ফাঁদ

শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৯

আব্দুস সালাম

হামিনা ভার্সিটিতে চান্স পাওয়ার পর তার বাবা হামিদুল বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। মা-বাবা ছেড়ে মেয়েটা একদিনের জন্যও কোথাও থাকেনি। ঢাকা শহরে সে কোথায় কীভাবে থাকবে? কী খাবে? তা নিয়ে মা-বাবার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। চেনাজানা কারোর সঙ্গে মেয়েটাকে রাখা গেলে বাবা-মা একটু চিন্তা মুক্ত থাকতে পারত।

একদিন সকালে মেয়েটার থাকার বিষয় নিয়ে হামিদুল সাহেব তার এক বন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করছিল। আলোচনার সময় তার বন্ধু হামিদুলকে জানায়- শুনেছি পাশের গ্রামের বুশরা নামে এক মেয়ে ঢাকাতে পড়ে। কয়েকজন বান্ধবীর সঙ্গে সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে সাবলেট থাকে।

বন্ধুর এ কথা শুনে হামিদুল খুশি হয়। মেয়েটার সন্ধান নিতে বিকেল বেলাই বের হয়ে যায়। বাড়ি খুঁজতে তার বেশি কষ্ট করতে হয়নি। বুশরাকে গ্রামের লোকজন এক নামে চেনে। খুব ভালো মেয়ে। বেশ মেধাবী। হামিদুল সাহেব হামিনার থাকার বিষয়ে বুশরার বাবার সঙ্গে কথা বলে। বুশরা বাবাকে জানিয়ে দেয় হামিনা তার সঙ্গে থাকলে তাদের কোনো সমস্যা হবে না। তা ছাড়া মাস ছয়েক পর তার রুমমেটের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হবে। তখন সে আর তাদের সঙ্গে থাকবে না।

বুশরার সঙ্গে যে কথোপকথন হলো তা তার বাবা হামিদুলকে অবহিত করে। এতে হামিদুল সাহেব বেশ খুশি হয়। তার মাথায় যে দুশ্চিন্তার পাহাড় জমে ছিল তা মুহূর্তের মধ্যে সরে যায়। উৎফুল্ল চিত্তে সে বাড়িতে ফিরে যায়। মেয়েকে ডেকে বলে, ‘তোর জন্য ভালো একটা ব্যবস্থা হয়েছে। বুশরা পাশের গ্রামের মেয়ে। খুব ভালো মেয়ে। ওরা দুজন ঢাকার আজিমপুর এলাকায় সাবলেট থাকে। তুই ওদের সঙ্গে থাকবি।’

যথাসময়ে হামিনা বুশরাদের ম্যাসে উঠে পড়ে। নতুন জায়গায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে তার কিছুটা সময় লাগে। সব সময় বাড়ির জন্য তার মনটা পুড়তে থাকে। বুশরা ও অপর রুমমেট তাকে সান্ত¡না দেয়। এলাকার মেয়ে হিসেবে বুশরা তাকে যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা করে। হামিনাও বুশরার প্রতি কৃতজ্ঞ। এভাবে দেখতে দেখতে মাস ছয়েক কেটে যায়। তাদের সঙ্গে অপর যে রুমমেট থাকত তার ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ায় সে ম্যাচটা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে যায়।

অল্পদিনের সম্পর্ক হলেও রুমমেটটা চলে যাওয়ার সময় হামিনার খুব কষ্ট হয়। দুজনার মধ্যে বেশ সখ্য গড়ে উঠেছিল। তাই হামিনা নিজেকে সংবরণ করতে পারে না। তার দুচোখ অশ্রæসজল হয়ে ওঠে। ওদিকে শুরু থেকে হামিনা লক্ষ করে যে, বুশরা বেশখানিকটা রাত হলে বাসায় ফেরে। বুশরা ম্যাচে না থাকলে হামিনার একা একা ভালো লাগে না। তার গা ছম ছম করে।

একদিন বুশরা দেরি করে ফিরলে হামিনা তাকে বলে, ‘আপা, এত দেরি করেন কেন? এতক্ষণ কোথায় থাকেন?’

‘কী করি শুনবা?’ হাসতে হাসতে হামিনার মুখের ওপর পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয় বুশরা। তার হাসিটা হামিনার কাছে ভালো মনে হয় না। বুকটা ধুক ধুক করে ওঠে। তবুও সম্মতিসূচক উত্তর দিয়ে বলে, ‘জি বলেন। কেন শুনব না?’

বুশরার মনে জমে থাকা গোপন কথাগুলো একে একে হামিনার সঙ্গে শেয়ার করতে থাকে। বুশরাকে এতদিন সে চরিত্রবান মেয়ে হিসেবেই জানত। কিন্তু হায়! আজ সে কী শুনল? তার যে ধারণা পাল্টে গেল। বুশরার অন্ধকার জীবনের কথাগুলো শুনে হামিনার গা শিউরে ওঠে। সেদিন রাতে হামিনার মোটেও ঘুম হয়নি।

হামিনার মনটা কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগে। মনের মধ্যে লালিত স্বপ্নে ঘুণ পোকা লাগে। বুশরা বুঝতে পারে হামিনার মনটা ভালো নেই। তার মন ভালো করার দায়িত্বটা বুশরা নিজ কাঁধে তুলে নেয়। হামিনাকে সঙ্গী করার জন্য সে প্রায়ই প্ররোচিত করে। সুযোগ পেলেই তাকে বলে, ‘আরে জীবনটাকে একটু উপভোগ কর। এই বয়সে একটু-আধটু এদিক-ওদিক করলে কিছু হয় না। এই শহরে কে কার খোঁজ রাখে? ক’জনায় বা আমাদের চেনে?’

এভাবে বলতে বলতে একদিন ঠিকই বুশরা হামিনাকে সঙ্গী করে নেয় তার বিচরণ ক্ষেত্রে। এরপর বেশ কিছুদিন চলে যায়। বুশরার মতো না হলেও অন্তত বিপরীত সত্তার কোনো একজনকে নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কল্পনার রাজ্যে নিজেকে ভাসিয়ে দেয়। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য হামিনা মনে মনে কাউকে খুঁজতে থাকে। আর তার প্রতি ধীরে ধীরে তীব্র আকর্ষণ বাড়তে থাকে।

একদিন বুশরা হামিনাকে বলে, ‘তোমাকে তো একটা কথা বলাই হয়নি। কদিন আগে তোমার সঙ্গে সায়েম নামে যে বন্ধুর পরিচয় করিয়ে দিয়েছি সে কিন্তু তোমাকে খুব পছন্দ করে। তোমার সঙ্গে একটু কথা বলতে চায়। তোমার সঙ্গে একটু গল্প করার জন্য তার জানটা নাকি ছটফট করছে। সাহস করে তোমাকে কিছু বলতে পারে না। তোমার অবশ্য আপত্তি থাকলে…।’

এটাকেই হামিনা স্বপ্ন পূরণের উত্তম সুযোগ মনে করে। তাই বুশরার কথা শেষ না হতেই হামিনা বলে ওঠে, ‘আপত্তি থাকবে কেন? সায়েম ভাইকে তো আমারও পছন্দ। আপনি সায়েম ভাইকে আমার কথা বলেন।’

সায়েমের সঙ্গে হামিনার পরিচয়ের পর মাঝেমাঝে মোবাইলে তাদের মধ্যে কথা হয়। তারা যখন তখন কথা বলার মধুরতা উপভোগ করতে চায়। মধুর মধুর বাণী দিয়ে তারা সুন্দর সুন্দর কথার মালা গাঁথতে থাকে। সে মালা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। তবুও তাদের মালা গাঁথা শেষ হয় না।

সায়েম বড়লোকের ছেলে। মোটরসাইকেল নিয়ে ঘুরতে বের হয়। হামিনাকেও মাঝেমাঝে সঙ্গী করে। তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে সায়েমের খুব বেশি সময় লাগে না। লোকচক্ষুর আড়ালে কোনো নির্জন স্থানকে তারা বেছে নেয় অভিসার হিসেবে।

সুন্দরী নারীকে একান্তে কাছে পাওয়ার সব কৌশল জানা ছিল সায়েমের। হামিনা গ্রামের সহজ-সরল মেয়ে হলেও তার দেহের গোপন ভাঁজের স্বাদ উপভোগ করতে সায়েম বেশ কয়েকবার ব্যর্থ চেষ্টা করেছে। তবুও সে হার মানে না। সে হার মানতে জানে না। এসব কাজে সে সিদ্ধহস্ত। সে জিতবেই।

হামিনা যখন বুঝতে পারে সায়েমের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? তখন তার কিছুই করার ছিল না। সায়েম ছিল এক ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্র। শিকারিকে ধরার জন্য সুকৌশলে ফাঁদ পেতে রাখে। এক রকম বাধ্য হয়েই হামিনা সেই ফাঁদে পা দেয়। এরপর থেকে সেই ক্ষুধার্ত ব্যাঘ্রের কাছে নিজেকে বারবার বিলিয়ে দিয়েছে অকাতরে। হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়েও ধরে রাখতে পারে না সায়েমকে।

হামিনাদের আঙ্গিনায় সায়েমরা যেন পরিযায়ী পাখি। প্রয়োজন শেষে তারা আপন ভুবনে ফিরে যায়। ঋতুর পালাবদল হলেই আবার তারা খুঁজতে থাকে নতুন কোনো ঠিকানা। অবশেষে হামিনারাও বুঝতে পারে ভালোবাসার ছলনার কাছে তারা হার মেনেছে। জীবনের মূল্যবান সম্পদটি খুইয়েছে কোনো এক অন্ধকার গলিতে। যেখানে মানুষরূপী জানোয়ারগুলো বিচরণ করে অহরহ। বারবার একই মাংসের স্বাদ নিতে ওদের অরুচি আসে। তাই তারা নতুন কোনো মাংসের স্বাদ ও গন্ধ নিতে ছুটে বেড়ায় নানা অন্ধকার গলিতে। অথচ হামিনারা চেষ্টা করেও পারে না ক্ষণিকের সুখ পেতে জীবনের অমূল্য সম্পদকে ভুলে বোহিমিয়ান বুশরার মতো জীবনকে উপভোগ করতে। অন্ধকার গলিপথে মা-বাবার শিক্ষাগুলো বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তখন তারা অন্ধকারেই হাতড়ে মরে একটু আলোর ছোঁয়া পেতে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj