সরকারের একশ দিন : আসুন, মূল্যায়ন করার এখনই সময়

শনিবার, ২৭ এপ্রিল ২০১৯


একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় শেখ হাসিনা সরকারকে বড় চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলেছিল। তারপর মন্ত্রিসভায় নতুন নতুন মুখ। প্রধানমন্ত্রী এই নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে যখন সাভার জাতীয় স্মৃতি সৌধে শ্রদ্ধা নিবেদনে যান, সকল মন্ত্রীদের একটি সিভিলিয়ন গাড়িতে দেখে আমি পত্রিকায় লিখেছিলাম- সড়ৎহরহম ংযড়ংি ঃযব ফধু. সত্যি মধ্য জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের সেই বহর আমাদের পুলকিত করেছিল। নেতৃত্ব, যোগ্যতা, নতুন নেতৃত্ব, সম্ভাবনা সবই প্রজ্বলিত হয়েছে। ১০০ দিন পর আবারো লিখছি তাদের নিয়ে। অন্তত সরকার গঠনের ১০০ দিন পূর্ণতা নিয়ে সরকারের কট্টর সমালোচকরাও আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবেন না। মোটা দাগে কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে হবে। আমি একজন শিক্ষক হিসেবে এ জন্যই দারুণ খুশি যে, এবারের কোনো পরীক্ষাতেই প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো লজ্জাজনক ঘটনা ঘটেনি। শিক্ষকতা পেশায় জড়িতদের এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত লজ্জাজনক। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি ও উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল দুজনই তাদের যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আশা করি, সামনে আরো চমক দেখাবেন তারা।

আরেকজন হলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান। একজন নিভৃতচারী মানুষ। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পরিচয় তার। সহসাই জনসম্মুখে আসেন না তিনি। গত এক দশকে তিনি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানকে এমন এক স্তরে নিয়ে গেছেন, যা সত্যিই বিস্ময়কর। বিশেষ করে পারমাণুবিক বিদ্যুৎ জগতে বাংলাদেশের প্রবেশ, জ্বালানি শক্তির আমদানিতে নির্ভরতা কমাতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ সম্পর্কিত প্ল্যান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভিভিইআর টাইপ রিঅ্যাক্টর পরিবারের সর্বশেষ সংস্করণ স্থাপনের চুক্তিসহ অসংখ্য কাজ করে যাচ্ছেন। এ কাজগুলো সাধারণ মানুষের চোখে এখনো পড়েনি। কিন্তু আগামী এক দশকে বাংলাদেশে অভাবনীয় এক পরিবর্তন লক্ষ করবে তারা। আমরা খাদ্যে যেমন স্বয়ংসম্পন্ন হয়েছি, ঠিক তেমনি বিদ্যুৎ খাতে কল্পনাতীত পরিবর্তন আসবে। জীবনে আসবে গতি, কর্মসংস্থানে আসবে উদ্ভাবনী ও নতুনত্ব। গ্রামগুলোতে পৌঁছে যাবে শহরের তামাম সুবিধা। একজন স্থপতি হিসেবেও ওসমান সাহেব বিশ্বের অনেক দেশে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি দুই জগতে তিনি অসাধারণ কাজ করছেন।

এবার আসি উদীয়মান আরেক প্রতিমন্ত্রীর কথায়। উত্তরবঙ্গের সন্তান, রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে তার পরিবারের নামডাক বহু আগে থেকে। তিনি হলেন নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। শুরু থেকেই তিনি একটি মিশন নিয়ে নেমেছেন। ঢাকায় নৌরুট চালু করা। বুড়িগঙ্গা, তুরাগকে তিনি অনেকাংশই দখলমুক্ত করেছেন। নদীতে এনেছেন নবপ্রাণ। এটা অত্যন্ত কঠিন কাজ। বেশিরভাগ ভূমিদস্যুই বুড়িগঙ্গা ও তুরাগের দুই তীর দখল করে গড়ে তোলে তাদের ব্যবসা। তার এ কাজগুলো করতে প্রভাবশালীদের তোপের মুখেও পড়তে হয়েছে, তার পরও থেমে নেই তিনি। মুক্ত করে যাচ্ছেন নদীর সীমানা। গুঁড়িয়ে দিয়েছেন বহুতল ভবন। চট্টগ্রামেও নদী দখলমুক্ত করতে পেরেছেন। আরেকটি ব্যাপার হলো, তাকে টেলিভিশন বা পেপার-পত্রিকায় দেখা যায় না খুব একটা। এটা ভালো সাইন।

আরেকজন মন্ত্রীর কথা বলতে হবে, তিনি হলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শ ম রেজাউল করিম। সরকারের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী তিনি। এ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তরসহ ১২টি সংস্থা এর অধীনে। গত ১০০ দিনে তিনি দৃশ্যমান একটা কাজ করেছেন। আগে ইমারত নির্মাণের নকশার অনুমোদনের জন্য ১৬টি দপ্তরের ছাত্রপত্রসহ দীর্ঘসূত্রতার বিশাল এক এলাহিকাণ্ড ছিল। রেজাউল করিম এ দীর্ঘসূত্রতার কার্যক্রম কমিয়ে মাত্র ৪টি দপ্তরে এনেছেন। ৫৩ দিনের মধ্যে নকশা অনুমোদনসহ ছাড়পত্রের বাধ্যবাধকতা দেয়া হয়েছে। জনগণ হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। আরেকটি বিষয় হলো, মন্ত্রী নিজেই রাজউকের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে গিয়েছেন। সব সরকারের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি ছিল হয়রানি, দুর্নীতির শীর্ষ তালিকায়। তিনি চেষ্টা করে যাচ্ছেন রাজউককে সত্যিকার জনহিতকর প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বিদেশি চ্যানেলে বাংলাদেশি বিজ্ঞাপন বন্ধ, সাংবাদিকদের নবম ওয়েজ বোর্ড গঠনসহ বেশ কিছু প্রশংসাজনক কাজ করছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। নিজের মতো করে কাজ করছেন তিনি। জলদস্যু, বনদস্যু, সর্বহারামুক্ত অঞ্চল গড়ে সরকারের ভাবমূর্তি এবারো উজ্জ্বল করলেন তিনি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের অনলাইন সেবা, ডিজিটালাইজেশন এনেছে নতুনত্ব। এ ছাড়া দুর্নীতি মুক্তে অনেকটাই সফল হয়েছে ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যাংকিং সেক্টরে দুর্নীতি রোধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। ট্রেনের কালোবাজারি ঠেকাতে টিকেটিং অ্যাপ চালু করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট ভাঙতে পেরেছেন। দুর্যোগ ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান চকবাজার ও বানানীর অগ্নিকাণ্ডে নিজের মন্ত্রণালয়ের দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেছেন।

গত ১০০ দিনের মূল্যায়ন এটি। তবে অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও সমানতালে এগিয়েছে চলেছে। সবাই ভালো করছে। অনেকে প্রবলভাবে চেষ্টা করছেন। ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড জাতির সামনে তা পেশ না করলেও সাধারণ মানুষের তীর্যক দৃষ্টি ছিল নতুন মন্ত্রিসভার দিকে। অনেক প্রবীণ মন্ত্রী, নেতাকে বলতে শুনেছিলাম- এক মাস যেতে না যেতে ভেঙে পড়বে এ মন্ত্রিপরিষদ। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তারা অনভিজ্ঞ, বাস্তব জ্ঞানশূন্য। ৩০ ডিসেম্বর নিরঙ্কুশ জয়লাভে ইতিহাস সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট। কেননা এত বিপুল সংখ্যক ভোটারের উপস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি আগে। প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে। এর আগে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এ দেশের মানুষ নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছিল, ছিনিয়ে এনেছিল চূড়ান্ত বিজয়। বন্যাসহ চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ভোট পড়েছিল তখন। ৪৮ বছর পর ২০১৮ একাদশ জাতীয় নির্বাচনে দেখা গেল তারই প্রতিচ্ছবি। এ জয় নিয়ে সমালোচকদের কানাঘুষা থাকলেও বাস্তব উপযোগিতা নেই বিন্দুমাত্র। এখন হিসাবটা সামনে যাওয়ার সংকল্প নিয়ে। মহাজোটের কাঁধে এখন বিশাল দায়িত্ব। মানুষ বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে মহাজোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। নানা শ্রেণির, নানা বয়সের বিভিন্ন পেশার ছোট-বড় অসংখ্য স্বপ্নের প্রতিফলন এবারের নির্বাচন। সাধারণত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেখা যায়- বিশাল জয়ের ক্ষেত্রে ক্ষমতা আরো বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ার আকাক্সক্ষা থেকে যায়, সেটা যেন না হয় সে ব্যাপারে সর্তক থাকতে হবে। কারণ এ দেশের জনগণ তথা তরুণরা শেখ হাসিনার প্রতি আস্থা রেখে বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে নৌকা মার্কায় রায় দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, নতুন সরকার তাদের স্বপ্ন পূরণে অবিচল থাকবে। এ ধরনের অনেক কথা বলতে শুনেছি তাদের।

মন্ত্রিপরিষদ গঠনে যখন তাদের নিজেদের নাম দেখলেন না, সঙ্গে সঙ্গে ভোল পাল্টিয়ে ফেললেন। অনেকটা চ্যালেঞ্জের সুরেই তখন বলেছিলেন শেখ হাসিনার সরকার অঙ্কুরেই বিনষ্ট হবে। যেখানে অভিজ্ঞদের স্থান নেই তা কখনোই ইতিবাচক ফল বহন করতে পারে না। তাদের এ রকম মন্তব্য আমার কাছে খুব ছোট, হীনমন্য মনে হয়েছে। আজ ১০০ দিনের মূল্যায়ন কীভাবে নিরূপণ করবেন তারা। দায়িত্বটা আপনাদের ওপর ছেড়ে দিলাম। এ সময়টিতে মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যকে নিয়ে হয়নি কোনো বিতর্ক, সমালোচনা। পুরনোদের বাদ দিয়ে নতুনদের নিয়ে পথ এগোনোর যে মহাপরিকল্পনা শেখ হাসিনা হাতে নিয়েছেন তার ঝলক অনেকটাই দেখতে পারছেন দেশবাসী। এ সম্পর্কে দৈনিক সমকালে জানুয়ারিতে লিখেছিলাম ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’ নামে সম্পাদকীয়। গত ১০০ দিনের কর্মকাণ্ড দেখলে বুঝা যায় সত্যি শেখ হাসিনার সিলেকশন কতখানি বাস্তবমুখী। প্রথমবার মন্ত্রী হয়েও মাত্র ১০০ দিনে সফলতা দেখিয়েছেন বেশিরভাগ তরুণ মন্ত্রী। আমার দৃষ্টিতে এদের ত্রুটি-ব্যর্থতার চেয়ে সফলতার পাল্লাই ভারী। এই ১০০ দিন দেখে আগামী দিনগুলো কেমন যাবে, আমরা তা বিশ্লেষণ করতে পারি। জয়তু শেখ হাসিনা।

ড. মেসবাহউদ্দিন আহমেদ : গবেষক, কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj