বিশ্বব্যাপী নারীর স্বাস্থ্য সমস্যা ফিস্টুলা

সোমবার, ১ এপ্রিল ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

রতœার (ছদ্মনাম) বয়স তখনো ১৪ হয়নি। পরিবারের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়েছিল ওকে। এর দুই বছর পর প্রথম গর্ভবতী হয় রতœা। হাসপাতালে সন্তান প্রসবে রতœার আগ্রহ থাকলেও তাতে আপত্তি ছিল শ্বশুর বাড়ির লোকজনের। সিদ্ধান্ত হয় রতœার সন্তান প্রসব হবে বাড়িতেই। প্রসব ব্যথা নিয়ে দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর রতœাকে নেয়া হয় হাসপাতালে। জ্ঞান ফিরলে রতœা জানতে পারে তারা সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। এর কয়েক মাস পর রতœা বুঝতে পারে, সে ফিস্টুলা রোগে ভুগছেন।

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, এ রোগকে বলা হয় অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা। দেশে রতœার মতো অনেক নারী দীর্ঘদিন ধরে এই রোগে ভুগে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। শুধু বাংলাদেশেই নয় ফিস্টুলা বিশ্বব্যাপী নারীর একটি স্বাস্থ্য সমস্যা।

চিকিৎসকদের মতে, প্রসবকালীন ফিস্টুলা সাধারণত হয়ে থাকে বাধাগ্রস্ত প্রসব থেকে; প্রসব ব্যাথা ১২ ঘণ্টার বেশি স্থায়ী হলে অথবা প্রসবপথে সন্তান ১২ ঘণ্টার বেশি আটকে থাকলে নারীর যৌনিপথ, মূত্রনালি ও পায়ুপথের মধ্যে ক্ষত সৃষ্টি হয়। এ সমস্যায় আক্রান্ত নারীর প্রসবের রাস্তা দিয়ে সবসময় পেশাব বা পায়খানা বা উভয়ই ঝরতে থাকে। প্রতিটি রাত তাদের ভেজা বিছানায় ঘুমাতে হয়। ফিস্টুলা আক্রান্ত অনেকেই পরিবার ও সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। বিষণœতা, অর্থকষ্ট, একাকিত্ব তাদের জীবন আরো দুর্বিষহ করে তোলে।

বাংলাদেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলায় আক্রান্তদের ওপর সর্বশেষ সমীক্ষা হয়েছিল ২০০৩ সালে। ইউএনএফপিএ এবং এনজেন্ডার হেলথ বাংলাদেশ এই সমীক্ষা পরিচালনা করে। ২০০৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৭১ হাজার। প্রতি বছর অন্তত দুই হাজার ফিস্টুলায় নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে। এরপর ২০১৬ সালে ফিস্টুলা রোগীর হালনাগাদ সংখ্যা নিরুপণে ‘বাংলাদেশ ম্যাটারনাল মরটালিটি এন্ড মরবিডিটি সার্ভে’ শীর্ষক একটি জরিপ পরিচালনা শুরু করে সরকার। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ, ফিস্টুলা কেয়ার প্লাস এনজেন্ডার হেলথ, মিজার ইভালুয়েশন যৌথভাবে এই জরিপের কাজ করে। এই সমীক্ষা অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মহিলাজনিত ফিস্টুলা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৫০০। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা বলছেন, বর্তমান সরকারের নানামুখী উদ্যোগের ফলে দেশে মাতৃ স্বাস্থ্যসেবা ও প্রসব সেবার অনেক উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন প্রচারের ফলে ফিস্টুলা নিয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতাও বেড়েছে। তাই এ রোগের আক্রান্তের হারও কমেছে।

উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল হয়েছে প্রায় একশ বছর আগে। তবে বাংলাদেশসহ বিশে^র প্রায় ৫০টি দেশে এই সমস্যায় এখনো ভুগছেন কয়েক লাখ নারী। ২০১৬ সালে পরিচালিত এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বিশে^র সবদেশ মিলিয়ে এই সংখ্যা দশ লক্ষাধিক। ২০১৮ সালের ২ থেকে ৮ ডিসেম্বর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত হয় অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা সম্পর্কিত ৭ম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। সম্মেলনে বিশে^র প্রায় ২৫টি দেশের ৫ শতাধিক প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। নেপাল সোসাইটি অব অবস্ট্রেটিকস এন্ড গাইনিকোলজি ও ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব অবস্ট্রেটিক ফিস্টুলা সার্জনসের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সম্মেলনে সহ-আহ্বায়ক ছিল- ইউএসএইড, জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল, এনজেন্ডার হেলথ ইউএসএ, ফিস্টুলা ফাউন্ডেশন, ডাইরেক্ট রিলিভ ও ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ।

এনজেন্ডার হেলথ্ বাংলাদেশের ফিস্টুলা কেয়ার প্লাস প্রকল্পের দেশীয় প্রকল্প ব্যবস্থাপক ডা. এস কে নাজমুল হুদা অন্যপক্ষকে বলেন, সম্প্রতি অস্ত্রপ্রচার জনিত ও আঘাত জনিত ফিস্টুলা মহিলাজনিত ফিস্টুলার একটি বড় কারণ হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে। বাংলাদেশে এখন প্রায় ২৫-৪০ শতাংশ মহিলাজনিত ফিস্টুলার কারণ হলো অস্ত্রপ্রচার জনিত আঘাত। সাধারণত জরায়ু অপসারণের জন্য যে অস্ত্রপ্রচার করা হয় সেখান থেকেই এই সমস্যা হয়ে থাকে। কখনো কখনো সিজারিয়ান সেকশন অপারেশনের পরও মহিলাজনিত ফিস্টুলা হতে দেখা যায়। কাঠমান্ডুতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে অস্ত্রপ্রচার জনিত ফিস্টুলার ওপর বিশেষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে।

তিনি জানান; জাতিসংঘ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ^ থেকে ফিস্টুলা নির্মূলের ঘোষণা দিয়েছে। এই সময়ের মধ্যে দেশগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যেন নতুন করে কেউ ফিস্টুলায় আক্রান্ত না হয়। এজন্য প্রয়োজন শতভাগ বাধাগ্রস্ত প্রসব মানসম্পন্ন সেবার আওতায় আনা। বিশ^জুড়ে এখন প্রায় ৬০ লক্ষ মহিলা বাধাগ্রস্ত প্রসবের শিকার হন। তাদের সবার জন্য শতভাগ সেবা নিশ্চিত করা নিঃসন্দেহে একটা বড় দায়িত্ব। ফিস্টুলামুক্ত বিশে^র জন্য একই সময়ের মধ্যে সব ফিস্টুলা আক্রান্ত মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হবে। অপারেশনের মাধ্যমে শতকরা ৮০ ভাগ ফিস্টুলা সারিয়ে তোলা সম্ভব। বর্তমানে যে হারে এই সার্জারি করা হচ্ছে তাতে করে ২০৩০ সালের মধ্যে সবাইকে অপারেশন করে সারিয়ে তোলা সম্ভব হবে না। এ জন্য এশিয়া ও আফ্রিকার যেসব দেশে প্রসবজনিত ফিস্টুলা একটি বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত তাদের উচিত সার্জারি সেবা আরো সম্প্রসারণ করা। যাতে করে অতিদ্রুত সব ফিস্টুলা আক্রান্ত মহিলাকে সার্জারির মাধ্যমে সারিয়ে তোলা যায়। ফিস্টুলা থেকে মুক্তির ৩য় শর্ত হচ্ছে যেসব মহিলাজনিত রোগীদের ধারাবাহিক বা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা প্রয়োজন তাদের জন্য সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিছু কিছু মহিলাজনিত ফিস্টুলা রোগী আছেন যাদেরকে অপারেশনের মাধ্যমে সারিয়ে তোলা সম্ভব নয় তাদের জন্য এই সেবা খুবই জরুরি। ফিস্টুলামুক্ত দেশের ৪র্থ শর্ত হচ্ছে যেসব ফিস্টুলা রোগীদের পুনর্মিলন ও পুনর্বাসন সেবা প্রয়োজন তাদের জন্য সেই সেবা নিশ্চিত করা।

ফিস্টুলা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সায়েবা আখতার বলেন, এই রোগ প্রতিরোধ করা খুব কঠিন নয়। সব বাধাগ্রস্ত প্রসবের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে পারলে এই রোগ প্রতিরোধ করা যায়। তাছাড়া সার্জারি সেবার মান বিশেষ করে সিজারিয়ান সেকশন ও জরায়ু অপারেশনের অপারেশন নিরাপদ করা গেলে ফিস্টুলা ঝুঁকি কমবে।

চিকিৎসা পাওয়া যায়

ইউনিভার্সিটি ফিস্টুলা সেন্টার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল ফিস্টুলা সেন্টার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ এবং মিটফোর্ড হাসপাতাল, সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজশাহী ময়মনসিংহ, খুলনা, রংপুর, চট্টগ্রাম, শেরেবাংলা এবং বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুমুদিনী হাসপাতাল, দিনাজপুরের ল্যাম্ব হাসপাতাল, আদ্-দ্বীন হাসপাতাল, যশোরের আদ্-দ্বীন সকিনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, খুলনায় আদ্-দ্বীন আকিজ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডা. মুত্তালিব কমিউনিটি হাসপাতাল, মাম্স ইনস্টিটিউট অব ফিস্টস্টুলা এবং উইমেন্স হেলথ, কক্সবাজারের রামুতে হোপ ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বিনামূল্যে প্রসব জনিত ফিস্টুলায় আক্রান্তদের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে এই চিকিৎসা সেবা খুবই কম। এ ছাড়া রয়েছে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও নার্স সংকটও।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj