মায়ের আবদার : মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ

শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০১৯

মবিন মাদ্রাসায় যেতেই চায়নি। কিন্তু মায়ের আবদার আর নিয়ত- তিন ছেলের একটাকে হাফেজ বানাবেন। এতে ওদের মরা বাপের আত্মার শান্তিও হতে পারে। এই ধারণার ভিত্তি খুবই শক্ত।

মাদ্রাসায় যেতে হয় ভোরে। দুপুরের জন্য খাবার সঙ্গে নিতে হয়। আর একটা রঙিন সাইকেল তার সঙ্গী।

সমস্যাটা হলো পাঁচ-ছয় বছর পর। সবাই এত ভালো ছেলে বলছে, আর এখন সে কিনা আর মাদ্রাসায় যাবে না। যাবেই না।

মায়ের দুশ্চিন্তা। ধমক-ধামক শেষে গায়ে হাত পর্যন্ত ওঠাতে হয়েছে। কাজ হয়নি।

কিন্তু কারণটাতো বলবি?

কোনো কথাই সে বলে না। কেবল ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে হাসে।

ঘরে বসে থাকে সারাদিন। খেলাতেও যায় না।

মাদ্রাসার একবাল হুজুর এসে শাসিয়ে গেছে। লোকজনও লাগিয়ে গেছে। কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না, কারো কথাই আমলে নিচ্ছে না মবিন।

অন্য দুই ভাই স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মাদ্রাসায় ঢুঁ দেয়। কিন্তু ওদেরও সাহস হয় না- ঘটনাটা বোঝার বা কাউকে কিছু বলার।

একদিন সরাসরি মবিনের মা-ই মাদ্রাসায় ঢুকে পড়লেন।

সবাই একটু হতভম্ব হয়ে তাকাল।

-মহিলা মানুষ। এভাবে হুট কইরা ডুইক্কা পড়লেন যে? বাড়িতে কি বেডা মানুষ নাই?

-মবিনের বাপ নাই। আমি হেগো মা, আমিই বাপ।

-আরে মাইয়া মানুষ আবার বাপ হয় ক্যামনে। সার্জারি করতে অইব।

চারপাশের মানুষগুলার হাসি শরীরে মনকাঁটা ফুটাচ্ছিল।

মবিনের মা বের হয়ে আসেন।

ছেলেকে নিয়ে যত দুশ্চিন্তা ভর করে। তাহলে কি সব আশা, স্বপ্ন ব্যর্থ?

এমন সময় পেছন থেকে কেউ ডাকল- আন্টি।

একটা মেয়ে। মুখটা খোলা। পরনে নীল একটা বোরখা, মাথায় লাল হিজাব। মুখটা চাঁদের মতো কোমল আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছিল।

-কী? কিছু বলবা?

-আন্টি, মবিন আসে না ক্যান?

-হেইডাতো আমারও কতা? সে ক্যান মাদ্রাসায় আসতে চায় না। তুমি কি…?

-আমিও হের সঙ্গে পড়ি। হে খুবই ভালো ছেলে। আমার খুব পছন্দ। আমার মনে হয় আমাগো বড় হুজুরের লগে কিছু একটা সমস্যা অইছে। আমি ততটা জানি না। মবিন আর হুজুরে বেশ ঝগড়া হইছে। মাইরও দিছে মবিনরে।

মায়ের বুকের ভেতরে কেউ মনে হয় শিক পুড়িয়ে আমূল ঢুকিয়ে দিয়েছে। যে ছেলেকে একবাড়া ভাত দিলেই চুপচাপ খেয়ে ওঠে, সে কিনা ঝগড়ার জন্য মার খাবে?

বাড়িতে গিযে সোজা ছেলের সামনে দাঁড়াল মা।

এবার একটু ভয়ই পেয়ে গেল মবিন।

মায়ের প্রশ্নগুলো একটার পর একটা বল্লমের মতো গায়ে পড়তে থাকে। তাতেও তার মুখে কথা ফোটে না।

কিন্তু মায়ের চোখের পানি সহ্য হলো না।

মবিন এবার মুখ খোলে।

-বড় হুজুর আমারে গঞ্জের বাজারে যাইতে বলেছিল। মাদ্রাসার চাঁদা তুইলা আনতে বলেছিল।

-তা খারাপ কি আর বলেছেন? তুই যাইতে পারতি। তরে ইনকামের একটা উপায় কইরা দিছিল। হুজুর গো কথা শুনতে হয়। না শুনলে গুনাহ।

-না মা, আমি ভিক্ষা করাডা পছন্দ করি না। তাছাড়া ভিক্ষা কইরা আমারে খাইতে অইব এইডা ভাবলা ক্যামনে?

এবার আরো একটি উত্তর বা কারণ জানতে চায় মা- ওইযে সেই মেয়েটা। রাইসা নাকি নাম। তার সঙ্গে কি হইছে?

-তার সঙ্গে? কই? কিছু না?

-আমার লগে সত্যিটা কথা ক… নাইলে কিন্তু…

-আসলে তুমি যা ভাবছো, তা না। বড় হুজুরে হেরে ঘরে নিয়া আবল তাবল কী সব কয়? আমার সহ্য হয় না।

-তরে এইসব শুনতে কে কইছে? তরে যেই কামে পাঠাইছি তোর উচিত তা শেষ করা। ওইসব চিন্তা বাদ দে…

-মা, একটা মেয়ে মানুষরে একটা লোক দিনের পর দিন আকথা-কুকথা বলব, আর এইসব অন্যায় আমি দেইখা শুইনা চুপ থাকুম?

-বেশি নেতাগিরি শিখ্যা ফালাইছ। এইসব তোর কাম না। বড় হুজুর যদি খ্যাপে তাইলে তো পরিণতি খুব খারাপ।

মবিনকে মা বোঝায়, চাচি বোঝায়, বড় ভাইয়েরা বোঝায়, প্রতিবেশীরা বোঝায়। কিন্তু মবিনের ওই একটাই উত্তর- আমি অন্যায়ডা সহ্য করতে পারি না।

রাইসাকে এবার সইতে হচ্ছে টিপ্পনী। ধমকের নানা কিসিম।

বড় হুজুর ওর বাবা-মাকেও শাসান। মবিনকে ঘিরে নানা অলঙ্কারখচিত সংলাপ শোনান। একপর্যায়ে রাইসাকে সুযোগমতো দরজা বন্ধ করে বিয়ের প্রস্তাব দেন। রাইসা তাতে রাজি না হওয়ায় তিনি আরো ক্ষিপ্ত হন মবিনের ওপর। বলেন- মবিন্যা, তুই আমার কলিজায় হাত দিছস!

রাইসাও মবিনকে মানা করেছে এসবে না জড়াতে।

মবিন কেবল এটাই শুনিয়েছে- আমার বোইন নাই। তুমি আমার বোইনের মতো। তোমারে একটা বুইড়া গাধা, তিন বৌঅলা, পাঁচ সন্তানের বাপে বিয়ার প্রস্তাব দিব হেইডা ক্যামনে সহ্য করি? কও?

মায়ের মনে ভয়ের পরে ভয় এসে আছড়ে পড়ে। বড় হুজুরের হাত অনেক লম্বা আর শক্ত। তাদের বাপ চাচারা শক্তিশালী লোক। কেউ তাদের বিরোধিতা করতে পারে না। মবিন এসব মানতে চায় না। বলে- মা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করাটাও তো মানুষের কাজ।

সারাদিন কাটল উদ্বেগ আর দুশ্চিন্তায়।

রাতটাও কেটে গেল অনিদ্রায়। সকালেই মসজিদের মাইকে ঘোষণা হলো- রাইসার মৃত্যু সংবাদ। ওকে কারা যেন পুড়িয়ে দিয়েছে গায়ে পেট্রোল ঢেলে।

মবিন ঘুম ভেঙ্গেই এই দুঃসংবাদটা মেনে নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে ওর মাথায় বড় বড় পাথর ছুঁড়ে মারলেও আঘাতটা তত লাগত না।

দরজা খুলে সোজা বেড়িয়ে গেল সে। মা পেছন পেছন ছুটছেন। ঘুম ভেঙ্গে অগোছাল ছেলেটা হাতে একটা ছুরি নিয়ে বেড়িয়েছে, বিষয়টা কেমন যেন উটকো একটা আতঙ্কিত লাগছিল। আর রাইসার ঘটনাটাও টর্নেডোর তীব্রতায় প্রবল আক্রোশে উপক‚ল ভেঙ্গেচুড়ে অগ্রসর হচ্ছিল।

তবে ব্যাপারটা বুঝতে আর বাকি নেই।

মাও এবার ছুটছেন। হাতে বাঁশের লাঠি।

:: শ্যামগঞ্জ বাজার, ময়মনসিংহ

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj