যুদ্ধের গল্প : আরাফাত শাহীন

বুধবার, ২৭ মার্চ ২০১৯

‘তারপর কী হলো দাদু?’

গল্পের মাঝখানেই দাদুকে থামিয়ে দিল ফাহাদ। এটা ওর স্বভাব। দাদু গল্প বলতে গেলে এটা সে করবেই। দাদুও ব্যাপারটা জানেন। তাই একটুও রাগ করেন না। দাদু মুচকি হাসলেন। তারপর যেন খানিকটা অন্যমনস্ক হলেন। তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘একাত্তরের মে মাসের মাঝামাঝি সময় তখন। প্রকৃতিতে বিরাজ করছে ভাপসা গরম। কয়েকদিন ধরে আকাশে ঘন কালো মেঘ ঘোরাফেরা করছে। কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই। মাঠ ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে। আর কিছুদিন বৃষ্টি না হলে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাবে। ততদিনে যুদ্ধের দাবানল প্রায় সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। গণজোয়ারের মতো মানুষ জেগে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে দেশের জনগণ পাকবাহিনীকে প্রতিরোধ করতে শুরু করেছে।’

দাদু ফাহাদের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধুকে কী নামে ডাকতাম সেটা জানো তুমি?’

এই প্রশ্নের উত্তর সে জানে। তবে দাদুর মুখ থেকে শুনতেই বেশি মজা।

‘কী যেন বলতে দাদু…!’

ফাহাদ মুচকি হেসে প্রশ্ন করলো।

দাদু বুক খানিকটা ফুলিয়ে গর্বের সঙ্গে বললেন, ‘শেখ সাহেব। আমরা তাঁকে শেখ সাহেব বলতাম। শুধু আমরা নই, দেশের কোটি কোটি মানুষ তাঁকে এ নামেই চিনতো।’

দাদু তার গল্পে আবার ফিরে এলেন, ‘যুদ্ধ ততদিনে বেশ ভালোমতই শুরু হয়ে গিয়েছে। লাখ লাখ মানুষ হয়ে পড়েছে বাস্তুচ্যুত। রোজই লোকজন পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করছে।’

‘আচ্ছা দাদু, মুক্তিযুদ্ধে কি ভারত সত্যিই আমাদের অনেক সাহায্য করেছে?’

দাদুর কথার মাঝখানে প্রশ্ন করে বসলো ফাহাদ। গল্পে ছেদ পড়ায় দাদু একটুও বিরক্ত হলেন না। বরং তার মুখে ফুটে উঠলো হাসির রেখা। তারপর বললেন, ‘হ্যাঁ দাদুভাই। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তখন সত্যিই আমাদের প্রচুর সাহায্য করেছে। তুমি কি পণ্ডিত রবিশংকরের নাম শুনেছো?’

ফাহাদ এবার চুপ করে রইলো। কারণ এই নাম সে কখনো শোনেনি। দাদু ব্যাপারটা বুঝতে পেরে বললেন, ‘এবার তাহলে তার সম্পর্কে জেনে নাও। পণ্ডিত রবিশংকর আমাদের দেশের জন্য আমেরিকা গিয়ে গান গেয়েছেন। গান গেয়ে যে অর্থ পেয়েছেন তার সবটাই তিনি শরণার্থীদের জন্য দিয়ে দিয়েছেন।’

‘টাকার পরিমাণ কত হবে দাদু?’

‘দশ লাখ ডলার।’

‘এত টাকা দাদু!’

ফাহাদের চোখ দুটো গোল হয়ে গেল।

দাদু আবার তার গল্পে ফিরে এলেন।

‘প্রতিদিন আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে হাজার হাজার মানুষ যশোর হয়ে ভারতে পালিয়ে যাচ্ছে। মানুষের এ পালিয়ে যাবার দৃশ্য নিয়ে একটি বিখ্যাত কবিতা আছে। এই কবিতা সম্পর্কে তুমি কিছু জানো?’

ফাহাদ জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ দাদু, আমি জানি। আমাদের পাঠ্যবইয়ে এ ব্যাপারে লেখা আছে। কবিতাটা হলো অ্যালেন গিন্সবার্গের ‘সেপ্টেম্বর ইন যশোর রোড’।

ফাহাদের চমৎকার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করলেন দাদু। তারপর আবার গল্প বলায় মনোযোগ দিলেন।

‘আমাদের এলাকায় তখনো হানাদার বাহিনী প্রবেশ করতে পারেনি। তবে যেকোনো সময় তারা গ্রামে আক্রমণ করতে পারে। কারণ পাক বাহিনী তখন মধুমতি নদীর ওপারেই অবস্থান করছিল। আব্বা তখনও শক্ত সমর্থ মানুষ। একদিন আব্বা ডেকে বললেন, যেকোনো দিন গ্রামে মিলিটারি আসতে পারে। আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। তোমার আব্বা তখন তোমার দাদির পেটে। আমার সমস্ত চিন্তা তোমার দাদিকে ঘিরে। তারপর একদিন দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিলাম। কী কষ্ট রে দাদুভাই! সে কষ্টের কথা বর্ণনা দেবার মতো নয়।’

এটুকু বলে দাদু একটু যেন আনমনা হয়ে গেলেন। তারপরই আবার বলতে শুরু করলেন-

‘আমি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মনস্থির করলাম। তারপর ট্রেনিং নিয়ে একদিন বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করলাম। আমার সঙ্গে তখন ফরিদপুরের কয়েকজনও ছিল। যুদ্ধ করার জন্য নবগঙ্গা ও মধুমতি নদীর মধ্যবর্তী জায়গাটিতে চলে এলাম। আমার জন্ম হয়েছে এই এলাকায়। সুতরাং জায়গাটি আমার হাতের তালুর মতো চেনা। নভেম্বর মাসের শেষের দিকে একদিন খবর পেলাম নবগঙ্গা নদীর তীরে নহাটা বাজারে এসে আস্তানা গেড়েছে পাকহানাদার বাহিনী। আমাদের কমান্ডার মতি ভাই ছিলেন যশোরের মানুষ। প্রচণ্ড সাহসী আর একগুঁয়ে। তিনি মনেপ্রাণে যা স্থির করবেন তা করে ছাড়বেনই। বহুবার আমরা এর প্রমাণ পেয়েছি। তিনি রাতের অন্ধকারে হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প আক্রমণের সিদ্ধান্ত নিলেন। একদিন রাতে আমরা নবগঙ্গা নদীতে নৌকা ভাসালাম। প্রত্যেকেই পণ করেছি হয় ক্যাম্প দখল নয়তো মৃত্যু।’

‘তারপর কী হলো দাদু?’

ফাহাদের যেন আর তর সইছে না। সে প্রশ্ন করে বসলো। মোজাম্মেল হোসেন এবার শব্দ করে হেসে উঠলেন। এই গল্প কম করে হলেও ফাহাদকে তিনি পঞ্চাশবার শুনিয়েছেন। তারপরও ওকে আবার শোনাতে হবে। আর প্রতিবারই এই জায়গাটিতে এসে সে থামিয়ে দেবে।

ফাহাদ জানে, ওর দাদু একজন মহান মুক্তিযোদ্ধা। নহাটার সেই যুদ্ধে দাদুর পায়েও একটা গুলি লেগেছিল। তবে সেদিন নহাটাকে তিনি শত্রুমুক্ত করতে পেরেছিলেন। দাদু আজো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। দেশের স্বাধীনতা ফিরে এসেছে এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় পাওয়া। দেশের সব মহান মুক্তিযোদ্ধা হয়তো এভাবেই ভাবেন!

ফাহাদ দাদুকে এবার প্রশ্ন করলো, ‘আবার কবে গল্পটি শোনাবে দাদু?’

দাদু হাসতে হাসতে বললেন, ‘যেদিন আবার তোমার শুনতে ইচ্ছা করবে।’

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj