লেক কক্কলের জলদানব

বুধবার, ১০ এপ্রিল ২০১৯

সুলতানা বাড়ি ফিরছে। সময়টা সন্ধ্যা। বৃষ্টির বেগ বাড়তেই ছাতাটা মেলে দিল সে। সামনের রাস্তাটা দুদিকে ভাগ হয়ে চলে গেছে। বড় রাস্তাটা নিরাপদ হলেও অনেক সময় লেগে যাবে বাড়ি পৌঁছাতে। বামের কাঁচা পথটা শর্টকাট। সময় বাঁচাতে বামের রাস্তাটাই বেছে নিল সে। রাস্তাটা একটু এগিয়ে লেক কক্কলের পাড় ঘেঁষে চলে গেছে। লেকটার দিকে চোখ পড়তেই শিউরে উঠল সুলতানা। লেকে একটা ভয়ঙ্কর দানবের বাস, এ কথা স্থানীয় লোকের মুখে মুখে ফেরে। বিশাল আকারের সাপের শরীরে উটের মাথা লাগানো- এরকম দেখতে নাকি সেই দানবটা।

এদিকে বৃষ্টির বেগ বেড়েই চলছে। পড়নের লম্বা পোশাকের নিচের দিকটা ভিজে গেছে। সুলতানা দ্রুত পা চালাতে গিয়ে থমকে গেল। তার দৃষ্টি আটকে গেছে লেকের মাঝ বরাবর। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে পানিতে বিচিত্র আলোড়ন দেখা দিয়েছে। ধোঁয়াটে কুয়াশার মতো আবরণ ভেদ করেই দেখা যাচ্ছে সেখানে বিশাল একটা সচল কিছুর অস্তিত্ব। আতঙ্কের প্রথম ধাক্কাটা সামলে দৌড় দিল সুলতানা। সেই দৌড় থামল একেবারে বাড়ি গিয়ে। জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত তার মুখে শোনা গেল একটাই শব্দ, দানব, লেকের দানব…।

লেক কক্কলের অবস্থান দক্ষিণ কাজাখস্তানে। জলদানব বসবাসের জনশ্রæতি ছাড়াও আরো কিছু মিথ ঘিরে রেখেছে এই লেকটিকে। যুগ যুগ ধরে এসব কিংবদন্তির ডালপালা গজিয়েছে। সামান্য দৃষ্টিভ্রম পরিণত হয়েছে বিশ্বাসে। লেক কক্কলের জলদানবরহস্য ভেদ করতে অবশেষে এগিয়ে আসেন পর্যটক আনাতোলি পেখারস্কি। ১৯৭৩ সালে প্রথমবারের মতো লেকটিকে দেখতে যান তিনি। ছেলের সাহায্যে দীর্ঘসময় লেকটিকে পর্যবেক্ষণ করেও প্রথম অভিযাত্রায় হতাশ হতে হয় তাকে। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত তথ্য পেয়ে অবাক হন তিনি। খরা হোক বা বৃষ্টি হোক, সবসময়ই লেকের পানি একই রকম থাকে। উচ্চতার কোনো পরিবর্তন হয় না।

পরবর্তী পর্যবেক্ষণে লেকের ভেতর থেকে অদ্ভুত শব্দ শুনলেন তিনি। শক্তিশালী যান্ত্রিক হুইসেলের মতো সেই শব্দের কোনো উৎস খুঁজে পাওয়া গেল না। একদিন ছেলের সঙ্গে বসে দূরবীন দিয়ে লেকটিকে দেখছিলেন তিনি। হঠাৎ দেখলেন পাড় থেকে ৭-৮ মিটার দূরের পানিতে অদ্ভুত আলোড়ন। পানির নিচে বিশাল আকৃতির আঁকাবাঁকা কি যেন নড়ছে। আলোড়ন দেখে মনে হয় পানির নিচে বিশাল কোনো সাপের মতো কিছু একটা চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। ভালো করে দেখার আগেই জিনিসটা চলে যায়।

সব দেখে আগ্রহ বেড়ে গেল তার। তবে বিশ্লেষণটা চালালেন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে। লেকের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা জানতে গিয়ে সাহায্য নিলেন ভূ-তত্ত্ববিদ বি. ভলস্কভের। জানা গেল, লেক কক্কল সৃষ্টি হয়েছিল হিমবাহ থেকে। ফলে এর তলদেশে মাটি, নুড়ি-পাথরের স্ত‚প জমেছে। এসবের আড়ালে তারা আবিষ্কার করেন সাইফনিক ক্যানাল বা প্রাকৃতিক গহŸর। এসব গহŸরে লেকের বাড়তি পানি চুঁইয়ে বের হওয়ার সময় পানিতে সাপসদৃশ্য আলোড়ন দেখা যায় এবং হুইসেলের মতো শব্দ হয়। এ জন্য লেকের পানি কখনো বাড়ে বা কমে না।

:: অনন্ত আহমেদ

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj