‘অন্ধ জনে দেহ আলো’র ব্রত নিয়ে

সোমবার, ১৮ মার্চ ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

মেয়েটির বাবা বঙ্কবিহারি বণিক ছিলেন কুমুদিনী হাসপাতালের হেড কম্পাউন্ডার। সেই সূত্রে হাসপাতালের কোয়ার্টারেই তার বেড় ওঠা। মেয়েটি তখন পড়ত ভারতেশ^রী হোমসে অষ্টম শ্রেণিতে। একদিন মেয়েটি দেখল, একদল বয়স্ক মানুষ একে অপরের কাঁধে হাত রেখে সারি বেঁধে কোথায় যেন যাচ্ছেন। তাদের হাঁটা স্বাভাবিক মনে হলো না মেয়েটির কাছে। কৌত‚হলী মেয়েটি লক্ষ করল সারির সামনে থাকা লোকটি অন্য লোকগুলোকে ধীরে ধীরে নিয়ে বসালেন হাসপাতালের বেঞ্চে। সেদিন এর বেশি আর দেখা হয়নি তার। ফিরতে হয়েছিল বাসায়। কিন্তু কিছুতেই যেন নিজের কৌত‚হলী মনকে শান্ত করতে পারছিল না সে। রাত পেরুতেই মেয়েটি ছুটল হাসপাতালের দিকে। সেখানে থাকা লোকদের কাছে জানতে চাইল কাল যে সারি বেঁধে এতগুলো লোক এলো তারা কেন এসেছিল? এখন তারা কোথায়? তখন মেয়েটি জানতে পারে দল বেঁধে আসা লোকগুলো ছিলেন দৃষ্টিহীন। তাদের চোখের ছানি অপারেশন করা হবে। মেয়েটি দেখল ওই লোকগুলোর চোখে ব্যান্ডেজ। কিছু দিন পর দেখল তাদের চোখে কালো চশমা। মেয়েটির কৌত‚হল এরপর কী হবে? এ ঘটনার দুই মাস পর মেয়েটি দেখল ওদের সবার চোখে মুখে আনন্দ যেন ঠিকরে পড়ছিল। দীর্ঘদিনের অন্ধকার জীবন থেকে ওরা ফিরেছে আলোতে। চশমা চোখে ওরা দেখতে পাচ্ছে। ওই দৃষ্টিহীন মানুষগুলোর দৃষ্টি ফিরে পাওয়ার আনন্দ মেয়েটির স্মৃতিপটে আজো উজ্জ্বল। সেদিন থেকেই মেয়েটি ব্রত নিয়েছিল দৃষ্টিহীন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর।

সেদিনের সেই ছোট্ট মেয়েটি আজ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চক্ষু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আভা হোসেন। তার দীর্ঘ যাত্রা পথে তাকে উৎসাহ দিয়েছেন বাবা বঙ্কবিহারী বণিক, মা কিরণ বালা বণিক ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। তার দৃঢ় মনোবল এবং অভূতপূর্ব ফলাফল তাকে পৌঁছে দিয়েছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে।

এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. আভা বলেন, আমি ছিলাম সাত ভাইয়ের এক বোন। সবার খুব আদরের। বাবা-মা সব সময়ই আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। পরিবারের সবার সহযোগিতা পেয়েছি। এরপরও যাদের কাছে আমি ঋণী তারা হলেন রায় বাহাদূর রনদা প্রসাদ সাহা ও তার পরিবার, আমার বড়দা ডা. সন্তোষ কুমার বণিক এবং আমার স্বামী অধ্যাপক ডা. শাহ মুনীর। তাদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা আমাকে চলার পথে শক্তি জুগিয়েছে। তবে আমি এও বলল, সেদিন সেই দৃষ্টিহীন মানুষগুলোর জন্যই আজকের আমি। ওই মানুষগুলোর আনন্দ আজো আমার চোখে ভাসে। এমবিবিএস পাসের পর অনেকেই আমাকে অন্য বিষয় নিয়ে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু আমি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলাম যে আমি চক্ষু চিকিৎসকই হবো। হলামও তাই।

ডা. আভা হোসেন ভারতেশ^রী হোমস থেকে ১৯৬৮ সালে ম্যাট্রিক ও ১৯৭০ সালে ইন্টারমেডিয়েট এবং ১৯৭৬ সালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। ‘অন্ধ জনে দেহ আলো’ এই ব্রত নিয়ে ১৯৭৭ সালের ৪ এপ্রিল তিনি জীবনের প্রথম চাকরিতে যোগ দেন ওই একই মেডিকেল কলেজে। এরপর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে কাটিয়েছেন দীর্ঘ কর্মময় জীবন। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন। রেখেছেন তার মেধা ও দক্ষতার স্বাক্ষর। অধ্যাপক ডা. আভা হোসেন সার্ক একাডেমি অব অপথ্যালমোলজি, বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতি, বাংলাদেশ কমিউনিটি অপথ্যালমোলজিক্যাল সোসাইটির সভাপতি এবং এশিয়া প্যাসিফিক একাডেমি অফ অফথালমোলজির (এপিএও) উইমেন অব অপথ্যালমোলজি সোসাইটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।

এরই ধারাবাহিকতায় এপিএওর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন অধ্যাপক ডা. আভা হোসেন। করলেন ইতিহাস। ডা. আভাই প্রথম বাংলাদেশি যিনি প্রথমবারের মতো এই প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন। শুধু তাই নয় তার আগে এই প্রতিষ্ঠাটির ৬০ বছরের ইতিহাসে কোনো নারী এই পদে আসীন হতে পারেননি। চীন, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, ভারতসহ বড় ও প্রভাবশালী দেশের উপস্থিতিতে এ বিজয় নারী সমাজের তো বটেই বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সম্মানের বিষয়। এ বিজয় দেশের ইতিহাসকেও করেছে সমৃদ্ধ। আগামী চার বছর তিনি এই দায়িত্ব পালন করবেন। বর্তমানে ইলেক্টে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং ২০২১ সালে তিনি সভাপতির পূর্ণ দায়িত্ব লাভ করবেন। এর আগে ২০১৫ সালের ৩১ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল চীনের গুয়ানজোতে অনুষ্ঠিত একাডেমির ৩০তম কংগ্রেসে সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। সেবার চীন ও নিউজিল্যান্ডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেন তিনি।

চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে পেয়েছেন দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরস্কার আলীম মেমোরিয়াল গোল্ড মেডেল। এ ছাড়া মোবারক আলী গোল্ড মেডেল, বাংলাদেশ চক্ষু চিকিৎসক সমিতির আজীবন সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। তার প্রাপ্তির ঝুলিতে আছে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মাননাও। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-এপিএওর ডিস্টিংগুইসড সার্ভিস এওয়ার্ড ও আর্থার লিম এওয়ার্ড, সার্ক একাডেমি অফ অপথ্যালমোলজির পক্ষ থেকে মোদাচ্ছে-দাউদ-মালা এওয়ার্ড, ইন্ডিয়ান এলামনাই গ্রুপ অফ আইসিইএইচ, লন্ডন। এ ছাড়ও বিভিন্ন সময় দেশে বিদেশে পেয়েছেন বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা।

এত প্রাপ্তিও তাকে এতটা আলোড়িত করে না। যতটা তিনি আলোড়িত হন দৃষ্টিহীন মানুষের দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়ার পর। অধ্যাপক ডা. আভা হোসেন বলেন, এপিএওর সভাপতি নির্বাচিত হওয়া অবশ্যই অনেক বড় অর্জন। তবে এখানে ব্যক্তি আভা হোসেনের কোনো কৃতিত্ব নেই। এই কৃতিত্ব আমার দেশের। আমার দেশের মানুষের। আমি বাংলাদেশের নামটা যে বিশে^র কাছে তুলে ধরতে পেরেছি সেটিই আমার বড় আনন্দ।

সম্মেলনে এপিএওর সভাপতি হিসেবে নিজের নাম শোনার পর কেমন অনুভূতি হয়েছিল জানতে চাইলে তিনি বলেন, সবার সামনে আমার নামটার সঙ্গে যখন বাংলাদেশের নাম ঘোষণা করা হলো তখন উপস্থিত সবাই করতালি দিয়ে আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। আমার তখন মনে হচ্ছিল আমার হাতে যদি একটা পতাকা থাকত। আমি যদি সবাইকে আমার দেশের লাল-সবুজের পতাকাটা উড়িয়ে দেখাতে পারতাম। আমার আরো বেশি আনন্দ হতো। আমার দেশ, আমার দেশের পতাকা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ, আমার মাতৃভাষা, আমার অহঙ্কার। বাঙালি হিসেবে আমি গর্বিত। একাত্তর সালে বাবা আর ছোট দুই ভাই শ্যাম সুন্দর ও গৌর সুন্দর বণিক মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদারদের দ্বারা। তারা প্রাণে বেঁচে গেলেও সেদিনের বীভৎসতার কথা মনে হলে এখনো আমি আঁতকে উঠি। দেশের জন্য কিছু করতে পারলে নিজেকে ধন্যই মনে করব।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj