আগুনপাখির ডানায় : আহাদ আদনান

শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯

‘তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে?’

‘কঠিন পেইন-কিলার ইনজেকশন নেয়ার মতো কষ্ট, ব্যথা আর নেই। অন্য কিছু কষ্ট আছে। এই কষ্ট ইনজেকশনেও কমে না। অজ্ঞান করে দিলেও বুকটা পুড়ে যায় কষ্টে। কেন বলত?’

‘আমাকে দেখলেই সবাই ভয়ে কুঁকড়ে যায়। ছোঁয়া পেলেই প্রচণ্ড কষ্টে বেঁকে যায় মুখ। এই তোমাকে দেখছি, কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই। খুব মনমরা না হলে এমন হওয়ার কথা নয়’।

‘স্বর্গদূত, তুমি তো পৃথিবীর অনেক কিছুই জানো। অনেক সভ্যতা, ইতিহাস, পটপরিবর্তন তোমার চোখের সামনে ঘটে গেছে। এমন কোথায় দেখেছ তুমি? রোমান সা¤্রাজ্যের পতনের মতন আমাদের ভিত্তিমূল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। সব কিছু ভেঙে পড়ছে। আমার শিক্ষক, আরেক পিতা, সেও কেমন নৃশংস হতে পারে! সেদিনও আমার পরীক্ষার আগে বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। মা একটা গøাসে দুধ এনে জোর করে খাইয়ে দিলেন। ভাইয়ার সঙ্গে এলাম আমি মাদ্রাসায়। ভাইয়া ভিতরে আসতে চেয়েছিল, ওরা দেয়নি। পরীক্ষার হলে বসে আমি মনে মনে পড়া আওড়াচ্ছি। কে জানত, একটু পরেই সব শেষ হয়ে যাবে!’

‘আগুনের সঙ্গে আমার খুব সখ্য হয়ে যাচ্ছে আজকাল। তোমাদের দেশে আমার বাসা বেঁধেছি এই বার্ন ইউনিটে। আমার হাত ধরেই এই মৃত্যুর মিছিল। পেট্রোলবোমা, এসিড, ভবনের আগুন, রাসায়নিকের আগুন, কেরোসিন। জানো তো, আমাদের কোনো আবেগ নেই। অনুভূতি নেই। ভাগ্য ভালো নেই। না হলে এতদিনে আমি পাগল হয়ে যেতাম’।

‘তোমার আর কি দোষ স্বর্গদূত। তুমি তো শুধুই হুকুমের দাস। আমরা তো সৃষ্টির সেরা। তাই আমরা একজন আরেকজনকে পুড়িয়ে দিই। আমাকে যখন বলল, তোমার বান্ধবীকে ছাদে কারা যেন মারছে, আমি দৌড়ে ছুটে গেলাম। সৃষ্টির সেরা জীব কথায় কথায় মিথ্যে বলে। ছাদে দেখি কয়েকজন বোরকা পরা। সেরা জীবরা পোশাকের আড়ালে নিজেদের লিঙ্গপরিচয় ঢেকে রাখার চেষ্টা করে। এরপর একজন আমার চুল খামচে ধরে।’

‘আর শুনতে চাই না আমি।’

‘না, শুনতে হবে। আমরা তোমাদের চেয়ে সেরা। কেন সেরা শুনতে হবে।

ওরা আমার বাবা-মা তুলে গালিগালাজ করছিল।

চুলে টান দিয়ে বলেছিল, তুই হুজুরের নামে কমপ্লেইন করেছিলি? জন্মের মতন তোর কমপ্লেইন বের করছি।

মাথা থেকে শুরু করে সারা শরীর কেরোসিন দিয়ে ভিজিয়ে দিল। আমি চিৎকার করে কান্না করে জীবন ভিক্ষা চাইলাম। একজন আমার মুখটা হাত দিয়ে চেপে ধরল।

ম্যাচের কাঠিটা যখন বাক্সে ঘষে দিল, আর আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি, চোখ ভরতি জল, আর তারচেয়ে বেশি অবিশ্বাস, কণ্ঠনালিটা শেষ বারের মতন একটা গর্জন করে উঠল, আর তারপরেই সেই আগুন।

আমার বোরকাটা পুড়ে ছাই হয়ে গেল। চামড়াটা পুড়ে পুড়ে বিশ্রী কয়লার মতন গন্ধ। ধোঁয়ায়, আগুনে আমার কণ্ঠনালি, ফুসফুস খাক। আমি আর শ্বাস নিতে পারছি না। মানবিকতা, মনুষ্যত্ব, আস্থা, বিশ্বাস এসব পুড়ে অঙ্গার। আমি চিৎকার করছি। আগুনে পুড়ে পুড়ে বাঁচতে চাচ্ছি। হাবিয়া ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হওয়ার জন্য আর্তনাদ করছি।’

‘সৃষ্টির সেরা জীবও চতুষ্পদ জন্তুর চেয়ে নিকৃষ্ট হতে পারে। সৃষ্টিকর্তার এমনই বিধান। তুমি কষ্ট নিওনা, নুসরাত।’

‘সোনাগাজীর গ্রামটায় একটা ছোট পুকুর আছে। এখন অবশ্য তেমন পানি নেই। এই বর্ষাটায় আর আমি সাঁতরাতে পারব না, স্বর্গদূত? আমাদের বাড়ির পিছনে অনেকগুলো আম গাছ। এই বৈশাখে কাঁচা আম নুন আর কাসুন্দি দিয়ে তোমাকে মেখে দিলে জীবন নেয়ার কথা তুমি ভুলে যাবে। আমার মা সাজনা দিয়ে যে ডাল রান্না করে, তুমি একবার স্বাদ নিলে আঙুলটাই চেটে খেয়ে ফেলবে। তুমি যাবে একবার আমাদের গ্রামে। কিংবা আমাকে একটিবার, আর একটিবার, দিবে যেতে?’

নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের বোকা বোকা যন্ত্রগুলো পিপ পিপ করছে। কয়েকজন চিকিৎসক নুসরাতের শিরা ফুঁড়ে ওষুধ দিচ্ছেন একটার পর একটা। পুড়ে যাওয়া শরীরটা গজে প্যাঁচানো। চোখ বুজে আছে। কৃত্রিম শ্বাসের যন্ত্রটা ফুসফুসটাকে টেনে টেনে তুলছে। ঘুম কাতুরে মেয়েটাকে যেভাবে মা সকালে টেনে তোলেন। ওঠ নুসরাত, ওঠ মা। হৃৎপিণ্ডটা প্রতি মিনিটে পাটিগণিত কষছে। পঞ্চাশ, চল্লিশ, ত্রিশ, কুড়ি, দশ। ইসিজির বক্ররেখাগুলো সোজা হয়ে যাচ্ছে।

‘নুসরাত, তোমার সময় হয়ে এসেছে। স্বর্গে ডাক পড়েছে। চলো যাই।’

‘আমাকে নিয়ে যাবে, স্বর্গদূত? সোনাগাজীতে আর যেতে দিবে না তাহলে? বেশ, চলো তাহলে।’

:: মাতুয়াইল, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj