ডায়রিয়া থেকে কিডনি রোগ

শুক্রবার, ২৯ মার্চ ২০১৯

ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানা হয়নি এমন লোক খুঁজে পওয়া যাবে না। অপরিষ্কার পানি, নোংরা ও বাসি খাবার খাওয়া মূলত ডায়রিয়ার প্রধান কারণ। খাবার বা পানির সঙ্গে বিভিন্ন প্রকার জীবাণু ও টক্সিন মানবদেহের অন্ত্রে প্রবেশ করে প্রদাহ তৈরি করে। এতে ডায়রিয়া হয়ে থাকে। ঘন ঘন ডায়রিয়ার ফলে শরীর থেকে প্রচুর পরিমাণ পানি ও লবণ বের হয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে তা পূরণ করতে না পারলে শরীরে পানিশূন্যতা বা ডিহাইড্রেশন দেখা দেয়। শরীরে রক্তের চাপ (ব্লুাড প্রেশার) ধীরে ধীরে কমতে থাকে। একটা পর্যায়ে রক্ত প্রবাহ কমে যায় এবং উভয় কিডনিতে প্রয়োজনের তুলনায় কম রক্তপ্রবাহ সংঘটিত হয়। ফলে উভয় কিডনি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম প্র¯্রাব তৈরি করে। কিডনির অন্যতম প্রধান কাজ হলো শরীরের অপ্রয়োজনীয় ও দূষিত পদার্থ প্র¯্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করে দেয়া। অধিক সময় কিডনিতে রক্ত প্রবাহ কম হলে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ও পুষ্টির অভাবে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। এমনকি হঠাৎ কিডনি বিকল (একিউট কিডনি ইনজুরি) হতে পারে।

ডায়রিয়ার কারণে হঠাৎ কিডনি বিকল হওয়ার সম্ভাবনা সবার ক্ষেত্রে একই রকম নয়। গবেষণায় দেখা গেছে অধিক বয়স্ক মানুষ, শিশু, দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তি, দীর্ঘদিন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, যারা নিয়মিত ব্যথানাশক ওষুধ অথবা উচ্চরক্তচাপ কমাতে বিশেষ ধরনের ওষুধ (অঈঊও/অজই) খেয়ে থাকেন- তারা অধিক ঝুঁকিগ্রস্ত ব্যক্তি।

উন্নত বিশ্বে ডায়রিয়ার প্রকোপ বা ডায়রিয়ার কারণে কিডনি রোগ প্রায় নেই বললেই চলে। শিক্ষার বিস্তার ও স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে আমাদের দেশেও ডায়রিয়া এবং ডায়রিয়াজনিত কিডনি রোগ দৃশ্যমানভাবে কমে এসেছে।

ডায়রিয়ার কারণে হঠাৎ কিডনি বিকল হলে কিছু কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়, যেমন- প্র¯্রাব কমে যাওয়া (০.৫ মিলিলিটারের কম/কেজি/ঘণ্টা এভাবে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত), পানি শূন্যতার লক্ষণ (ঠোঁট ও জিহ্বা শুকিয়ে যাওয়া, তীব্র পানি পিপাসা, চামড়া কুঁচকে যাওয়া ইত্যাদি), বমি বমি ভাব, বমি হওয়া, খাবার অরুচি, অবসাদগ্রস্ততা, পায়ের পাতা ফুলে যাওয়া, মুখ ফুলে যাওয়া, কোমর ব্যথা ইত্যাদি।

সাধারণত একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ গড়ে প্রতিদিন ১ থেকে ২ লিটার পানি পান করে থাকে। ডায়রিয়া বা কলেরাতে প্রচুর পরিমাণ পানি ও লবণ শরীর থেকে বের হয়ে যায়। কখনো কখনো ১০-২০ লিটার পানি ২৪ ঘণ্টায় বের হয়ে যেতে দেখা গেছে। সুতরাং ডায়রিয়াতে অতি দ্রুত ঘাটতি পানি ও লবণ পূরণ জরুরি। খাবার স্যালাইন (ঙজঝ) এই ঘাটতি পূরণে সক্ষম। ডায়রিয়ায় আক্রান্তকারী ব্যক্তি মুখে খেতে সক্ষম হলে বারবার খাবার স্যালাইন খাবে। খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি স্বাভাবিক খাবার খেতে কোনো নিষেধ নেই। অসুস্থ ব্যক্তি যদি খেতে না পারে, বমি করতে থাকে সে ক্ষেত্রে শিরায় স্যালাইন দিয়ে পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেয়া উত্তম। খুব অসুস্থ রোগী, হৃদরোগ বা কিডনিরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির ডায়রিয়া হলে নিয়মিতভাবে নাড়ির গতি, রক্তচাপ, শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি, প্র¯্রাবের পরিমাণ, এমনকি সেন্ট্রাল ভেনাস প্রেসার পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়।

ডায়রিয়ার রোগীকে কি পরিমাণ খাবার স্যালাইন বা শিরার স্যালাইন শরীরে প্রবেশ করাতে হবে তার সঠিক হিসাব করা একটু জটিল বিষয়। তবে তিনটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রেখে পানি ও লবণের ঘাটতি পূরণ করা উচিত- ক) ডায়রিয়াতে যে পরিমাণ পানি ও লবণের ঘাটতি হয়েছে খ) বর্তমানে প্রতিবার ডায়রিয়াতে যে ঘাটতি হচ্ছে গ) প্রতিদিন একজন মানুষ স্বাভাবিক যে তরল বা পানি পান করে।

দেখা গেছে- মাঝারি প্রকোপের ডায়রিয়াতে অর্থাৎ দিনে ৬-১০ বার ডায়রিয়ায় ৪৮ ঘণ্টায় ২-৪ লিটার পানি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। একজন পূর্ণ বয়স্ক ব্যক্তি ডায়রিয়ার শুরুতেই খাবার স্যালাইন খেতে ব্যর্থ হলে যখন চিকিৎসা শুরু করবে তখনই ১-২ লিটার বা পিপাসা অনুযায়ী বেশি পরিমাণ খাবার স্যালাইন পান করবে।

মুখে খেতে ব্যর্থ হলে সমপরিমাণ নরমাল স্যালাইন বা কলেরা স্যালাইন ২-৪ ঘণ্টায় শিরায় দিতে হবে। প্রতিবার ডায়রিয়ার পর ২০০ মিলিলিটার খাবার স্যালাইন খেতে হবে। তবে পিপাসা থাকলে বেশি পান করতে বাধা নেই।

যেহেতু একজন সুস্থ মানুষ প্রতিদিন ১-২ লিটার পানি পান করে তাই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ মানুষের মতো আরো ১-২ লিটার পানি বা তরল জাতীয় খাবার পান করবে। ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর লবণ ও পানির ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি ডায়রিয়ার কারণ নির্ণয় করতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী কখনো কখনো এন্টিবায়োটিক, এন্টিএমেবিক জাতীয় ওষুধের প্রয়োজন হতে পারে।

ডায়রিয়ার কারণে হঠাৎ কিডনি বিকল হলে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ রোগী নিরাময় সম্ভব। তবে ১০-২০ ভাগ রোগীর কিডনি সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় নাও ফিরতে পারে। সে ক্ষেত্রে রোগীকে নিয়মিতভাবে চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হবে।

রোগের প্রতিরোধ রোগ সারিয়ে তোলার চেয়ে উত্তম। সুতরাং ডায়রিয়া প্রতিরোধে নিজেকে, পরিবারের সদস্যকে এবং সমাজকে সচেতন করা আমাদের সবার কর্তব্য। আর তাহলেই ডায়রিয়া এবং ডায়রিয়ার কারণে সৃষ্ট কিডনি রোগ ও অন্যান্য জটিলতা থেকে আমরা সবাই মুক্ত থাকব।

ডা. মু. আব্দুল্লাহ আল মামুন

কিডনি ও মেডিসিন রোগ বিশেষজ্ঞ

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল

শেরে বাংলা নগর, ঢাকা।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj