মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের নারী : দিল মনোয়ারা মনু

সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯

সময় ১৯৭১। এপ্রিলের এক সন্ধ্যা। পায়ে পায়ে এগিয়ে যাচ্ছি। বাঁ পাশে মাটির যে ঢিবি ছিল তারই পাদদেশে একটি মেয়ের লাশ। মেয়েটির চোখ বাঁধা গামছা দুটো আজো ওখানে পড়ে আছে। পরনে কালো ঢাকাই শাড়ি। এক পায়ে মোজা। মুখ ও নাকের কোনো আকৃতি নেই। কে যেন অস্ত্র দিয়ে তা কেটে খামচিয়ে তুলে নিয়েছে, যেন চেনা যায় না। মেয়েটি ফর্সা এবং স্বাস্থ্য ভালো। লাশটি চিৎ হয়ে পড়ে আছে। আর একটু দূরে যেতেই দেখতে পেলাম একটি কঙ্কাল, শুধু পা দুটো আর বুকের পাজরটিতে তখন কিছু মাংস আছে। বোধ হয় চিল-শুকুনে খেয়ে গেছে। কিন্তু মাথার খুলিটিতে লম্বা লম্বা চুল, চুলগুলো ধুলো কাদায় মিশে গিয়ে নারী দেহের সাক্ষ্য বহন করছে। এই নারী শহীদ সেলিনা পারভীন। অধ্যাপক হামিদা রহমানের বর্ণনায় এই মর্মান্তিক তথ্য উঠে এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির মহান ইতিহাস, সুখ ও শোকে মেশানো এক গৌরবময় বিজয়। যে বিজয় বাঙালি জাতিকে উপহার দিয়েছে একটি রক্তাক্ত মানচিত্র। যার প্রতিটি বালুকণা, ঘাস, ফুল, গাছ, লতাপাতা, নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত। যে মানুষের একটি অংশ নারী। প্রতিক্ষণই ছিল তখন নারীর যুদ্ধ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল নারী-পুরুষের সম্মিলিত ধারায় যুক্ত। যুদ্ধের সমগ্র কর্মকাণ্ডে পুরুষ-নারী যার যেখানে যেমন অবদান রাখা দরকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা সে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশ মাতৃকার এই দুরূহ সংকট কাটাতে এতটুকু দ্বিধাগ্রস্ত হয়নি।

১৯৭১-এর ২৬ মার্চ। স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ শুরু করেছিল গোটা বাঙালি জাতি। নারীর পরিপূর্ণ সহযোগিতা সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিরঙ্কুশ ত্যাগ নিয়ে এ যুদ্ধ এগিয়ে চলেছে দিনের পর দিন। বিজয়ের ফসল ঘরে তুলতে লেগেছিল দীর্ঘ ৯ মাস। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি অর্জন করে তার শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কিন্তু বিপরীতে রক্তের বন্যায় একাকার হয়ে যায় টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। পাকিস্তানি শত্রুরা সর্বত্র রেখে যায় নৃশংসতার চিহ্ন। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদানকে সঠিকভাবে চিত্রায়ন করা হয়নি। উঠে আসেনি তা ইতিহাসের পাতায় পাতায়। তাদের সুগভীর আত্মত্যাগ ও সাহসী অংশগ্রহণে সঠিক চিত্র খুবই কম। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে অংশ নিয়েছে যারা তাদের স্বীকৃতি সম্মান জানানোর ক্ষেত্রে রয়েছে প্রবল অনাগ্রহ, প্রকট অবহেলা। মিলিতভাবে যুদ্ধ করেছে যে নারী তার মহান কর্মষজ্ঞ তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রচণ্ডভাবে কাজ করেছে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। মুক্তিযুদ্ধের পর চলে গেল প্রায় চার যুগ। মুক্তিযুদ্ধের পরের প্রজন্ম এখনো সেইভাবে জানে না মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতাকে। কত লাখো প্রাণ, কত অশ্রæ, কত নারীর বীরত্বগাথা যে এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তার খবর সেইভাবে আমরা কতজন জানি?

১৯৬৯-১৯৭০ বাঙালি জাতির সাহসী আত্মপ্রকাশের এক ঐতিহাসিক কালপর্ব। শতসহস্র সংগ্রামী ইতিহাসের এক নবতর সংযোজন নারী মুক্তির যে ধারা সংযোজিত হলো তা প্রকৃতই ছিল নারী জাগরণ বা মুক্তির সংগ্রাম। সমাজের সব পশ্চাৎপদতা শিল্প ও সংস্কৃতিহীন অজ্ঞানতা ও অন্ধকার থেকে নারী সমাজকে মুক্ত ও আলোকিত করার প্রত্যয় নিয়ে তাদের এগিয়ে চলা। সমাজে মানুষে মানুষে সমতা, নারী পুরুষের সমতা, বৈষম্য ও নিপীড়নহীন মানবিক মর্যাদাপূর্ণ জীবন প্রতিষ্ঠাই ছিল এ যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। তখন আন্দোলনে অংশগ্রহণ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে নারীরা প্যারেড করছে। এর আগে শুরু হয়েছে রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ করার কাজ। এ কাজে ভূমিকা রেখেছেন বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জোহরা তাজউদ্দীন, বেগম মজিদা বেগম (মানিক মিঞায় স্ত্রী), রেবেকা মহিউদ্দীন, নূরজাহান মুরশিদ, বেগম বদরুন্নেসা আহমেদ প্রমুখ।

আমাদের ভাষার আন্দোলন, সামাজিক সংস্কার, প্রগতির আন্দোলনের প্রাথমিক প্রস্তুতি পর্বের এক অনন্য সফল সংযোজন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ প্রতিষ্ঠা।

ঊনসত্তরের গণআন্দোলনে মুক্তিযুদ্ধকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে জেলায় জেলায় যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় তার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিল নারী। এর পরবর্তী সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের নারী সদস্যরা গঠন করলেন নারী সংগ্রাম পরিষদ। দলমত নির্বিশেষে এগিয়ে এলেন অনেকেই যেমন- কামরুন নাহার লাইলী, বদরুন্নেসা আহমেদসহ অনেকে। যারা পঞ্চাশের দশক থেকেই সক্রিয়, তাদের দেশপ্রেমের উদ্দীপনায় গড়ে উঠলো নবীন-প্রবীণদের এক অনবদ্য সেতুবন্ধন। এরা মাঠকর্মী হিসেবে নিরলসভাবে কাজ করছেন মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে সংগঠিত করার জন্য। ষাটের দশকের ছাত্র ইউনিয়নের বিখ্যাত নেতা রেজা আলীর নানি জেবেদা খাতুন চৌধুরানী, মা সাবা আলী এবং মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মা উম্মেহানী খানমের নাম এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একাত্তরের ২৫ মার্চের আগ পর্যন্ত পাড়ায় পাড়ায় মহল্লায় মহল্লায় নারীরা স্বেচ্ছাসেবী প্রতিরক্ষা বাহিনী গড়ে তোলে। হাতে লাঠি, মাথায় ক্যাপ, পায়ে কেডস, মুখে দৃঢ়তা নিয়ে তারা প্রতিদিন কুচকাওয়াজে অংশ নিয়েছেন। প্রেরণা ও শক্তি দিয়েছেন নূরজাহান মুরশিদ, ফিরোজা বারী, বেগম নূরুন্নাহার সামাদ, জোহরা তাজউদ্দীন, হামিদা হোসেন, সাজেদা চৌধুরী প্রমুখ। সর্বাগ্রে ছিলেন কবি সুফিয়া কামাল। তাঁর অসাধারণ সাহস ও প্রেরণা নারীদের দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করে। এ সময় নারী আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামকে সফলভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে তিনি নারীদের সঠিক নির্দেশনা দেন। এ সময়ে বাংলাদেশ মহিলা সমিতির শাখা গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতির আশালতা সেন, শাহজাদী বেগম, মিসেস বি. আহমেদ, ওয়ারী মহিলা সমিতির রাইসা হারুন, হেনা জামাল এবং নারিন্দা মহিলা সমিতির বেগম সম্পাদিকা নূরজাহান বেগম দেশ পুনর্গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। মহিলা আত্মরক্ষা সমিতি, শিশুকল্যাণ পরিষদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। মহিলা সমিতির সভানেত্রী ড. নীলিমা ইব্রাহীম, কবি সুফিয়া কামাল যিনি স্বাধীনতা-উত্তর নারী পুনর্বাসন কেন্দ্র গঠন করার পর নির্যাতিত নারী ও বিধ্বস্ত দেশ গঠনের জন্য নিরলস পরিশ্রম করে দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। স্বাধীনতার পর দেশে একে একে বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের জন্ম হয়। তাদের সম্মিলিত চেষ্টা লক্ষ করলে দেখা যায় দেশের আর্থসামাজিক সমস্যা সমাধানের দাবি, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ও নারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবি জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে নানা কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। এ দেশের নারী আন্দোলনের ইতিহাসে এ ধরনের সংগঠিত প্রয়াস একটি নতুন সংযোজন। সমাজ প্রগতির গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশ, অর্থনৈতিক মুক্তি নারী মুক্তির জন্য এরা প্রতিক্রিয়াশীলদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। গণতন্ত্রের জন্য স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে এদের নেতৃত্বে ও সাহসী ভূমিকার জন্য আমরা গর্ববোধ করি। বর্তমানে নারী ও মানবাধিকার ৬৭টি সংগঠন মিলিতভাবে সোসাল অ্যাকশন কমিটি বা সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করে সব ধরনের অন্যায় ও সংকটের বিরুদ্ধে জোরদার কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে। স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, সরকার এসেছে গিয়েছে কিন্তু জীবনমানের উন্নতি হয়নি। নারী শিক্ষা, নারীর কর্মসংস্থান, নারীর প্রতি সামাজিক মূল্যবোধের খুব একটা উন্নয়ন ঘটেনি। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রণীত আইনের সঠিক বাস্তবায়ন ঘটেনি। প্রচলিত আইনের সংস্কার ও যথোপযুক্তভাবে হয়নি। আজকের নারী আন্দোলনের মূল দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্য হচ্ছে পূর্ণ মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে নারীকে বিবেচনা বা মূল্যায়ন করা। নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক আরো উন্নত ও সমতাপূর্ণ, বৈষম্যমুক্ত গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর প্রতিষ্ঠা করা, যা গোটা সমাজকে সমানাধিকার ও সমমর্যাদাভিত্তিক করার প্রয়াসকে সাফল্যের পথে অনেক দূর এগিয়ে দেবে। তবেই বহু ত্যাগ ও প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা অর্থবহ হবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj