধ্যে এতজন পুরুষ। এতে হয়তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মেয়ে, নারী, মহিলা কর্মকর্তাদের বিশেষণে এমনভাবে সম্বোধন করা হয় যেন তারা ভিন্ন গ্রহের জীব।

বিশেষত গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত কথা মাটি নড়ে তো মেয়ে নড়ে না, সাত চড়েও কথা বলে না অর্থাৎ মেয়ে হবে মাটির চেয়েও শান্ত, ধীরস্থির, ধৈর্যশীল। আসলে আমরা সবাই সামাজিক জীব। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় সবার বেড়ে ওঠা কিন্তু এই প্রক্রিয়া নারী, মেয়ে, স্ত্রীকে ভিন্ন ধারায় নিয়ে যায়।

স্কুলের এক সহপাঠী তার পরিবারের চাপে ভদ্র নমনীয়ভাবে বেড়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টায় রত ছিল। বাজার পেরিয়ে স্কুলে আসার পথে কারো যেন নজর না পড়ে এই ভয়ে মাথা নিচু করে আসা-যাওয়া করত। এভাবে এক সময় আমরা জোর করেও তার পিঠ আর মাথাকে সোজা করতে পারিনি, বাস্তবেও সেটি তখন অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। তুমি মেয়ে মানুষ আদার ব্যাপারী হয়ে জাহাজের খবর নেয়া তোমাকে মানায় না, এ ধরনের উক্তি একজন মেয়েকে কখনো কখনো পশ্চাৎমুখী করতে পারে। মেয়েরা তো জাহাজও চালাতে পারে, সেখানে জাহাজের কথা ভাবলে অন্যায় কী? মেয়েদের সবকিছু মেনে নিতে হয়; এমন কথা কোনো মেয়েকে শুনতে হয়নি এটি বিরল। পরিস্থিতির কারণে বা বাস্তবতায় অনেকেই অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। তাহলে এটি কেন শুধু মেয়েদের জন্য প্রযোজ্য কেন হবে? সংসারে বিচ্ছেদ, সন্তান ঠিকভাবে গড়ে না ওঠার সিংহভাগ দায় এখনো নারীর ঘাড়ে বর্তায়। পারিবারিক দায়িত্ব তো শুধু নারীর একার নয়।

মহিলা অফিসার তোমরা সব ওদিকে বস বা তোমাদের এ বিষয় নিয়ে আলাপ করার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো অফিসেও এভাবে তাদের আখ্যায়িত করা হয়। কখনো কেউ কেউ বলে মেয়েরা ঊর্ধ্বতন হিসেবে ভালো নয়। মেয়েরা মায়ের জাতি, এ কথার মধ্যে মেয়েদের সম্মান দেখানো হয়, নাকি নীতিবাচক কোনো ইঙ্গিত লুকিয়ে তা স্পষ্ট নয়। যে রাধে সে চুলও বাঁধে, এর মাধ্যমে নিঃসংকোচে নারীর ঘরকন্নার চিরায়ত রূপকে তুলে ধরা হয়েছে। মেয়েরা ঘরের লক্ষী, শুধু মেয়ে কেন ছেলেমেয়ে উভয়ে লক্ষী হলে সে ঘর তো আরো সুন্দর হবে।

গ্রামে প্রতিবেশী একজন খুব প্রয়োজনে পাশের গ্রামের একটি দোকানে গিয়েছিল একদিন, পাড়ায় সবাই অফুরন্ত সময় নিয়ে তাকে নিয়ে সমালোচনায় মগ্ন হয়ে উঠলেন। এক সুরে সবাই বললেন ঘরের বউ কেন বাইরে যাবে। মান সম্মান সব গেল। এ ধরনের ধ্যান-ধারণা, উক্তি একজন যে কোনো মানুষের জন্য পীড়াদায়ক। অফিসে জেন্ডার ইনক্লুসিভ ভাষা বিষয়ে জাতিসংঘের একটি গাইডলাইনও রয়েছে। জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠার একটি কৌশলগত পদ্ধতি হলো ভাষা। এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রের পরিবেশ থেকে একপেশে বৈষম্য দূর করা যায়।

ছেলেরা অবাধ্য, দুরন্তপনা হবে এটাই স্বাভাবিক আর মেয়েকে হতে হবে ঘরকুনো। এ ধরনের মানসিকতার মধ্য দিয়ে ছেলেমেয়ে যখন বড় হয় তখন ছেলেদের জন্য সাত খুন মাফ। উৎসাহব্যঞ্জ্যক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত সামনে এগিয়ে যাওয়া যে কারো জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। সারাক্ষণ পাছে লোক কিছু বলে এমন অদৃশ্য রশি মেয়েদের গতিবিধি থামিয়ে দিতে পারে। এমনিতেই নানা প্রতিক‚লতা তাদের আঁকড়ে রয়েছে। তার ওপর সমাজ সংসারের এমন বিশেষণ প্রয়োগ তাদের সামনে প্রাচীর তুলে ধরে। নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করলেই তো সমাজের উন্নতি, দেশের উন্নয়ন দশের উন্নয়ন। নারীকে পশ্চাৎগামী করে রাখা মানে দেশের উন্নয়নকেই টেনে ধরা। কারো প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা দেখাতে তো অর্থের প্রয়োজন হয় না। শুধু প্রয়োজন উদার প্রগতিশীল মন। শুধু নারী বা শুধু পুরুষ নয়, এগিয়ে যাক সবাই, সবার পথচলা হোক নিষ্কণ্টক।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj