রাজকন্যা ও গাছকন্যা : আবেদীন জনী

বুধবার, ২০ মার্চ ২০১৯

রাজকন্যা সকাল-বিকেল বাগানে হাঁটাহাঁটি করে। কখনো বা চপল মনে দৌড়ে ছোটে এদিক-ওদিক। প্রজাপতি যেমন রঙিন পাখায় ইচ্ছেমতো উড়ে বেড়ায়, ঠিক তেমনই উড়ন্ত মন। রঙিন পোশাকে রূপসী রাজকন্যার উচ্ছল ছোটাছুটি দেখে মনে হয় প্রজাপতিই উড়ে বেড়াচ্ছে। কী যে আনন্দ ওর মনে! ফুলের সঙ্গে, পাতার সঙ্গে হাসতে হাসতে, কথা বলতে বলতে ছুটে চলে। রাজকন্যাটা দুষ্টুও কম না। কখনো কখনো গাছের ডাল ধরে টান মারে। ফুলের পাপড়িতে টোকা দেয়। পাতার শরীরে চিমটি কাটে। এসব করে খুব মজা পায় রাজকন্যা।

কিন্তু একদিন আজব একটা ঘটনা ঘটল। আড়াই হাতের মতো লম্বা এক গাছের পাতায় রাজকন্যা যেই চিমটি দিয়েছে, অমনি ওর কানে কয়েকটি কথা ভেসে এল। ‘এই, তুমি আমাকে চিমটি দিলে কেন? খুব ব্যথা পেলাম তো!’

রাজকন্যা এদিক-ওদিক তাকাতাকি করে কাউকে দেখতে পেল না। ভূত ভেবে খানিকটা ভয় পেল। কিন্তু সে ভয় বেশিক্ষণ থাকল না। কারণ খুব কাছেই রাজবাড়ি। ভূত-প্রেতের কবলে পড়লে এক দৌড়ে চলে যাবে বাড়িতে। তাহলে আর ভয় কিসের?

রাজকন্যা সাহস নিয়ে বলল, এই, কে কথা বলছ?

– আমি। একটু আগে তুমি যাকে চিমটি দিয়েছ।

– আমি তো একটা গাছের পাতায় চিমটি দিয়েছি।

– হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। ওটাই আমি। এই যে তোমার একেবারে পাশেই দাঁড়ানো। দেখো, কী সবুজ, কোমল, লকলকে আমি। তুমি যেমন রূপসী রাজকন্যা, ঠিক তেমনই আমিও রূপসী এক গাছকন্যা। তোমাকে চিমটি দিলে যেমন ব্যথা পাও, আমাকে চিমটি দিলে আমিও সেরকম ব্যথা পাই। শুধু আমি একা পাই না। সব গাছেরাই ব্যথা পায়। গাছদেরও মানুষের মতো সুখ-দুঃখের অনুভূতি আছে। তুমি মাঝে মাঝে ডাল ধরে টান মারো। পাতায় চিমটি কাটো। ফুল ছিঁড়ে কুটিকুটি করো। আর কখনো এরকম করো না। এগুলো ঠিক না। এসব করে তুমি আনন্দ পাও। কিন্তু গাছেরা তো ব্যথা পায়।

রাজকন্যা বিস্মিত হয়ে বলল, কেন, ব্যথা পাবে কেন? গাছেরা কখনো ব্যথা পায় নাকি?

গাছকন্যা মৃদু হেসে বলল, এটাও জানো না? তুমি একটা হদ্দ বোকা। যাদের প্রাণ আছে, তাদের আঘাত করলে ব্যথা পাবে। এটাই স্বাভাবিক।

– তা তো বুঝলাম। কিন্তু গাছ ব্যথা পাবে কেন?

– রাজকন্যা হয়ে এই কথাটা না জানলে চলে? সেই কবে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু প্রমাণ করে দিয়েছেন, আমাদের অর্থাৎ গাছদের প্রাণ আছে। প্রাণ আছে বলেই গাছেরা ব্যথা পায়।

রাজকন্যা অবাক চোখে তাকিয়ে কপাল কুঁচকে বলল, তাই নাকি?

– হ্যাঁ, তাই। রাজকন্যাদের শুধু ঝলমলে পোশাক পরে সেজেগুজে এখানে ওখানে, এ দেশে ও দেশে ঘুরে বেড়ালে চলে না। অনেক কিছু জানতে হয়। জানার জন্য অনেক অনেক বইও পড়তে হয়।

রাজকন্যা কিছুটা অহঙ্কার মেশানো কণ্ঠে বলল, সামান্য একটা গাছ হয়ে একজন রাজকন্যাকে উপদেশ দিচ্ছো তুমি?

রাজকন্যার অহঙ্কারে গাছকন্যার যেন কিছুই যায়-আসে না। সবুজ পাতার ঠোঁট বাঁকিয়ে, চেঁচিয়ে চেঁঁচিয়ে বলল, শোনো রাজকন্যা, গাছ বলে আমাদের কি একটুও মূল্য নেই? আমরা কি ভালো কথাগুলোও বলতে পারব না। জানি, তোমাদের কথায় রাজ্যের সবাই ওঠে-বসে। তোমরা যেভাবে চালাও, সেভাবেই রাজ্য চলে। তাই বলছি, কে কিসে সুখ পায়, আনন্দ পায়, কষ্ট পায়- এসব বিষয়ে কিছু না কিছু জানতে হয়। রাজ্যের প্রজাদের খবর রাখতে হয়। আমরাও তোমাদের প্রজা। গাছ-প্রজা। আমরা মানুষের জন্য খুব উপকারী। গাছদের মোটেও অবহেলা করা ঠিক নয়।

– তোমরা মানুষের কী উপকার করো?

– আমরা কী কী উপকার করি- সেসব কথা একটানা সাত দিন সাত রাত বললেও ফুরোবে না। সামান্য একটু বলি, গাছ না থাকলে পৃথিবী এত সুন্দর লাগত না। মানুষ যা যা খেয়ে বেঁচে থাকে, প্রায় সবগুলো খাদ্যশস্য ও ফলমূল কোনো না কোনো গাছ থেকেই পাওয়া যায়। আর যে জিনিসটা না পেলে মানুষ এক মুহূর্তও বাঁচবে না, সেই অক্সিজেনও দিচ্ছে গাছ।

রাজকন্যা অহঙ্কারের চোটে আরো ফুলে-ফেঁপে উঠল। বলল, সামান্য একটা গাছকন্যা হয়ে এত বড় বড় কথা! তোমাদের রূপ-শোভা আমাদের দরকার নেই। তোমাদের কাছে কোনো খাদ্যও চাই না। আমাদের গুদাম ভরা অনেক খাদ্যশস্য আছে। আর অক্সিজেনও দিয়ো না তোমরা। দেখি, আমাদের কী হয়। বলতে বলতে গাছকন্যার ছোট্ট কচি শাখা ধরে জোরে একটা টান মেরে হনহন করে চলে গেল রাজকন্যা।

গাছকন্যা এবারো অনেক ব্যথা পেল। কিন্তু রাজকন্যাকে কিছু বলল না। মনে মনে বলল, অহঙ্কারী রাজকন্যাকে একটু শিক্ষা দিতেই হবে।

গাছকন্যা সব গাছকে বিষয়টি জানাল। মাত্র দশ মিনিটের জন্য সবাইকে অক্সিজেন বন্ধ রাখতে অনুরোধ করল। কিন্তু বড় গাছেরা রাজি হলো না। কারণ এ কাজ করলে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীর ভীষণ ক্ষতি হবে। বেঁচে থাকাই সম্ভব হবে না। বড় গাছেরা বলল, একজন রাজকন্যার ভুলের জন্য সব মানুষ ও প্রাণীকে শাস্তি দেয়া অন্যায়।

– তাহলে ওই অহঙ্কারী ও বোকা রাজকন্যাকে শিক্ষা দেয়ার উপায় কী? গাছকন্যা বড় গাছদের কাছে জানতে চাইল।

বড় গাছেরা অনেক ভেবেচিন্তে বলল, কয়েক মিনিট সময়ের জন্য অক্সিজেনের পরিমাণ অর্ধেক কমিয়ে দেয়া যেতে পারে। এতেই প্রমাণ হয়ে যাবে, গাছ কতটা উপকারী।

গাছকন্যা বলল, আচ্ছা, তাই হবে।

তারপর ঠিক তাই করা হলো। বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ কিছু সময়ের জন্য অর্ধেক করে দেয়া হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল করুণ দশা। রাজা ঘামতে লাগলেন। রানী ঘামতে লাগলেন। মন্ত্রী ঘামতে লাগলেন। রাজকর্মচারী, পাইক-পেয়াদাসহ রাজ্যের প্রজাদেরও একই অবস্থা। শুধু কি তাই? সেই যে হদ্দ বোকা, ঝগড়াটে, দুষ্টু রাজকন্যা- সেও বাদ রইল না। সবাই ঘামছে আর ঘামছে। শ্বাস-প্রশ্বাসে খুব সমস্যা হচ্ছে। প্রাণ যায় যায় অবস্থা।

রাজা ঘামতে ঘামতে অস্থির হয়ে বললেন, এই, কে আছো, তাড়াতাড়ি বদ্যি ডাকো। ডাক্তার ডাকো।

বদ্যি ডাকা হলো। তিনিও এলেন ঘামতে ঘামতে। তারও শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হচ্ছে। মন্ত্র জপতে জপতে আরো অস্থির হয়ে গেলেন। কিন্তু এ রোগের কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না।

তারপর ডাক্তার ডাকা হলো। তিনিও এলেন ঘামতে ঘামতে। তার প্রাণও যায় যায়। কিন্তু না এসে তো উপায় নেই। রাজা ডেকেছেন। বললেন, হে রাজা, এখানে আসার সময় পথে যার যার সঙ্গে দেখা হয়েছে, সবাইকে ঘামতে দেখেছি। কেউ-ই ঠিকমতো দম নিতে পারছে না। সবারই একই অবস্থা।

আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমাকে ক্ষমা করবেন।

নিরুপায় হয়ে অবশেষে ডেকে আনা হলো একজন আবহাওয়াবিদ। তিনিও এলেন ঘেমে-নেয়ে ক্লান্ত হয়ে। তিনি ভাবতে ভাবতে, অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে খুঁজে পেলেন ঘামতে থাকার কারণ। বললেন, আর কিছু নয়, অক্সিজেনের অভাব। অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গেছে।

– তাহলে কী করতে হবে, জলদি করো। নইলে আমরা সবাই মরে যাব। রাজা আবহাওয়াবিদকে বললেন।

– এত তাড়াতাড়ি এ সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় আমার জানা নেই রাজা। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। আবহাওয়াবিদ নতশিরে বললেন।

এ কথা শুনে রাজাসহ প্রত্যেকেই মৃত্যুভয়ে ছটফট করতে লাগল। পাশেই বসে বসে ঘামছিল সেই দুষ্টু রাজকন্যা। ঘামতে ঘামতে ওর অবস্থাও ভয়াবহ। জীবন যেন যায় যায়। রাজকন্যা আর দেরি করল না। অপরাধীর মতো মলিন মুখে বলল, এর জন্য আমিই দায়ী। ওর যে গাছকন্যার সঙ্গে ঝগড়া হয়েছে এবং সে কারণে গাছেরা চাহিদামতো অক্সিজেন দিচ্ছে না, সে কথাও সবার কাছে খুলে বলল। তারপর দৌড়ে বাগানে গিয়ে গাছকন্যার কাছে ক্ষমা চাইল, হে গাছকন্যা, আমি না বুঝে ভুল করেছি। আমাকে ক্ষমা করো। তোমার কথাই ঠিক। তোমরা অক্সিজেন না দিলে আমরা বাঁচতে পারব না।

গাছকন্যা রাজকন্যাকে ক্ষমা করে দিল। সব গাছকে প্রয়োজনমতো অক্সিজেন দিতে বলল। সঙ্গে সঙ্গেই নরম শীতল বাতাস ছুঁয়ে গেল দেহ-মন। ঘাম ঝরা বন্ধ হলো। শ্বাস-প্রশ্বাসেও কোনো সমস্যা রইল না। সবাই আগের মতো সুস্থ সুন্দর ও সুখে জীবনযাপন করতে লাগল।

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj