বীরত্বগাথার এক ছবি : সেবিকা দেবনাথ

সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধে নারী কেবল নির্যাতনের শিকার বা সেবিকা হয়ে কাজ করেননি। নারীরাও নিয়েছেন অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ। পুরুষের পাশাপাশি তারা গেরিলা ও সম্মুখযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক রশীদ তালুকদারের তোলা একাত্তর সালের মার্চ মাসে ঢাকার রাজপথে ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠিত নারী ব্রিগেডের মার্চপাস্টের ছবি সেই সত্যই তুলে ধরে।

ছবিতে দেখা যায়, কারো পরনে শাড়ি, কারোবা সালোয়ার-কামিজ। পায়ে সাদা কেডস। বাম কাঁধে ডামি রাইফেল। মুষ্টিবদ্ধ ডান হাত বেশ খানিকটা সামনে আগানো। বয়সের ব্যবধান ছিল অনেক। কিন্তু দেশপ্রেমের মন্ত্র তাদের দাঁড় করিয়েছে এক কাতারে। সংখ্যায় খুব বেশি না হলেও তাদের দৃপ্ত পদচারণা আর দৃঢ় মনোবল আর দেশপ্রেমের মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে জীবন বাজি ধরতেও যে তারা প্রস্তুত ছবিতে তা স্পষ্টই বোঝা যায়। তাদের পেছনে ছিল ছেলেদের দুটি দল। এই মার্চপাস্টে অংশ নেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ২০ জন নারী। ছবিতে যারা ছিলেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রোকেয়া কবীর, কাজী রোকেয়া সুলতানা, নেলী চৌধুরী, নাসিমুন আরা হক মিনু, নীনু নাজমুন আরা, কামরুন্নেছা খানম হেলেন, আশা খান, সীমা মোসলেম, তাজিন সুলতানা, নাজনীন সুলতানা নীনা, শামীম আক্তার, আনোয়ারা বেগম রতন, মেহরোজ আলম চৌধুরী, মেরী, আঁখি। বিখ্যাত এই ছবির ইতিহাস এবং প্রেক্ষাপট নিয়ে কথা হয় মার্চপাস্টে অংশ নেয়া রোকেয়া কবীর, নাসিমুন আরা হক মিনু ও সীমা মোসলেমের সঙ্গে। তারা জানান, সেদিন যে ক’জন নারী ডামি রাইফেল হাতে মার্চপাস্টে অংশ নিয়েছিল তারা প্রত্যেকেই ছিলেন ছাত্র আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী। মেয়েদের মার্চপাস্টে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রোকেয়া কবির। তারিখটা মনে না থাকলেও এটি ছিল একাত্তর সালের মার্চ মাসের কোনো একটা সময়। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের রোভার স্কাউটের ডামি রাইফেল দিয়ে তাদের ৭/৮ দিনের ট্রেনিং হয়। পরবর্তী সময়ে ওই নারী মুক্তিযোদ্ধারাই বিভিন্ন এলাকায় নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। সকাল ১১ কি সাড়ে ১১টায় এই মিছিল শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠ থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি শহীদ মিনার, নীলক্ষেত, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, কলাবাগান হয়ে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির সামনে গিয়ে শেষ হয়।

এই মার্চপাস্টে অংশ নেয়া নারী মুক্তিযোদ্ধারা বলেন, সেদিনে সেই রাইফেল ট্রেনিং ও ঢাকার রাজপথে মার্চপাস্ট ছিল নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সূচনা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে হলে নারীর সব অবদানের কথা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। এবং স্বীকৃতি দিতে হবে।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে রোকেয়া কবীর বলেন, ‘নারীদের ডামি রাইফেল নিয়ে মার্চপাস্টের যে ছবিটি দেখা যায় সেখানে সবার সামনে ছিলাম আমি। মার্চপাস্ট করতে করতে আমরা যখন নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করছিলাম তখন চারপাশে সাধারণ মানুষ ভিড় করতে থাকে। তারা রাস্তায় দাঁড়িয়ে হাত তালি দিয়ে আমাদের উৎসাহিত করছিল। আমার মনে হচ্ছিল আমরা যুদ্ধ জয় করেছি। এর মাধ্যমে আমরা দেশের সাধারণ মানুষের কাছে একটা বার্তা পৌঁছে দিতে চেয়েছিলাম। সেটি হলো পাকিস্তানি সৈন্য আমাদের ওপর আক্রমণ করলে আমরা তা প্রতিহত করব এবং পাল্টা আক্রমণের জন্য আমরা ছাত্র সমাজ প্রস্তুত।’

নাসিমুন আরা হক বলেন, ‘যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে নারীরা রাইফেল প্রশিক্ষণ নিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান কোনো অংশেই কম ছিল না। বলতে গেলে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করা অসম্ভবই ছিল।

সীমা মোসলেম বলেন, ‘রাইফেল প্রশিক্ষণ নেয়ার পর আত্মবিশ্বাসটা অনেক গুণ বেড়ে গিয়েছিল। দৃঢ় বিশ্বাস ছিল প্রয়োজন হলে সম্মুখ সমরেও যেতে পারব।’

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj