মধ্যাহ্নে গোধূলি আলো : দিলীপ কুমার বড়–য়া

শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯

মধ্যরাতে স্বপ্ন দেখে হঠাৎ অনিকেতের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে তখন গহন রাত্রি। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ, আর তাকে ঘিরে তারাদের রং ঝিলমিল। ঘুমুতে চেষ্টা করে অনিকেত। কিন্তু কিছুই তার ভালো লাগে না। ব্যালকনিতে গিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে। যামিনীর নিরবতায় নিজেকে সমর্পণ করে। ঘুম ভেঙে গভীর রজনীর হিমেল বাতাসে একাকী স্মৃতির উষ্ণতর টানেল দিয়ে হিরন্ময় অতীতে ফিরে যায়। অন্তহীন এক জীবন জিজ্ঞাসা মনের আকাশে বারম্বার উঁকি দিয়ে যায়। রাতের বিবর্ণ ধূসর দেয়ালে ক্ষয়ে যাওয়া জীবনের আর্তনাদে অবরুদ্ধ জীবনের কাছে প্রশ্ন- আর কতকাল এ বিবর্ণ অসুন্দরের কাছে স্বপ্ন আর সুন্দরের ভাবনা পরাস্ত হবে? বিচ্ছিন্ন ভাবনায় অনিকেত ক্রমশ খোঁজে তার স্মৃতির শহর, শৈশবের মায়ের বুকের উষ্ণ আদর আর নবীন প্রভাতের ¯িœগ্ধতা।

অনিকেত ভাবনার অতলে হারিয়ে যায়। সবুজ মায়াময় প্রকৃতির কোলে পাহাড় পরিবেষ্টিত সৌন্দর্যে সে এক সময় বেড়ে উঠেছিল মায়ের ¯েœহ ছায়ায়। আজ যান্ত্রিকতায় বহমান জীবনের মধ্যাহ্নে তাকে প্রতিটি প্রহর টোকা দিয়ে যায়। একাকীত্ব নস্টালজিয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে নির্বাসিত সুখ আলস্যে জাবর কাটে! সীমাবদ্ধ গণ্ডির অনাড়ম্বর জীবনে সংক্রমিত হয় হাহাকার! পাহাড়ি ঝর্নার রিনিঝিনি শব্দের নিক্কন, পাখিদের কলকাকলী আর আকাশের সাদাকালো মেঘের দল তার কাছে ছিল প্রকৃতির এক বিস্ময়কর বিমূর্ত ক্যানভাস। আজ সবই যেন মনে হচ্ছে যোজন যোজন দূরে। অনিকেত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন অনেক বছর আগে। জীবনের চুয়ান্ন বছর অতিক্রম কালে তার ভাবনার মৌন বেলাভূমিতে সোনালী স্মৃতির পাখিরা আবারো তাকে ডেকে যায়। স্মৃতিতে হাতড়ে বেড়ায় শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্যের দিনগুলোর রোদের উত্তাপ। অনিকেত যখন নির্ঘুম স্মৃতির শহরে আনাগোনা করছিল তখন রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। একটা আলতো হাতের স্পর্শে সে সম্বিৎ ফিরে পায়। অনিকেতের ভাবনায় ছেদ পড়ে। একটা ক্ষীণ আওয়াজ তাকে মগ্নতা থেকে জাগিয়ে তোলে। কি হয়েছে তোমার? একাকী বসে আছ কেন? কোন দুঃস্বপ্ন দেখেছো? অনিকেত ফিরে তাকায়। দেখে নদী দাঁড়িয়ে তার পাশে উৎসুক দৃষ্টিতে। নদী অনিকেতের জীবন সঙ্গিনী। জীবনের অনেক বছর এক সঙ্গে চলছেন দুজন দুঃখ-সুখের ভেলায় চড়ে। আজো তাই উৎকণ্ঠিত নদী তার প্রিয়তম স্বামীর এমন রাত জেগে থাকা নিয়ে। নদী অনিকেতের পাশে একটা চেয়ার নিয়ে বসে পড়লেন। নদী অক‚ল পাথার ভাবছেন- হঠাৎ অনিকেতের কি এমন হলো যে তাকে বিপর্যস্ত মনে হচ্ছে। আবারো নদী অনিকেতকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়- কি ঘুমুবে না?

অনিকেত বললো- না।

নদী আবার জিজ্ঞেস করে- কোনো শারীরিক অসুবিধা কি অনুভব হচ্ছে?

এবার অনিকেত নদীর মুখোমুখি বসেন এবং দৃষ্টি ফেলেন নদীর উৎকণ্ঠাযুক্ত অবয়বে।

স্ত্রীকে অনিকেত আশ্বস্ত করলেন তার কিছুই হয়নি। অনিকেত অশ্রæ সজল নয়নে বললো- আজ বড় বেশি মাকে মনে পড়ছে। ফেলে আসা দিনগুলো আমাকে নিয়ে গেছে সুদূর অতীতে। নদী দুষ্টুমি করে টিপ্পনী কাটে- মা নাকি অতীত প্রেম? অনিকেত বললো- আরে না। তুমি যে কি বলো? মাকেই আমি মিস করছি। যার ¯েœহের আঁচলে আমি চিরকালের সেই অনি। আমার মায়ের মায়াময় আদর, প্রেরণা, ঐকান্তিক ইচ্ছা আমাকে আজ এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। নদী বললো- হুম। রাত বাড়ছে। এদিকে কথার সুতোয় অনিকেত এগোয়। নদী বিভোর হয়ে শুনছে স্বামীর কথা। ঘুম জড়ানো চোখে নদী বলে ওঠে- কাল তুমি ইউনিভার্সিটি যাবে না? চল ঘুমুবে চল। শরীর খারাপ করবে। তখন দূরে কোথাও ঘণ্টা বাজছে রাত ৩টার। শারদ জোছনা বিলিয়ে চাঁদ হেলে পড়েছে আকাশে। চাঁদ ও ঘুমুবার আয়োজনে ব্যস্ত। নিস্তব্ধ যান্ত্রিক শহর ও ঘুমুচ্ছে অঘোরে। মাঝেমধ্যে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ ভেসে আসছে রাজপথ থেকে। অনিকেত আবার ভাবনার পথ ধরে বলেন আমরাই কি শুধু জেগে আছি? আরো কতো মানুষ জেগে আছে। কতো মানুষ রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে, কতো মানুষ হাসপাতালে, কতো মানুষ আর্ত পীড়িত হয়ে যাপন করছে দুঃখের জীবন। দেখছো না অ্যাম্বুলেন্সের কর্কশ সাইরেন জানান দিচ্ছে মানুষের কষ্টের বোবা কান্নার। অনিকেত এই বলে বিমর্ষ হয়ে পড়ে। নদী কিছুদিন যাবৎ লক্ষ্য করছে অনিকেত ইদানীং মানুষকে নিয়ে বড় বেশি ভাবছে। নদী অনিকেতকে এবার জোর করে ঘুমুতে যাবার জন্য। নদী বলে আমি তোমার সব শুনব। তবে এ মধ্যরাতে নয়। শুক্রবারে ছুটির দিনে আমি তোমার অজানা কথামালায় ভাসাবো এ হৃদয়। হলো তো! তারপর অনিকেত নদীর হাত ধরে পা বাড়ায় শয্যার দিকে। কিন্তু বুকের ভেতরের অবদমিত স্মৃতিগুলো আজ বড় বেশি তাকে তাড়িত করছে। শোবার ঘরে অনিকেত নদীকে বলেন ঘুম আসছে না আমার। তুমি ঘুমাও। নদী চিন্তিত হয়। কি এমন হলো অনিকেতের? নদী ভাবতে থাকে অনিকেতকে নিয়ে। কখন যে ঘুমের কাছে সমর্পণ করেছে সেদিকে অনিকেতের ভ্রæক্ষেপ নেই। অনিকেত ও ঘুমিয়েছে। তবে কিছুক্ষণের জন্য। ভোরের আলো জানলায় উঁকি দিচ্ছে। পূবাকাশে সূর্যের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে আরেকটি নতুন প্রভাত।

অনিকেতের ছোটবেলা থেকেই অভ্যেস ভোরে ঘুম থেকে জেগে ওঠা। তবে আজকের সকাল তার জন্য ব্যতিক্রম। কোনো রকমে বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রেশ হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নেয়। ওদিকে নদী ডাইনিং টেবিলে সকালের নাস্তা প্রস্তুত করে রেখেছে। অনিকেতের খাবার ইচ্ছা এতটুকু নেই। কেন যেন আনমনা। দুপিস ব্রেড বাটার লাগিয়ে কোনো রকমে খেয়ে নেয়। তারপর এক কাপ চা খেতে খেতে নদীকে বললো আজ ফিরতে দেরি হবে। নদীকে প্রতিদিনের মতো সন্তানদের স্কুল-কলেজ যাওয়া নিয়ে কিছু নির্দেশনা দিয়ে বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে। অনিকেত বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবাসে অন্য সহকর্মীর সাথে যাতায়াত করেন। আজও রুটিন মাফিক বাসার গেট থেকেই গাড়িতে উঠলেন অনিকেত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছেই অনিকেত ক্লাসে চলে যান। ক্লাস নেয়ার পর সহকর্মীদের সাথে কথোপকথনে যোগ দেন। আলোচনায় দেশ ,কাল, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাহিত্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি উঠে আসে। অনিকেত ব্যবসায় প্রশাসন ও অর্থনীতি বিষয়ে পারদর্শী হলেও সাহিত্যের দিকে ঝোঁক বেশি। সাহিত্য বিষয়ক সৃজনশীল লেখালেখি, পুস্তক আলোচনায় একটু বেশি পরিমাণে উৎসাহী। সহকর্মী প্রতীতি বলছিল- অনিকেত ইদানীং খুব ভালো লিখছে। প্রায় সব পত্রিকায় অনিকেতের লেখা থাকে। বিশেষত শুক্রবারের সাহিত্য পাতায়। এতে অনিকেত একটু অপ্রস্তুত হন। অনিকেত বলেন- এ আর এমন কি। আমার চাইতে আরো ভালো লেখক আছেন। যারা পদক পাচ্ছেন, সম্মাননা পাচ্ছেন তারা তো অবশ্যই ভালো লেখক। ইনসান বলে উঠলো- তুমিতো কলাম লেখক হিসেবে শুরু করেছিলে এবং তোমার কলামগুলোতে সমাজ, অর্থনীতি, সামাজিক অসঙ্গতি, পরিবেশ সচেতনতা, মানবিক আহ্বান প্রবল। প্রবাল বললো- এবার কি ভাবনা আছে? অস্ফুট স্বরে অনিকেত বললো- শূন্যবাদ! বুঝলাম না। বললো অতনু। এবার সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো এবং বললো- তুমি কি আধ্যাত্মিক সাধনায় নিমগ্ন? অনিকেত এড়িয়ে গেলো সহকর্মীদের প্রশ্ন এবং ত্বরিত রুম থেকে কাজের বাহানায় বেরিয়ে গেলো।

অনিকেত রুটিন মাফিক সব ক্লাস শেষ করে কিছু বিভাগীয় কাজের পর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরুলো। তখন বিকেল পাঁচটা। মুঠোফোনে নদীর ফোন- তুমি কোথায়? আসছো নাকি?

নাহ, এখন আসছি না। একটু পরে আসছি। বললেন অনিকেত। ফিরতি পথে অনিকেত অফিসের গাড়ি নিলো না। অনিকেত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটতে লাগলো। পথিমধ্যে কফি শপ দেখে অনিকেত ভেতরে গিয়ে কফি আর কিছু হালকা নাস্তার অর্ডার দিলো ক্ষুধা নিবারণের জন্য। অনিকেত আনমনা হয়ে ভাবছে গত রাতের স্বপ্নের কথা। এক সময় ভাবনার অতলে হারিয়ে গেল। অনিকেত জীবন নিয়ে ইদানীং একটু বেশিই ভাবছে। শূন্য বৃত্তে ঘূর্ণায়মান জীবন একদিন ক্লান্তিতে হিসেবের খাতায় সমীকরণ মেলাবে। তখন জীবনের মধ্যাহ্ন শেষ, শুধুই পারাপারের ডিঙ্গায় অপেক্ষা। অর্ডার অনুযায়ী কফি এলো নাস্তাসহ। অনিকেত কফিতে চুমুক দিলো। একটা চেনা স্বরের আওয়াজ হঠাৎ তাকে বিচলিত করলো। অনেক বছর পর এ মিষ্টি সুরেলা কণ্ঠস্বর। অনিকেতের টেবিলের পাশ দাঁড়িয়ে আছে সুস্মিতা। অনিকেত একটু অবাকই হলো। পরে দাঁড়িয়ে বললো আরে সুস্মিতা? তুমি এখানে কি করে? কখন এলে? সুস্মিতা বললো আরে দাঁড়াও দাঁড়াও। একসাথে কত প্রশ্ন করেছো খেয়াল করেছো? লজ্জা পেলো অনিকেত। তারপর সুস্মিতাকে বসতে বললো।

অনিকেত বললো- কি খাবে?

-না তেমন কিছু না। কোল্ড কফি হলে চলবে। আগে বলো তুমি কেমন আছো প্রফেসর সাহেব।

-আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো বলো।

-ভালো। অনিকেত একটু উন্মনা হয়ে বললো।

সুস্মিতা দেখছে অনিকেতকে। যে ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কারো সাথে তেমন একটা কথা বলতো না সে আজ কতো সহজ সাবলীল, উদ্দাম অনুভবে প্রাঞ্জল। হাসে সুস্মিতা। সুস্মিতা স্মৃতির উঠোনে বিচরণ করে। শাটল ট্রেনে তাদের পরিচয়। কতটুকু আর আলাপ। হাই-হ্যালোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। সুস্মিতা রাজনীতি বিজ্ঞানে আর অনিকেত অর্থনীতিতে। প্রায়ই দেখা হতো কলা ভবনে, লাইব্রেরিতে। আবার কখনো শাটল ট্রেনে। দুজনের মধ্যে নিখাদ বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে উঠেছিল। তবে সেটা ছিল নিছক বন্ধুতা। ইউনিভার্সিটি জীবনের কত স্বপ্ন কথন, কত খুনসুটি, একসাথে কোনো অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ আজ শুধু স্মৃতি। অনিকেত ছিল লাজুক প্রকৃতির। সহজে নিজেকে প্রকাশ করতো না। একটা গাম্ভীর্যতা তার মধ্যে ছিল। তবে সবাইকে আপন করে নেয়ার একটা অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। তার মার্জিত আচরণের জন্য শিক্ষক এবং বন্ধুরা তাকে পছন্দ করতো। এ মুহূর্তে দুজন সতীর্থ মধ্যাহ্ন বয়স পেরিয়ে গেছে। আজ এত বছর পর আবার দেখা। এখনো অনিকেত তার আগের সেই সারল্য, ¯িœগ্ধ হাসির উচ্ছ¡সিত আবেগ ধরে রেখেছে। ভাবছে সুস্মিতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শাটল ট্রেনে একবার অনিকেত দায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে সুস্মিতাকে রক্ষা করেছিল। সুস্মিতা আজও অনিকেতের কাছে কৃতজ্ঞ। সুস্মিতার ভাবনায় ছেদ পড়ে অনিকেতের ডাকে। আচ্ছা বলোতো কোথায় ডুব দিয়েছিলে?

-নাহ। এমনি। সুস্মিতার উত্তর।

-কতো বছর পর দেশে এলে?

-প্রায় দশ বছর।

-কানাডায় কোন প্রভিন্সে থাকো?

-টরেন্টো।

-হাজব্যান্ড কি এসেছেন বাংলাদেশে?

-হ্যাঁ।

-আচ্ছা তোমার কথা বলো এবার। সুস্মিতার মৃদু জিজ্ঞাসা।

-কি বলবো?

-কেন, তোমার জীবন জগত।

-আমার এক নদী আছে।

-মানে তোমার বউ?

-হুম। সে আমার ….

-এতো প্রেম কোথায় ছিল?

-ছিল, তবে অপ্রকাশ্য।

-প্রকাশে কি বাধা ছিল?

অনিকেত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। বললো অপ্রকাশিত অবোধ্য প্রেম অপ্রকাশিতই থাক। এভাবেই দুজন সতীর্থের আলাপ চললো দীর্ঘক্ষণ। প্রায় সাড়ে ছয়টা নাগাদ তারা বেরুলো কফি শপ থেকে। সুস্মিতার সাথে আবার সাক্ষাতের প্রতিশ্রæতি দিয়ে বাসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার জন্য আমন্ত্রণ জানালো অনিকেত এবং বিদায় নিলো শুভ কামনা জানিয়ে।

মুঠোফোনে নদীর কল। কি হলো আজ তোমার? বাসায় কি আসবে না?

আরে বাবা আসছিতো। এত উতলা হচ্ছো কেন?

অনিকেত সোজা বাসার পথ ধরলো।

মাঝ পথে আবার প্রীতমের ফোন।

কাল শিল্পকলায় নান্দিকার এর একটা নাটক আছে বন্ধু। প্রীতম বললো।

-কোন সময়ে

-সন্ধ্যা ৭টা।

-ঠিক আছে। আসার চেষ্টা থাকবে বন্ধু।

সুপারস্টোর থেকে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাসায় ফিরলো ঠিক সাড়ে ৭টায়।

বাসায় অবশেষে ফেরার সময় হলো? অভিমানে নদী বললো।

আগে ফ্রেস হতে দাও। তারপর যত ইচ্ছা গালাগাল দাও। অনিকেত হেসে হেসে নদীকে বললো।

-ঠিক আছে। ফ্রেশ হয়ে তাড়াতাড়ি এসো। চা খাবে তো?

-মন্দ হয় না।

চা খেতে খেতে নদী বলছিল -কোথায় ছিলে এতক্ষণ?

এক বন্ধুর দেখা। অনেক বছর পর। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সতীর্থ।

নদী আর তেমন কথা না বাড়িয়ে অন্য কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। তখন অনিকেত ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো। রাজ্যের নানান বিষয় তার ভাবনায় বিচরণ করছে। অনিকেতের ভাবনায় মায়ের স্মৃতি, শৈশবে মায়ের প্রেরণায় এগিয়ে যাওয়ার সেই দীপ্র উদ্দামতা বারম্বার ভেসে উঠছে। এর মধ্যে নদী এসে তার সাথে যোগ দিয়েছে। নদী বললো তুমি কি যেন বলবে বলেছিলে। এবার বলো। অনিকেত শুরু করলো- উনিশশ একাত্তরের যুদ্ধদিনের সব স্মৃতি এখনো সুরক্ষিত আছে। যুদ্ধের সময় বাবা ঢাকায় আটকে যাওয়া, উৎকণ্ঠায় দিন যাপন, মুক্তিযোদ্ধাদের বিচরণ, শরণার্থী আশ্রয়, বাড়ির উঠোনে বাঙ্কার নির্মাণ, পাকিস্তানি সৈন্যদের ভয়ে ত্রস্ত হওয়া, গ্রামের হাটে গিয়ে পাকিস্তানি সৈন্যদের মুখোমুখি দেখা এবং দ্রুত পালানো, যুদ্ধের সময় কষ্টের সময় পার করা ইত্যাদি স্মৃতি এখনো আমার কাছে জীবন্ত। বাবা অনেক কষ্টে ঢাকা থেকে ফিরে এসেছিল আমাদের মাঝে। এরপর বাবা-মায়ের অক্লান্ত চেষ্টায় পাড়াগাঁয়ের সেই ছেলেটি একে একে সিঁড়ি ভেঙে উঠে এসেছে অনেকদূর। মায়ের স্বপ্ন ছিল ছেলে প্রকৌশলী হবে। মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। তবে যে মেধা আর প্রচেষ্টা ছিল তা দিয়ে আজকের অনিকেত। শিক্ষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, সমাজ উন্নয়নে কিশোর বয়স থেকেই স¤পৃক্ত ছিলাম। সাহিত্যের বই, উপন্যাস, কবিতা, গল্পের বই গোগ্রাসে পড়ে নেয়ার বাসনা ছিল প্রবল। কবিতা লিখতাম, আবৃত্তি করতাম, নাটক করতাম। এখন যন্ত্রে পরিণত হয়েছি। স্বপ্নগুলো ধরা ছোঁয়ার বাইরে। তারপর ও স্বপ্নগুলো আকাক্সক্ষার বৃত্তে বিচরণ করে। জীবনটা ধূসর উপত্যকায় ঝুলে আছে। বলতে বলতে থামলো অনিকেত। নদী রাতের রান্নার আয়োজনের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লো।

অনিকেত ভাবছেই তো ভাবছে। জীবনের প্রতিক‚ল পরিবেশ, সমাজের বিদ্যমান জটিলতা, মূল্যবোধহীনতা, অবক্ষয়, মেকি সম্পর্কের বন্ধন, মানুষের অহংবোধ, অমানবিক আচরণ ইত্যাদি তাকে আজকাল বড় বেশি পীড়া দেয়। তারপরও জীবনের প্রয়োজনে জীবনের ধারা বহমান। হতাশা, নৈরাশ্যবোধ উপলব্ধ হয় অনিকেতের কাছে। আজকাল অনিত্য, অনা দর্শনে ডুবে থাকে অনিকেত। জীবন রহস্যের সন্ধান করে। তা কি এক জীবনে সম্ভব? সংসারের জটিল গ্রন্থিতে জড়িয়ে আছে জীবন। সংসার ছেড়ে কি দিকশূন্যপুরের অক্লান্ত যাত্রায় শামিল হওয়া যায়? অনিকেতের জীবন ভাবনা মধ্যাহ্ন বয়সে এসে বদলে যায়। তারপর ও অনিকেত সংসারের ক্যানভাসে এঁকে যায় প্রিয় মানুষের মুখ, নদী, কাশফুল ছুঁয়ে যাওয়া রঙিন দিনের স্বপ্নের নকশীগাঁথা; ঘাসের ডগায় রোদের উত্তাপ ছুঁয়ে যাওয়া রাতের শিশিরের ¯িœগ্ধতা। নি®প্রভ জীবন শূন্য বলয়ের চক্র থেকে মুক্তির প্রচেষ্টায় আর্তিময়। মধ্যাহ্নে অন্তরে বাইরে নির্বাসিত এক অনন্য সত্তা। আপন পথ রুদ্ধ করে আপনারে খুঁজি কে আমি? এ প্রশ্ন ঘোরাফেরা করে অনিকেতের অন্তরে।

নদী আবার অনিকেতের ভাবনায় জল ঢেলে দেয়। -কি এমন আকাশ পাতাল ভাবছো বলতো? নদীর প্রশ্ন। তুমি সন্ন্যাসী হয়ে যাবে নাকি? নদীর দুষ্টুমি ভরা জিজ্ঞাসা।

আরে না। তোমার মতো প্রিয়তমাকে ফেলে আমি কি সন্ন্যাসী হতে পারি? অনিকেতের উত্তর। দুজনে সেই আগের দিনের দুষ্টুমি ভরা রোমাঞ্চিত মুহূর্তগুলো আবার ফিরে পায়। রাতের খাবার শেষ করে কিছুক্ষণ টিভি নিউজ দেখে দুজন। নদী বলছিল- আজকাল তোমার লেখালেখিতে অনীহা কেন? এখন আর আগের মতো লিখতে বসো না। আমার ওপর অভিমান করে কি? নাকি সংসার বিবাগী বলেছি বলে?

এটা তো সত্যি। অনিকেত বেশ কিছুদিন যাবৎ লেখালেখিতে মনোযোগ দিতে পারছে না। নইলে প্রতি রাতে লেখায় ডুবে থাকে।

অনিকেত বলে- ও এমন কিছু না। লিখব তো অবশ্যই। একটু বিরতি দিলাম। কোনো কিছু সৃষ্টিতে আমার আনন্দ। তবে সৃষ্টি যেন পাঠককে মুগ্ধ করতে পারে সেদিকে আমার দৃষ্টি। সস্তা লেখা দিয়ে পাঠককে ফাঁকি দেয়াটা আমার মধ্যে নেই। পাঠকের আলোচনা-সমালোচনা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অনিকেত আর নদীর কথা ফুরোয় না। ক্রমশ রাতের গভীরতায় নিস্তব্ধতা নামে। বাইরে মটরযানের শব্দ। রাতের পাহারাদারের হাঁক ডাক। সারাদিনের ক্লান্তি এসে ভর করে দুচোখে। আবার কিছু স্বপ্ন হয়তোবা হানা দেবে ঘুম চোখে। অনিকেত বিচলিত হয়ে বিছানায় উঠে বসবে। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদ নদীর ঘুমন্ত অবয়বে অবারিত জোছনার আলো ছড়াবে। অনিমিখ চোখে অনিকেত তাকাবে নদীর দিকে। স্বপ্ন-দুঃস্বপ্নে, দুঃখ-সুখে, আনন্দ-বেদনায় এভাবে মধ্যাহ্ন জীবনের পথ শেষ হবে একদিন। এভাবেই বহমান সময়ের অনুষঙ্গগুলো আবর্তিত হবে রোজকার জীবন পরিক্রমায়। জীবনযাপনের আশা-নিরাশার দ্ব›দ্ববিধুর প্রেম-অপ্রেমের অনায়াস প্রয়াস থাকবে নদী- অনিকেতের সাদামাটা জীবন জুড়ে। ক্লেদাক্ত জীবনকে অগ্রাহ্য করে ক্রমাগত স্বপ্ন ও সৌন্দর্যের কাছে সমর্পিত হবে দুজন। বিশ্বাস আর প্রত্যয়ে ভালোবাসা আর মমতায় বন্ধন থাকবে অটুট। কিছু স্মরণীয় মুহূর্ত, কিছু সৃষ্টিগাথা জীবনের গৌধূলিবেলায় অপরূপ বিষণœ আলো ফেলবে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj