গল্পের ভেতর গল্প

শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৯

ইব্রাহীম রাসেল

আহারে মোমেনা বেচারি! স্বামীর জন্য চিতই পিঠা বানিয়ে রসে ভিজিয়ে রেখেছে। কত বাসনা- ঢাকায় গিয়ে নিজ হাতে স্বামীকে খাওয়াবে। স্বামীকে না জানিয়ে গিয়ে চমকে দেবে। চাঁদপুরের মৈশাদীতে মোমেনাদের বাড়ি। সকালের লঞ্চে উঠে ঢাকায় যাবে। স্বামী তার ঢাকায় রিকশা চালায়। ঢাকার এক বস্তিতে থাকে। বছর দুই হলো স্বামী ঢাকায় এসেছে। আগে মৈশাদীতেই রিকশা চালাত। একটু ভালো আয়ের আশায় ঢাকা যাওয়া। মোমেনা এই দুই বছরের একবারও ঢাকায় আসেনি। মাসে একবার স্বামীই আসে মোমেনার সঙ্গে দেখা করতে। তিন বছর হয়েছে তাদের বিয়ে হয়েছে। এক বছরের একটি মেয়ে আছে তাদের।

মেয়েকে নিয়ে মোমেনা সকালের লঞ্চে উঠল। সঙ্গে নিয়েছে স্বামীর জন্য বানানো চিতই পিঠা আর ছোট্ট কাগজে লেখা স্বামীর ঠিকানা। লঞ্চে বসে মোমেনা আপন মনে মিটিমিটি হাসে। অনেকদিন পর স্বামীর সঙ্গে দেখা হবে- সে এক আনন্দ। এর পাশাপাশি আরেকটা গল্পের কথা মনে করে হাসিটা আরো দীর্ঘ হয়। স্বামীকে সে গল্পটা শোনাবে বলে অধীর হয়ে আছে।

গল্পটি ঘটেছে পাশের বাড়ির গোলেনুরের ঘরে। বেশ কদিন ধরে গোলেনুরের স্বামীর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। ফোন দিলে রিং হয়, রিসিভ করে না। গোলেনুর তো চিন্তায় অসুস্থ হওয়ার উপক্রম। মৈশাদী বাজারের এক দোকানদার খবর দিল- গোলেনুরের স্বামী নাকি আর একটা বিয়ে করেছে। এ কথা শুনে গোলেনুরের মাথায় রক্ত চেপে যায়। ওই দোকানদারের সহযোগিতায় নতুন বউ আর গোলেনুরের স্বামীকে খুঁজে

বের করা হয়। এলাকাবাসীকে নিয়ে গোলেনুর স্বামীকে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসে। উঠানে ফেলে এলাকাবাসী উত্তম-মাধ্যম দেয়। সন্তান আর বউ রেখে আবার বিয়া করছ ব্যাটা! এলাকাবাসীর ছোট-বড় সবে মিলে হাত চালায়।

একপর্যায়ে গোলেনুরের স্বামী বউয়ের পা ধরে মাপ চায়। বলে- আমার ভুল হইছে। বউয়ের পা ধরে মাফ চাওয়ার দৃশ্য দেখে সবাই হেসেছে। মোমেনাও উপস্থিত ছিল সেখানে। সবাই বলাবলি করছিল- ব্যাটা বজ্জাত। বউ-সন্তান থাকার পরেও আর একটা বিয়ে করছে। এদের ভরণ-পোষণই জোগাতে পারে না, আবার একটা বিয়ে। গোলেনুরের স্বামী তখনো বউয়ের পা ধরে বসে আছে। গোলেনুরের স্বামীর কাচুমাচু মুখটা দেখে মোমেনার খুব হাসি পাচ্ছিল তখন। মনে মনে বলছিল- বিপদে পড়লে বাঘও কেমন বিড়াল হয়ে যায়।

লঞ্চ এসে সদরঘাটে পৌঁছাল। মোমেনা রিকশা নিল স্বামীর ঠিকানায় পৌঁছাতে। যেতে যেতে মাথার মধ্যে সাজাতে লাগল গোলেনুরের গল্পটা স্বামীকে কীভাবে শোনাবে। রিকশা এসে থামল বিশাল বিশাল দুই বিল্ডিংয়ের পেছনে এক বস্তির কাছে। মোমেনা মেয়েকে কোলে নিয়ে স্বামীর ঘর খুঁজে বের করে।

দরজায় টোকা দিতে মাঝ বয়সী এক মহিলা দরজা খোলে। মোমেনা স্বামীর নাম বলে জিজ্ঞেস করল- এটা কী তার ঘর? মহিলা বলল- জে, এটা তার ঘর।

মোমেনা জানতে চাইল- আপনি কে?

মহিলা জবাবে বলল- আমি তার বউ। এরপর মহিলা পাল্টা প্রশ্ন করে- আপনি কে?

মোমেনার মাথাটা ঘুরে আসে। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসে। স্মৃতিপটে গোলেনুরের মুখটা ভেসে ওঠে।

:: তাজমহল রোড, মোহাম্মদপুর, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj