বৈশাখী বাঘ : মহিউদ্দীন আহ্মেদ

বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০১৯

কিনে দিয়েছেন- কদমা, খই, হাওয়াই মিঠাই, ভুভুজেলা। বেলুন, বাঁশি, খেলনা গাড়ি, মিষ্টি-দধি। নিমকি, বাদাম। জুস। চুইংগাম আরো কত কী!

দেখিয়েছেন বায়োস্কোপ, নাগরদোলা, বৈশাখী র‌্যালি। কাগজের তৈরি হাতি-ঘোড়া-ব্যাঙ, রাজা-প্রজা-উজির-নাজির-সং।

এখন রাত সাড়ে দশটা।

সারাদিন কেটেছে আনন্দ-উৎসবে। হই-হুল্লোড় করে। দুপুরে ঘুমানোর সময় হয়নি। মা-বাবা ভেবেছিলেন, রুস্তম আলী আজ আগে আগেই ঘুমিয়ে যাবে। কিন্তু না। ঘটনা ঠিক তার উল্টো হয়েছে। রুস্তম আলীর চোখে ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। নতুন কেনা খেলনা গাড়ি নিয়ে খেলছে। ভীষণ ব্যস্ত সে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, রাত একটা দুটোর আগে তার চোখে ঘুম আসবে না।

কিন্তু রস্তমের বাবার অফিস আছে কাল সকালে। সারারাত জেগে থাকলে তিনি সকালে উঠতে পারবেন না। এই কারণে রুস্তমের ঘুমানো দরকার।

সায়মা বেগম বললেন, ‘বাবা রুস্তম! অনেক রাত হয়েছে। এখন ঘুমাও।’

রুস্তম বলল, ‘মা তুমি দেখছ না- আমি খেলা করছি!’

সায়মা বেগম বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘তা আর কত?’

রুস্তম বলল, ‘আর পাঁচ ঘণ্টা!’

‘রুস্তমের বাবা! শোনো তোমার ছেলে কী বলে!’ -বলে ডাক দিলেন সায়মা বেগম।

রজ্জব আলী এলেন। রুস্তমের পাশে বসে রহস্য করে বললেন, ‘যদি আমার কাঁধে ঘুমাও দারুণ একটা গল্প শোনাব।’

রস্তম খুশি হয়ে বলল, ‘দাঁড়াও! গাড়িগুলো সাজিয়ে রেখে নিই।’

‘ঠিক আছে বাবা।’

রুস্তম আলী বাবার কোলে চড়ে বসল। কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। বলল, ‘তাড়াতাড়ি শুরু করো গল্প।’

রজ্জব আলী লাইট বন্ধ করে দিলেন। ঘরে হাঁটতে হাঁটতে গল্প শুরু করলেন।

‘জঙ্গল থেকে একটা বাঘ রাস্তা ভুলে ঢুকে পড়ল গ্রামে। বিলু নামের একটা ছেলে ডাঙ্গুলি খেলছিল। বাঘটা তাকে কামড়ে দিল।

সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের মানুষ বাঘটিকে লাঠি, বর্শা, টেঁটা, দা-বঁটি ইত্যাদি নিয়ে তাড়া করল। বাঘটি দৌড়াতে লাগল। পেছনে মানুষ। সামনে বাঘ। ও মাই গড। সে কি দৌড় রে বাবা!

দৌড়াতে দৌড়াতে বাঘটা ঢুকে পড়ল শহরে। গ্রামের মানুষের দাবড়ানি খাওয়ার পর বাঘটি এবার শহরের মানুষের দাবড়ানিতে পড়ল।

গ্রামে তবু দৌড়ানের জায়গা ছিল। শহর তো ঘিঞ্জি। বাড়ির পর বাড়ি। তার ওপর গাড়ি, রিকশা দোকান-াট আরো কত কী! বাঘ যেদিকে দৌড় দেয় সেদিকেই রাস্তা বন্ধ। যেদিকেই বাঘ যায়, দলে দলে মানুষ হইহই করে ওঠে।

কিছুক্ষণের মধ্যে সে ক্লান্ত হয়ে পড়ল। এর মধ্যে একটি ট্রাক এল ঝড়ের গতিতে। তার ওপর উঠে পড়ল। হাতের ওপর দিয়ে গেল ট্রাকের চাকা। বাঘটি প্রচণ্ড ব্যথা পেল ঘাড় আর মুখে। রক্ত পড়তে লাগল দরদর করে।

সে নড়তে পারল না। ব্যথার যন্ত্রণায় নিশ্চুপ হয়ে পড়ল।

পুলিশের গাড়ি এল। আর একটি অ্যাম্বুলেন্স। এল একজন পশু ডাক্তার।

তিনি ভিড় ঠেলে বাঘের কাছে যেতে যেতে বললেন, আহা এটা কোনো কথা হলো? কেন মারতে হবে বাঘটিকে? না হয় বনের বাঘটি ভুলে ঢুকে পড়েছে শহরে। তাই বলে তাকে মারতে হবে?

এসব বলতে বলতে তিনি বাঘটিকে একটি ইঞ্জেকশন দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সে অজ্ঞান হয়ে গেল। তার চোখ বন্ধ হয়ে গেল। মাথাটি ঢলে পড়ল।

কর্মীরা ধরাধরি করে তাকে অ্যাম্বুলেন্সে তুলল। হুইসেল বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি চলে গেল।

অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলো বাঘটিকে। ওর হাতের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। হাড় জোড়া দেয়া হলো। রক্ত মুছে শরীরের কয়েক জায়গার চামড়ায় সেলাই দেয়া হলো।

তারপর অপারেশন থিয়েটার থেকে আনা হলো বেডে।

ডাক্তার আশা করেছিলেন এক ঘণ্টার মধ্যে তার জ্ঞান ফিরবে। কিন্তু অপারেশনের পর তিন ঘণ্টা কেটে গেল। জ্ঞান ফেরার কোনো নাম-গন্ধও নেই। ডাক্তার চিন্তিত হয়ে পড়লেন।

ফেরে না ফেরে না- বাঘের তো জ্ঞান ফেরে না। এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা তিন ঘণ্টা- এভাবে চব্বিশ ঘণ্টা কেটে যায়। বাঘের আর জ্ঞান ফেরে না। ডাক্তারের চিন্তা বেড়েই চলে।’

‘মরে গেল নাকি?’ জানতে চাইল রুস্তম।

বাবা বললেন, ‘কী জানি। হতেও পারে। আবার না-ও হতে পারে।’

‘তারপর কী হলো?’

‘পর দিন এই ঘটনা খবরের কাগজে উঠল। টেলিভিশনে খবর দেখালো। পৃথিবীর সব দেশের মানুষ জানতে পারল ঘটনাটা।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বললেন, বাঘটা পাঠিয়ে দাও! আমরা চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলি।

যুক্তরাজ্যের রানী বললেন, এক্ষুনি ওকে পাঠিয়ে দিন। দ্রুত সারিয়ে তুলবে আমাদের চিকিৎসকরা।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী বললেন, পাঠিয়ে দিন, আমরা খুব যতেœর সঙ্গে সুস্থ করে তুলব ওকে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী বললেন, প্রয়োজনে আমরা এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ডাক্তার পাঠাচ্ছি। তবু চাই, বাঘটি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক।

বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বললেন, কেন? পাঠাব কেন? আমাদের ডাক্তার আছে না? আমাদের বাঘ আমরাই সুস্থ করব।

বললেন বটে। কিন্তু বাঘ তো ভালো হয় না। বাঘের তো জ্ঞান ফেরে না।

সারা দেশের মানুষ চিন্তিত হয়ে পড়ল। টেলিভিশন চ্যানেল ঘণ্টায় ঘণ্টায় বাঘের খবর প্রচার করতে লাগল। লোকজন কাজ থামিয়ে টিভির সামনে বসে পড়ল। উপসনালয়ে বাঘের জন্য প্রার্থনা করা হলো।

প্রেসিডেন্টের পর প্রধানমন্ত্রী টেলিভিশন ভাষণে বললেন, আমি দেখতে চাই বাঘটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। এজন্য যা যা করণীয় আপনারা করুন।

বাংলাদেশে যত পশুচিকিৎসক আছেন, সবাই মিলে মিটিংয়ে বসলেন। তাদের যার যত জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা আছে, সব নিয়ে আলোচনা করতে লাগলেন।

হঠাৎ একটি সাদা রংয়ের গাড়ি এল হাসপাতালের সামনে। ভিড় ঠেলে গাড়িটি হাসপাতাল গেটে পৌঁছাল।

গাড়ি থেকে কে নামল জানো?

রুস্তম আলী বলল, ‘কে?’

‘বিলু। বিলুর কথা মনে আছে তো?’

‘হ্যাঁ। বাঘ ওকে কামড়ে দিয়েছিল।’

‘ঠিক তাই। কামড় দেয়ার পর বিলুকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এখন সে মোটামুটি সুস্থ হয়ে উঠেছে। সুস্থ হওয়ার পর যখন বাঘের এই পরিস্থিতির কথা জানতে পারে তখন সে ডাক্তারদের অনুরোধ করে বলল, সে বাঘটিকে দেখতে চায়। হাসপাতালের ডাক্তাররা তার আসার ব্যবস্থা করে দিলেন।

যাই হোক। বিলু দূর থেকে দেখল, বাঘটি অচেতন হয়ে শুয়ে আছে। দেখে খুব খারাপ লাগল তার। কান্না চলে এল। সে ধীরে ধীরে বাঘটির কাছে গেল। বাঘের মাথায় হাত বুলাল। মনে মনে দোয়া করল, বাঘটা যেন না মরে। সে যেন বেঁচে থাকে।

বাঘটি নড়েচড়ে উঠল। চোখ মেলে তাকাল। ডাক্তারদের মুখে হাসি ফুটল।

টিভি নিউজে লাইভ দেখানো হলো, বাঘটি ধীরে ধীরে সেরে উঠছে।

রুস্তমের চোখেও ঘুম চলে এল।

সায়মা বেগম আগেই বিছানার নিচে অয়েল ক্লথ দিয়ে বিছানা পরিপাটি করে রেখেছিলেন। রজ্জব আলী তাকে শুইয়ে দিলেন। সায়মা বেগম ঘুমন্ত ছেলের কপালে একটি চুমো দিলেন।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj