কৃষির হাল এখনো নারীর হাতে

সোমবার, ১৮ মার্চ ২০১৯

অন্যপক্ষ প্রতিবেদক

প্রাচীন যুগে কৃষিকাজের সূচনা হয় নারীর হাত দিয়ে। আদিম যুগে পুরুষরা যখন পশু শিকারে বেরিয়ে পড়তেন তখন নারীরা ব্যস্ত থাকতেন গৃহস্থালি কাজে। নারী নিজের হাতেই বীজ বপনের মধ্য দিয়ে চাষাবাদের প্রচলন শুরু করে। মাটিতে ফেলে রাখা বীজ থেকে চারা গজাতে দেখে আনন্দিত হয়ে উঠেছিলেন তারা। এভাবেই কৃষির সূচনা। সেই থেকে আজ অবধি এই পেশায় যুক্ত আছেন নারীরা। দিন দিন কৃষি কাজে নারীর সংখ্যা বাড়ছে। তবে বৈষম্য এ ক্ষেত্রেও নারীর পিছু ছাড়েনি।

সম্প্রতি ‘নারীর ভূমি অধিকার, কৃষিতে অংশগ্রহণ এবং নারীর নিরাপত্তা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে ভূমি ও কৃষির বাণিজ্যিকিকরণ হচ্ছে; ভূমি দখল হয়ে যাচ্ছে। নগদ অর্থের হাতছানিতে কৃষি থেকে পুরুষের সম্পৃক্ততা কমে যাচ্ছে। পুরুষের অবর্তমানে দুর্বল এই কৃষি খাতে নারীদের সম্পৃক্ততা দ্রুত হারে বাড়ছে। গত সাত বছরে কৃষিখাতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে ৮ শতাংশ। অথচ নারীদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি নেই। রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে এক কোটি ৩৯ লাখ ‘কৃষক কার্ড’ বিতরণ করা হলেও কতজন নারী কৃষক এ কার্ড পেয়েছেন তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।

গবেষণায় দেখা গেছে, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তায় নারীরা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা একাধারে খাদ্য উৎপাদক, বীজ ও লোকায়ত জ্ঞান সংরক্ষক, কৃষি শ্রমিক, অন্যদিকে খাদ্য প্রস্তুত এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও সংরক্ষণ করে। চাষের জন্য জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা ও বাজারজাতকরণের পূর্ব পর্যন্ত কৃষি খাতের ২১ ধরনের কাজের মধ্যে ১৭টিতে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় কৃষি সম্প্রসারণ সেবা, প্রযুক্তিগত তথ্য, সার, বীজ, সেচের পানি, ঋণ, বাজার ব্যবস্থা ইত্যাদি সুবিধা থেকে নারী বঞ্চিত হচ্ছেন। একই কারণে কৃষিতে নারীর ভূমিকাকে পারিবারিক কাজের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাকে কৃষি অর্থনীতি ও উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যতম নিয়ামক শক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। এত প্রতিবন্ধকতা থাকা সত্ত্বেও কৃষিশ্রমে নারীদের সম্পৃক্ততা দ্রুত হারে বাড়ছে।

কৃষিতে নারীর সম্পৃক্ততা বাড়লেও ভূমির মালিকানা এখনো পুরুষেরই হাতে। অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাতের এক গবেষণায় দেখা যায়, ভূমিতে গ্রামীণ নারীর মালিকানা মাত্র ২ থেকে ৪ শতাংশ এবং বাকি ৯৬ শতাংশ জমির ব্যক্তি মালিকানা রয়েছে পুরুষের নামে। নারীর সম্পদহীনতা ও বৈষম্যের বিষয়টি রাষ্ট্রের নীতিতেও খুব স্পষ্ট। নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১-এর ১১নং দফায় বলা হয়েছে দেশের দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী শতকরা ৪০ ভাগ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ নারী। বৃহত্তর এই দরিদ্র, প্রান্তিক ভূমিহীন মানুষের ভূমিতে প্রবেশাধিকারের একমাত্র উপায় খাসজমি। বাংলাদেশের খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বণ্টন নীতিমালায় স্বামী-স্ত্রীর যৌথ মালিকানার বিধান থাকলেও নানাক্ষেত্রে তা নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক। এ নীতিমালানুযায়ী অগ্রাধিকার তালিকায় নারীর অবস্থান রয়েছে একেবারে নিচের দিকে। সেখানে বলা আছে, ভূমিহীন নারী যৌথ নামে স্বামীর সঙ্গে খাসজমির জন্য আবেদন করতে পারবে। স্বামী পরিত্যক্তা বা বিধবা নারীর ক্ষেত্রে সক্ষম পুত্রসন্তানসহ আবেদন করার নিয়ম রয়েছে। অর্থাৎ নাবালক পুত্রসন্তান বা কন্যা সন্তানের মাতা হিসেবে কোনো বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা নারী খাসজমি প্রাপ্তির অগ্রাধিকার তালিকায় স্থান পাবেন না। নারীর প্রান্তিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে খাসজমি বণ্টনের ক্ষেত্রে নারীদের অধিকার নিশ্চিত করার এই বিষয়টি নারী নীতিতেও সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। অথচ নারী উন্নয়ন নীতিতে বলা হয়েছে অতি দরিদ্রদের দুই-তৃতীয়াংশ নারীর অধিকাংশই বিধবা ও পরিত্যক্তা অথবা তালাকপ্রাপ্ত। রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টনে এরকম বৈষম্যমূলক নীতি কার্যত অতি দরিদ্র অধিকাংশ নারীর খাসজমি পাওয়ার অধিকারকে ব্যাহত করবে। আর অতি দরিদ্রকে সম্পদ দেয়া না গেলে দারিদ্র্য বিমোচনের স্বপ্ন কখনোই বাস্তবে রূপলাভ করবে না। এ সব নীতিকাঠামো ভূমিতে নারীর পূর্ণ অধিকার ভোগের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নারীর শ্রম ও অংশগ্রহণ বিশ্বব্যাপী সর্বজনবিদিত। কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার কারণে নারীরা এখনো কৃষক হয়ে উঠতে পারেনি। নারীর ভূমি অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমি সংস্কার অধ্যাদেশ-১৯৮৪তে নারীর অন্তর্ভুক্তি যোগ করার জন্য এর সংশোধন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে খাসজমি বিতরণ ও বন্দোবস্ত নীতিমালার প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং নারীর নিরাপত্তার জন্য সর্বস্তরে নারীবান্ধব সুশাসন প্রতিষ্ঠার কথাও বলেছেন তারা।

এসোসিয়েশেন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদার মতে, কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশে কৃষিকে যেমন উপেক্ষা করা যায় না, তেমনি এ খাতে নারীর অবদানকেও আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। কৃষির আবিষ্কারক নারীর জন্য আইন তৈরি করা হলেও কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিখাতে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের স্বীকৃতি ও ন্যায্য মজুরি প্রদান নিশ্চিত করতে পারলে দেশের কৃষি উৎপাদন কাজে নারীরা আরো আগ্রহী হবে। এর ফলে কৃষিখাতের উৎপাদন বাড়বে, জিডিপিতে কৃষির অবদানও বাড়বে।

মানবাধিকার কর্মী খুশি কবীর বলেন, উন্নয়নের ভিত মজবুত করতে হলে সমাজ থেকে বৈষম্য দূর করতে হবে। কৃষি, ভূমির বাণিজ্যিকীকরণের কারণে আমাদের খাদ্য সার্বভৌমত্ব আজ হেরে গেছে। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন আনতে হবে। ভূমি সংস্কার ও খাসজমি নীতিমালা সংশোধন করা প্রয়োজন।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj