প্রতিশোধ

শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৯

মো. মাঈন উদ্দিন

গত কয়েক দিনের ঝুটঝামেলা কেটে যাওয়ায় আজ আকাশের মনটা বেশ ভালো। একটা প্রোগ্রাম শেষে কর্মস্থলে ফিরছে সে। হঠাৎ গাড়ি থমকে দাঁড়াল। সামনে রেলক্রসিং দিয়ে ট্রেন যাচ্ছে। পাজারো গাড়িটায় দুজন মাত্র লোক। ড্রাইভার আর আকাশ। ¯েøা মোশনে চলছে রবীন্দ্র সংগীত। আকাশ আনমনা হয়ে শুনছে রবীন্দ্রনাথের সোনালি দিনের গান। জটলার মধ্যে পোঁটলা হাতে এক বৃদ্ধ ভিক্ষুক গøাসের ওপাশে হাতড়াচ্ছে। ঢাকা শহরে গাড়ি সিগন্যালে পড়লে যা হয়।

কিন্তু ওই ভিক্ষুককে দেখে আকাশের হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠল। সে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। থমকে গেল তার হৃদ-স্পন্দন।

বৃদ্ধ লোকটির প্রতি গভীরভাবে তাকাল সে- এবড়োখেবড়ো চুল, মুখ ভর্তি সাদা সাদা দাড়ি। জীর্ণ-শীর্ণ এ লোকটি জব্বার চাচা না?

চুল-দাড়িতে লোকটির চেহারা কিছুটা অপরিচিত লাগলেও তার সঙ্গের মহিলাকে দেখে সে নিশ্চিত হলো- এই লোকটিই সেই জব্বার চাচা।

জব্বার চাচা ও তার বউ আজ পথে নেমেছে! ভিক্ষা করছে! দীক্ষা নিচ্ছে প্রায়শ্চিত্তের!

আকাশের ভাবান্তর হলো। সে নড়েচড়ে বসল। এই জব্বার আর তার বাবা একই গোষ্ঠীর লোক। তাই সম্পর্কে এই লোকটি তার চাচা হন। কিন্তু একে চাচা মানতে তার কষ্ট হয়, বেদনায় নীল হয় তনু-মন।

জব্বারের সঙ্গে তার বাবার জমি নিয়ে বিরোধের জেরে একদিন কথা কাটাকাটি চলছিল। কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি। হাতাহাতি থেকে তুমুল মারামারি। এক পর্যায়ে জব্বারের বউ জব্বারের হাতে কুড়াল ধরিয়ে দেয়। এই কুড়াল দিয়ে তার বাবার মাথায় আঘাত করা হয়। বাবা লুটিয়ে পড়েন মাটিতে। হাসপাতালে যাওয়ার পথে তিনি মারা যান।

এসবের প্রত্যক্ষদর্শী আকাশ। অদূরে দাঁড়িয়ে দেখেছে বাবার মর্মান্তিক মৃত্যুদশা। এখনো চোখ বন্ধ করলে এসব দৃশ্য তার চোখে ভেসে উঠে, হৃদয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়। বিবেক-বুদ্ধি হরণ হয়।

তার মা সবার দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও কোনো বিচার পাননি। বরং প্রবল চাপে একদিন রাতের অন্ধকারে মা দুই ছেলে আকাশ আর আলীকে নিয়ে শহরে চলে আসেন। আশ্রয় নেন এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায়। মা অন্যের বাসায় কাজ করে দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগান। আকাশ তার মেধা দিয়ে ভালো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান করে নেয়। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। তার মায়ের কষ্ট লাঘব হয়।

মেধা, সততা, পরিশ্রমের কারণে আজ আকাশের এ ঢাকা শহরে পাঁচতলা বাড়ি, পাজারো গাড়ি, অর্থ-সম্পদ সবই হয়েছে; কিন্তু একটা বেদনা তাকে কুরে কুরে খায়। আকাশ ভাবে- তার বাবাকে হত্যা করা না হলে হয়তো তিনি আজো বেঁচে থাকতেন। আর তার অবস্থানে বাবা কতই না খুশি হতেন!

মায়ের মুখের দিকে তাকালে আকাশের মনে পড়ে যায় বাবার সহজ-সরল মুখখানি। আর তার বাবার মুখের সঙ্গে আরেকটা মুখ তার হৃদয় পটে ভেসে ওঠে। তা হলো সেই নরপিশাচ জব্বারের মুখ। জব্বারই যে তার বাবার খুনি!

এসব ভাবতে ভাবতে তার দুই চোখ অশ্রæসিক্ত হয়। আকাশ ড্রাইভারকে গান বন্ধ করতে নির্দেশ দেয়। রুমাল দিয়ে চোখের জল মুছে, হৃদয়ের বেদনা গুছে, আস্তে আস্তে জানালার গøাস খোলে। টলটল চোখে তাকিয়ে দেখে জব্বারের ফ্যাকাশে মুখখানি।

এই মুহূর্তে আকাশের চোখে জল নেই, প্রতিশোধের আগুন। জব্বার কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে বলে, ‘বাবা, আইজ সারাডা দিন ধইর‌্যা কিচ্ছুই খাই নাই, দশটা টেহা দিলে একখান রুডি কিইন্যা খাইতাম।’

আকাশ মানি ব্যাগ থেকে একটি এক হাজার টাকার নোট বের করে। না, কোনো রাগ, অভিমান, প্রতিহিংসায় নয়; একজন জীর্ণ-শীর্ণ অভুক্ত পরিচিত ভিক্ষুককে ভিক্ষা দেয়ার মানসে।

আকাশের দেয়া নোটটি জব্বার দুই চোখের অতি নিকটে নিয়ে দেখে। নাকে নিয়ে শুঁকে। তার দাড়ি-গোঁফের ফাঁক গলে ছড়িয়ে পড়ে হাসির ঝিলিক। আকাশ যেখানে প্রোগ্রাম করতে গিয়েছিল সেখানে তাকে একটি বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়েছিল। সে তা না খেয়ে গাড়িতে রেখে দিয়েছিল। তাও সে জব্বারকে দিয়ে দিল। বিরিয়ানির প্যাকেট পেয়ে রাস্তার ধারে ল্যাম্পপোস্টের কাছে বসে জব্বার আর তার স্ত্রী গোগ্রাসে খেতে লাগল। আকাশ বিষণœ বদনে, বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে দেখল সেই দৃশ্য।

:: নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj