কবর থেকে মাকে নুসরাতের চিঠি : তানভীর আহমেদ হৃদয়

শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯

মা, আমি জানি, তুমি এবং বাবা কেউই ভালো নেই। ভালো নেই আমার পোষা বিড়াল, ময়না পাখি, পুকুর ঘাটের হিজল গাছটিসহ বাড়ির কোনো প্রাণীই। আসলে পৃথিবী কোনো ভালো থাকার জায়গা নয় মা। ওখানে ভালো মানুষের চেয়ে নিরানব্বই ভাগই খারাপ মানুষের বসবাস। শেকসপিয়ার না বলেছিল, পৃথিবী একটি রঙ্গমঞ্চ আর আমরা সবাই তার অভিনেতা-অভিনেত্রী। পিয়র সাহেব ঠিকই বলেছে মা। পৃথিবী আসলেই একটি রঙ্গমঞ্চ। তা না হলে আমার বন্ধুরা কেন আমার সঙ্গে অভিনয় করল? আমার মাদ্রাসার শিক্ষক কেন আমার সঙ্গে অভিনয় করল? থানার বড় কর্তা, সেও আমার সঙ্গে অভিনয় করল। জনগণের নেতা, সেও তোমাদের সঙ্গে অভিনয় করল। তারা প্রত্যেকে এমনই অভিনয় করল যে, আমাকে একেবারে তোমার বুক থেকে কবরের দেশে পাঠিয়ে দিল মা।

আমি ভালো আছি মা। এখানে আমার কোনো কষ্ট হচ্ছে না। তুমি আর বাবা রাতের আঁধারে জায়নামাজ বিছিয়ে আমার জন্য যে দোয়া করো, তার জন্য আমি অনেক সুখে আছি মা। তোমাদের দোয়ার কারণে মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন আমার সমস্ত গুনাহগুলোকে মাফ করে দিয়েছেন। আমার কবরের জায়গাটা অনেক প্রশস্ত ও চওড়া মা। এইটুকুন বয়সে আমিও কি কম ইবাদত করেছি মা? ফেরেস্তারা আমাকে যে তিনটি প্রশ্ন করেছিল, আমি তার ঠিক ঠিক জবাব দিয়েছি। আমার উত্তর শুনে তারা খুব খুশি হয়েছে। ওনারা দেখতে খুব সুন্দর। পৃথিবীতে এদের মতো সুন্দর কাউকে দেখিনি মা। এদের শরীরের ঘ্রাণও খুব সুন্দর। পৃথিবীতে এমন ঘ্রাণ কিছুতে পেয়েছি বলে মনে পড়ে না। তোমরা আমার জন্য কোনো চিন্তা করো না মা। আমি রোজ রাতে তোমাদের দেখে আসব। তোমাদের মুখের ওপর আমার এই কোমল হাতের পরশ বুলিয়ে আসব। তোমরা কেঁদো না। মহান আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন ওই পিশাচদের হাতেই আমার মৃত্যু লিখেছিলেন। পৃথিবীর এই নরকীটদের হাতেই আমার মৃত্যু লিখেছিলেন। তোমরা হয়তো আমাকে এত দ্রুত হারাতে চাওনি, সেটা আমি বুঝি। আমাকে আরো অনেক বড়, মানুষের মতো মানুষ বানাতে চেয়েছিলে। আমাকে হয়তো আরো বড় আল্লাহওয়ালা, বড় একজন আলেম, বড় একজন পরহেজগার বানাতে চেয়েছিলে কিংবা আমাকে নিয়ে তোমাদের হয়তো আরো অধিক বড় কোনো স্বপ্ন ছিল, যা আমি হতে পারিনি। বেঁচে থাকলে হয়তো হতাম। কিন্তু মা, আল্লাহ পাক যদি না চান, তাহলে কোনো কিছুই সম্ভব না। আল্লাহ রাব্বুল আল আমিন আমাকে এইটুকুই হায়াত দিয়ে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন। তোমরা হাজার চেষ্টা করলেও আমি হয়তো আর কিছুই হতে পারতাম না। আল্লাহর দোহাই লাগে প্লিজ, তোমরা আমার জন্য আর কাঁদবে না। কেঁদে কেঁদে আর বুক ভাসাবে না, নিজেকে আর কষ্ট দেবে না তোমরা।

আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের আরো বহুত হায়াত দান করেছেন। তোমরা বেঁচে থেকে দেখবে- ওই ভণ্ড, মুখোশধারী শয়তান হুজুরের কী পরিণতি হয়। হুজুর আমাকে মেরে, আমার শরীরে আগুন জ্বালিয়ে, আমাকে পাশবিক নির্যাতন করে যে কষ্ট দিয়েছে, তার থেকে বহুগুণ কষ্ট সে দুনিয়াতে ভোগ করবে। তার ঘরেও ছেলেমেয়ে, মা-বোন রয়েছে। সমাজের চোখে সে একটা খুনি, একটা নষ্ট মানুষ, একটা দানব, একটা ভয়নক পতঙ্গ। সমাজের চোখে সে একজন চরম অপরাধী।

মা, তুমি হয়তো কারো কাছে মেয়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে, বিচার না পেয়ে, আদালতে সাক্ষীর অভাবে মেয়ের খুনিকে ফাঁসির দড়িতে ঝোলাতে না পেরে রাগের মাথায় হয়তো বলবে, সমাজ! কিসের সমাজ? যে সমাজ তোমার মেয়েকে বাঁচতে দিল না, যে সমাজে তোমার মেয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারল না, যে সমাজে তুমি তোমার মেয়ের মৃত্যুর বিচার পেলে না, সেটাতো সমাজ হতে পারে না। ঠিক বলেছ মা। কিন্তু সমাজের দোষ কি মা? সমাজ তো আর কাউকে অপরাধ করতে শিখিয়ে দেয় না মা। সমাজ তো তোমার-আমার মতোই কতগুলো মানুষ নিয়ন্ত্রণ করে মা। সমাজ কখনো খারাপ হয় না। সমাজের মানুষগুলোই একেটা নষ্ট, প্রতারক, লেবাসধারী ভণ্ড। তাই বলছি, তোমার আমার জন্য থানা পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে আর সময় নষ্ট করবে না, হয়রান হবে না মা। এই দেশ এই রাষ্ট্র আমাদের সকলের। রাষ্ট্রের সকল কিছু ভোগ করা আমাদের নাগরিক অধিকার। হয়তো আমরা দুর্বল হওয়ার কারণে সেটা ভোগ করতে পারি না। এই ব্যর্থতা আমাদের। রাষ্ট্রের নয় মা। তোমার ভালো থাকবে। আমি ভালো আছি খুব।

তোমাদের আদরের মণি

নুসরাত

(চিঠির বিষয়বস্তু সম্পূর্ণ কাল্পনিক)

:: পাফোস-১০৬৪৫, মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj