কংকং : জসীম আল ফাহিম

বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০১৯

বাসার সামনে লনের মতো খোলা একটু জায়গা। সবুজ ঘাসে ঢাকা জায়গাটাতে রক্তজবা ফুলের একটি গাছ রয়েছে। গাছটিতে মেয়েদের কানের ঝুমকোর মতো অনেক রক্তজবা ফুল ঝুলে রয়েছে। নূপুর বিকেলে লনের ঘাসে খালি পায়ে হাঁটাহাঁটি করতে থাকে। প্রায় বিকেলেই সে এভাবে হাঁটাহাঁটি করে। নূপুর হাঁটে আর গুনগুন গান গায়। সে সময় একটি ছোট টুনটুনি পাখি ব্যস্ত হয়ে রক্তজবা ফুলগাছের ডালে বিচরণ করতে থাকে। নূপুর অবাক হয়ে টুনটুনি পাখির বিচরণ দেখে।

এমন সময় ওদের বাসার কাজের লোক কংকং সেখানে ছুটে আসে। নূপুরকে সঙ্গ দেয়াও তার একটি রুটিনবদ্ধ কাজ। নূপুরকে উদ্দেশ্য করে কংকং বলে, লনের মধ্যে একাকী কী করছো নূপুর?

নূপুর বলে, দেখছো না হাঁটাহাঁটি করছি।

কংকং বলে, হাঁটাহাঁটি খুবই ভালো ব্যায়াম। স্বাস্থ্যের জন্যও খুব উপকারী।

কংকংয়ের কথা শুনে নূপুর বলে, তাই নাকি?

কংকং বলে, তো আর বলছি কী?

নূপুর মৃদু পায়ে হেঁটে রক্তজবা ফুলগাছের একেবারে কাছাকাছি যায়। অমনি টুনটুনি পাখিটি ফুড়–ৎ করে উড়ে যায়। কেন উড়ে গেছে কে জানে। হয়তো খুব ভয় পেয়েছে বেচারা। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। নূপুর লনের ল্যাম্পপোস্টের বাতি জ্বালাতে চেষ্টা করে। বারবার সুইচ অন করে। কিন্তু বাতি তো আর জ্বলে না। জ্বলে না কেন?

নূপুর পরে কংকংকে বলে, দেখো তো একবার। বাতিটা জ্বলছে না কেন।

কংকং বলে, দাঁড়াও আমি দেখছি। বলে সে সুইচে হাত দেয়। এক টানে সুইচ বোর্ডটা খুলে এনে কিছু একটা এদিক-ওদিক করে দেয়। তারপর নূপুরকে বলে, এবার সুইচটা অন করো। আশা করি বাতিটা জ্বলবে।

কংকংয়ের কথামতো নূপুর সুইচ অন করে। অমনি বাতিটিও জ্বলে ওঠে। কীভাবে যে কী হয়েছে, কিছুই ভেবে পায় না নূপুর। তবে সে বুঝতে পারে এতে কংকংয়ের কিছু একটা কারিগরি রয়েছে।

তার কিছুদিন পর নূপুরদের কাপড় আয়রন করার ইস্ত্রিটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। নূপুরের মা ইস্ত্রি ঠিক হওয়ার আশা এক প্রকার ছেড়েই দিয়েছেন বলা যায়। কিন্তু নূপুরের মা আশা ছাড়লে কী হবে? নূপুর ছাড়েনি। তাই সে ইস্ত্রিটা নিয়ে কংকংকে দেখায়। নূপুর বলে, ইস্ত্রিটা কাজ করছে না। দেখো তো ঠিক করা যায় কিনা।

কংকং হাত বাড়িয়ে ইস্ত্রিটা নেয়। তারপর ইস্ত্রির লকগুলো খুলে ফেলে। লক খুলে সে এর ভেতরে কয়েকটি তার নিয়ে নাড়াচাড়া করে। এভাবে কিছু সময় নাড়াচাড়া করার পর বলে, নাও। তোমার ইস্ত্রি ঠিক হয়ে গেছে। এখন এটা আগের মতোই কাজ করবে আশা করি।

নূপুর খুশি হয়ে বলে, কংকং তোমাকে ধন্যবাদ।

কংকংও বলে, তোমাকেও ধন্যবাদ।

পরে নূপুর বলে, আচ্ছা। এটা কী করে সম্ভব? বৈদ্যুতিক যন্ত্রগুলো তোমার হাতের ছোঁয়া পেলেই কেমন সচল হয়ে ওঠে।

নূপুরের কথায় কংকং মৃদু হাসে। বলে, আমি একজন ভালো ইলেকট্রিশিয়ান। এসব আমার জন্য কোনো ব্যাপার নয়।

সে দিন স্কুল থেকে বেরিয়ে নূপুর রীতিমতো হতাশ হয়ে পড়ে। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। স্কুল ছুটির পর প্রতিদিন ওর মা এসে স্কুল গেট থেকে তাকে এগিয়ে নিয়ে যায়। যে দিন বাবার অফিস থাকে না, সে দিন বাবাও তাকে নিতে আসেন। কিন্তু আজ মা-বাবা কেউ আসেননি। মা-বাবা কাউকে দেখতে না পেয়ে তার মনটাই খারাপ হয়ে যায়। নূপুর যখন মন খারাপ করে মা-বাবার কথা ভাবছে, ঠিক তখনি কংকং এসে হাজির।

কংকং বলে, সরি! বড্ড দেরি করে ফেলেছি। আরো আগে আমার স্কুল গেটে অবস্থান করার কথা। কিন্তু কী করব বলো? তোমাদের শহরে যানজটের যা অবস্থা! জ্যামের ভেতর দিয়ে এসেছি বলে দেরি হয়ে গেছে।

কংকংকে দেখে নূপুর ভরসা পায়। বলে, কোনো সমস্যা নেই।

দেরি মানুষের হতেই পারে। এটা কোনো ব্যাপার নয়।

নূপুর কংকংকে মানুষ বলেছে শুনে সে হেসে ওঠে। বলে, ভুল বলেছো নূপুর। আমি আসলে মানুষ নই। মানুষের দেরি হলেও হতে পারে। কিন্তু আমার দেরি হওয়া মানায় না।

কংকংয়ের কথা শুনে নূপুর অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, তুমি মানুষ না বলছো কেন? তাহলে তুমি কি?

জবাবে কংকং বলে, আমি একটি যন্ত্র। আমাকে দেখতে অবিকল মানুষের মতো মনে হলেও আমি আসলে মানুষ নই। আমি একটি রোবট। ইলেকট্রিশিয়ান রোবট। তোমাদের বাসায় বৈদ্যুতিক কাজ করার জন্য তোমার বাবা আমাকে কিনে এনেছেন।

কংকংয়ের কথা শুনে নূপুরের চোখ দুটো যেন কপালে গিয়ে ঠেকে। বলে সে, তার মানে আমি এতদিন একটি রোবটের সঙ্গে মিশেছি? গল্প করেছি? খেলাধুলা করেছি?

কংকং বলে, হ্যাঁ রোবটের সঙ্গেই।

নূপুর বলে, আচ্ছা। আমাকে নিয়ে তুমি আগে বাসায় চলো। বাসায় গিয়ে বুঝব তুমি আসলে মানুষ নাকি রোবট।

আধাঘণ্টা সময়ের মধ্যে নূপুরকে নিয়ে কংকং বাসায় ফিরে আসে। বাসার গেটে কলিংবেল ঝুলানো। নূপুর কয়েকবার কলিংবেলে চাপ দেয়। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার! বেল তো বাজে না। বেল না বাজলে বাসার ভেতর কেউ বুঝতে পারবে না যে বাইরে কেউ অপেক্ষা করছে। জলদি গেট খুলে দেয়া দরকার। কিন্তু কলিংবেল না বাজলে কী করা?

কংকং বলে, দাঁড়াও তো দেখি সমস্যাটা কোথায়।

তারপর সে কলিংবেলে হাত রাখে। হাত দিয়ে কিছু একটা নাড়াচাড়া করে। পরে নূপুরকে বলে, নাও। কলিংবেল ঠিক হয়ে গেছে। এবার চাপ দাও।

নূপুর কলিংবেলের সুইচে হাত রাখতেই রিংটোন বেজে ওঠে- ‘আসসালামু আলাইকুম। মেহমান এসেছে। দরজা খুলুন।’

তার কয়েক সেকেন্ড পরই নূপুরের মা এসে গেট খুলে দেয়। নূপুর স্কুল ব্যাগ পিঠে নিয়ে বাসার ভেতর প্রবেশ করে। রুমে ঢুকে সে পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে রাখে। হঠাৎ তার মনে পড়ে আজ বুধবার। প্রতি বুধবার ২টা ৩০ মিনিটে কার্টুন চ্যানেলে একটি বিজ্ঞান কল্পকাহিনী সম্প্রচার করা হয়। এ প্রোগ্রামটি নূপুর নিয়মিত দেখে। টেলিভিশন ছাড়তে গিয়ে নূপুর দেখে রিমোট কাজ করছে না। টিভি অন হচ্ছে না। একবার। দুবার। এভাবে তিনবার সে চেষ্টা করে। তিনবারের মাথায় টিভি অন হয়। কিন্তু ছবি দেখা যায় না। শব্দও শোনা যায় না। স্ক্রিন কেমন ঝিরঝির করছে। কী করা যায় এখন?

পরে নূপুর কংকংয়ের কাছে গিয়ে বিষয়টা খুলে বলে। সে সময় কংকং বেলকনিতে বসে বাবার জুতো জোড়া পালিশ করতে থাকে। কংকং বলে, একটু দাঁড়াও। আমি দেখছি বিষয়টা।

জুতো পালিশ শেষ করে কংকং এসে টিভি রিমোটটা হাতে নেয়। রিমোট হাতে নিয়ে সে কিছুক্ষণ কী যেন টেপাটেপি করে। তারপর বলে, এই নাও রিমোট। টিভি ঠিক হয়ে গেছে।

নূপুর টিভি দেখে আর মনে মনে ভাবে, কংকং যে মানুষ নয়; রোবট- বিষয়টা একবার যাচাই করা দরকার।

যাচাই করার জন্য পরে সে মনে মনে একটা বুদ্ধি আঁটে। বুদ্ধিমতোই সে কাজ করে যায়। টিভি দেখা শেষ হলে নূপুর বাথরুমে প্রবেশ করে। বাথরুমে কোনো কাজ নেই। এমনি এমনি গিয়ে সে ঢোকে। বাথরুমে ঢুকে সে কংকংকে ডেকে বলে, এদিকে একটু এসো তো কংকং। বাথরুমে শাওয়ারটা কাজ করছে না। শাওয়ারটা একটু চালু করে দাও না।

সঙ্গে সঙ্গে কংকং ছুটে যায় নূপুরের কাছে। গিয়ে শাওয়ারটা চালু করতে চেষ্টা করে। শাওয়ারে আসলে কোনো সমস্যা নেই। মিছেমিছি নূপুর কথাটা বলেছে। কংকং বাথরুমে ঢুকে সুইচটা ঘোরাতেই শাওয়ার চালু হয়ে যায়। ঝরনা ধারায় পানি ঝরতে শুরু করে। শাওয়ারের পানিতে কংকংয়ের শরীর ভিজে একেবারে জবুথবু। একপ্রকার গোসল হয়ে যায় তার। কংকংকে ভিজাতে পেরে নূপুর খুশিতে গড়াগড়ি যায়। বলে সে, যাও যাও। জলদি তোমার ভেজা কাপড় ছাড়িয়ে নাও। শুকনো কাপড় পরে এসো।

বলে নূপুরও তার পিছু পিছু যায়। বাথরুম থেকে বেরিয়ে কংকং গায়ের ফুলহাতা ভেজা টি-শার্টটি খুলে ফেলে। টি-শার্ট খুলতেই ওকে দেখে নূপুর অবাক হয়ে যায়। সে দেখে কী- কংকংয়ের সারা শরীরে অনেক পেঁচানো তার। ওর বুকের ঠিক মাঝখানে দুটি বাতি। একটি লাল রংয়ের বাতি। অন্যটি সবুজ রংয়ের। রোবটদের শরীরে এমন বাতির দু-রকম কাজ রয়েছে। শরীর স্বাভাবিক থাকলে সব সময় সবুজ বাতিটি জ্বলে। আর খারাপ হলে লাল বাতিটি জ্বলে থাকে। কংকংয়ের শরীরে সবুজ বাতিটিই জ্বলতে দেখে নূপুর। ওর আশ্চর্য দেহকাঠামো দেখে নূপুর রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে যায়। অবাক হয়ে সে বলে, সত্যিই দেখি তুমি রোবট! আর আমি কিনা তোমাকে মানুষ ভেবে ভুল করেছি। হা হা হা।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj