নীরবে মুখ লুকিয়ে

সোমবার, ১ এপ্রিল ২০১৯

কাঞ্চন রানী দত্ত

ডারউইনের যোগ্যতমের টিকে থাকার তত্ত্বটি আজ আগামী সব দিনের জন্য প্রযোজ্য। নারীকেও এই টিকে থাকার লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হবে, দিতে হবে যোগ্যতা-দক্ষতার প্রমাণ। পৃথিবীতে সব সময়ই দুর্বলদের ওপর সবলরা নির্যাতন চালিয়ে সুখ ভোগ করে। দুর্বলরাও যে একদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেটি সবলরা মাঝে মাঝে ভুলে যান। প্রাকৃতিক নিয়মেই এটিও সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। নিরবে মুখ লুকিয়ে একাকী চোখের মূল্যবান অশ্রæ বিসর্জন দিয়ে লাভ কী?

সিঁথি নিজের পছন্দে বিয়ে করছে। ওই মুহূর্তে ছেলের বাড়ি থেকে রাজি থাকলেও সিঁথির বাড়ি রাজি ছিল না। যাই হোক বিয়ের কিছু দিন পর সামান্য কথার প্রেক্ষিতে সিঁথির গায়ে ওর স্বামী হাত তুলল। সিঁথি কষ্টে দুঃখে মধ্যরাত পর্যন্ত কান্না করল আর ভাবছে এই কি সে যার সঙ্গে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে সময় কাটিয়েছে, ঘুরেছে এক সঙ্গে। এক পর্যায়ে স্বামী ওকে দুঃখিত বলল। সিঁথি কিছুটা স্বাভাবিক হলো। ভাবল স্বামী যে ঠিক করেনি এটা ভেবে হয়তো সে অনুতপ্ত হয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে। আসলে সিঁথির ভাবনাটা সে দিন ভুল ছিল। একই কাজ পরেও চলতে থাকলো। আর কোনোদিন স্বামী দুঃখ প্রকাশ করেনি। সে ভেবেছে এটাই ঠিক।

দীর্ঘদিন সিঁথি নীরবে মেনেছে, এক পর্যায়ে মা-বাবা, বোন-ভাইকে বিষয়টি জানিয়েছে। মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ায় ডাক্তারের কাছেও যেতে হয়েছে। সিঁথি চারকরিজীবী হওয়ায় একটা পর্যায়ে সে স্বাভাবিক হয়ে যায়। কিন্তু দুঃসহ স্মৃতিগুলো মনে পড়লেই কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে, সে খুঁজে ফিরে তার জীবনটা কেন এমন হলো, কোথায় ভুল ছিল। মাঝে মাঝে ভাবে জীবনটা যদি দুইটা হতো অঙ্ক খাতার মতো। একটা রাফ আর একটা ফ্রেশ, রাফ খাতার হিসাব ভুল হলে ফ্রেশ খাতায় সঠিক করা যায়।

সিঁথির মতো পরিণতি অনেক মেয়ের জীবনেই ঘটে যায়। কখনো আত্মসম্মান হারানোর ভয়ে, কখনো সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার শঙ্কা কখনোবা আত্মীয় স্বজন পরিবার পরিজনের নিন্দার আশঙ্কায় এগুলো অন্তরালেই থাকে। শুধু নিজেকে নয় পরিবারকেও এর জন্য অনেক ঝড়-ঝাপটা সইতে হয় বোবার মতো। শোনার সুযোগ আছে, বলার সুযোগ নেই।

কর্মজীবী বা আত্মনির্ভরশীল মেয়েগুলো তাও এক পর্যায়ে সব কিছু কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যারা চাকরিজীব নয় তাদের নীরবে পাথরের মতো সবকিছু মেনে নিয়েই হয়তো বাকি জীবন কাটাতে হয়। মাঝে মাঝে হয়তো এই ভেবে আশান্বিত হয় সব কিছু একদিন ঠিক হয়ে যাবে।

এ ধরনের ঘটনা, মানসিক শারীরিক অত্যাচার মানুষকে হীনমন্য করে তুলে, নিজের ওপর আস্থা কমে আসে, অন্যের সঙ্গে সহজে মিশতে বা পাবলিক অনুষ্ঠানে যেতে কুণ্ঠাবোধ হয়। সহকর্মীরাও সুযোগ পেলে এ সব বিষয় নিয়ে খুব আগ্রহভরে সময় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এর মধ্যে হয়তো দু-চার জনকে পাওয়া যাবে যারা সত্যিই শুভাকাক্সক্ষী। এরূপ পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক শক্তি মেয়েদের স্থিতি দিতে পারে। উচ্চশিক্ষিত অনেক মেয়ে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি করে না। হয়তো স্বামীর উচ্চ চাকরি বা পারিবারিক নিষেধাজ্ঞার কারণে জীবনের কোনো দুর্ঘটনা বিপদ বা অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা তো সব সময় অভাস দিয়ে আসে না।

শিক্ষাজীবনের এক রুমমেট জ্বর আসার পূর্ব মুহূর্তে ছোটবেলার সব কবিতা আবৃত্তি করত। তখনই বুঝে যেতাম তার জ্বর আসার সময় হয়েছে। রুমমেটের বাবাও নাকি এটা করতেন। জীবনের সবকিছুতো এমনভাবে পূর্বাভাসের আওতায় আনা যায় না। নিজের পরিবারের সমাজের ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে অনেকেই বলেন, মেয়েরা কর্মে অনেক মনোযোগী, ধৈর্যশীল ও ধীর স্থির হয়, এ জন্য কখনো কখনো তাদের গুরুত্ব দেয়। যদি একই ব্যাখ্যা অর্ধাৎ ধৈর্যশীল ভেবে তাকে পারিবারিকভাবে অত্যাচারিত করেও কেউ আত্মতৃপ্তি পেতে পারে। স্ত্রী, নারীকে অত্যাচারিত করে কেউ কেউ নিজের ক্ষমতা, গুরুত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান। এর মধ্যে প্রকৃত পক্ষে গর্বের কিছু নেই। এটি একটি হীন কর্ম।

ডারউইনের যোগ্যতমের টিকে থাকার তত্ত্বটি আজ আগামী সব দিনের জন্য প্রযোজ্য। নারীকেও এই টিকে থাকার লড়াইয়ে বিজয়ী হতে হবে, দিতে হবে যোগ্যতা-দক্ষতার প্রমাণ। পৃথিবীতে সব সময়ই দুর্বলদের ওপর সবলরা নির্যাতন চালিয়ে সুখ ভোগ করে। দুর্বলরাও যে একদিন ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেটি সবলরা মাঝে মাঝে ভুলে যান। প্রাকৃতিক নিয়মেই এটিও সময়ে সময়ে পরিবর্তিত হয়। নিরবে মুখ লুকিয়ে একাকী চোখের মূল্যবান অশ্রæ বিসর্জন দিয়ে লাভ কী? এই অশ্রæধারা তো অত্যাচারীকে মানবিক করতে পারবে না। প্রত্যেকটি মানুষেরই তো আত্মমর্যাদা আত্মসম্মান রয়েছে।

সিঁথির মতো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় যারা পড়ে, তাদের উচিত মনকে শক্ত করে সবকিছু কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া নিজের অবস্থান শক্ত হলেই অন্যরা তখন এসে বলে প্রয়োজন হলে বলবেন, কোনো সাহায্যে যদি লাগে। কিন্তু এই অন্যরা কিন্তু প্রকৃত প্রয়োজনে এগিয়ে এসে এ কথা বলে না। তাই স্ত্রী, নারী, মেয়ে সবাইকে আগে নিজের ভীতকে মজবুত করা প্রয়োজন।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj