এগিয়েছি তবুও পিছিয়ে : কাঞ্চন রানী দত্ত

সোমবার, ১১ মার্চ ২০১৯

মম একটি সরকারি দপ্তরে পদস্থ। একদিন তার পরিচিত একজনের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। সে বলল, বউ যদি রান্না-বান্না না করে তাহলে তাকে পালন করব কেন? এটি শোনার পর থেকেই মম’র মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকল। মেয়ে হোক, মা হোক, ঘরের বউ হোক তাদের কি এই সমাজ এখনো গৃহপালিত প্রাণী ভাবে কখনো কখনো! সমাজ তো প্রকৃত দৃশ্যত কোনো বস্তু বা পদার্থ নয়, তাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। আমরা মিলেই সমাজ। আমি, আমরা বদলালেই সমাজ পরিবর্তিত। আমরা সভ্য হলেই সমাজ সভ্যতার ছোঁয়ায় সভ্য, আমরা ধ্বংস হলেই সমাজ বিধ্বংসী রূপে ধরা দেয়। চতুর্দিকে কত পরিবর্তন, উন্নয়ন। আধুনিক থেকে আমরা অত্যাধুনিক যুগে প্রবেশ করেছি, বাংলাদেশও দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে। তবুও কোথাও যেন কিসের অভাব। আমাদের দেশে এখন আর মহিলা কর্মকর্তা হিসেবে মহিলাদের দেখা হয় না তাদেরও আমরা এখন অফিসার/কর্মজীবীই হিসেবে চিহ্নিত করি। অফিস বা কর্মক্ষেত্রে তারা গুরুত্ব পেলেও বন্ধু/সহকর্মী/পরিবারে কখনো কখনো ভিন্নভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কখনো কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সাধিত হয়নি। প্রতিটি মানুষের সুনির্দিষ্ট চিন্তা, জ্ঞান, সত্তা আর অনুভূতি রয়েছে। অন্যের চিন্তা আর অনুভূতির প্রতি বিশেষত নারী/মেয়ে/বউদের প্রতি আমরা সংবেদনশীল নয়। একজনের অনুভূতিতে আঘাত করাও অন্যায়/অপরাধ হিসেবে ক্ষেত্রবিশেষে বিবেচিত হতে পারে।

২০১৯ সালের বিশ্ব নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ইধষধহপব ঞযব ইবঃঃবৎ’ অর্থাৎ জেন্ডার ভারসাম্য পৃথিবী গড়া।

শুধু দৃশ্যত ভারসাম্যই যথেষ্ট নয়। চিন্তা ভাবনাতেও ভারসাম্যতা প্রয়োজন। একে অন্যের প্রতি সম্মান; অন্যের চিন্তাভাবনার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়াটাও জরুরি। মতবিরোধ থাকতেই পারে সেটিও যৌক্তিকভাবেই তার্কিকদের মতো খণ্ডন আবশ্যক। ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ উভয় অর্থনীতিতেই নারীর সিংহভাগ অবদান। কোনো কোনো পরিবার নারীর উপার্জনেই চলছে। নারী একাকীই মা-বাবা, ভাই-বোন, সন্তানের দায়িত্ব পালন করছে দায়িত্বশীল অভিভাবকের মতোই। পরিবারের এই চিত্র থেকে বৃহৎ অর্থনীতিতে তার অবদানের চিত্রও সহজেয় অনুমেয়।

বাড়ি ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রে বাড়ির মালিকদের সঙ্গে কথা বলতে গেলেই আগে শুনে স্বামী কি করে। স্কুলে সন্তানকে ভর্তির ক্ষেত্রে বাবা কি করে? স্ত্রী বা মা যে কিছু করতে পারে সে জিজ্ঞাসা এখনো কখনো কখনো অপশনাল/সেকেন্ডারি। মায়ের পরিচিতি/প্রফেশনও যে একজন সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বা তার সন্তানের সামাজিক মর্যাদাকে বাড়িয়ে দিতে পারে সেটি অনেক জ্ঞানী মানুষের স্মৃতি থেকেও বিলুপ্ত হয়ে যায়। বিংশ থেকে নারীরা একবিংশ শতাব্দীতে এসে তার অবস্থানকে আরো সুসংহত করতে পেরেছে। রাষ্ট্রীয় নীতিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত/সংশোধিত/প্রণীত হচ্ছে। নীতি প্রণয়নের সঙ্গে সেটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও যেন নারীবান্ধব বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়। সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি প্রয়োজন। নারীর দৃষ্টিকোণ থেকেও কিছু কিছু বিষয় বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। আমরা কোনো কন্যা/জায়া/ জননীকে আর গৃহপালিত জীবজন্তু প্রাণী ভেবে তাদের মর্যাদাকে ক্ষুণœ করব না, আত্মমর্যাদা বজায় রেখেই অন্যকে তার প্রতি প্রাপ্য ন্যূনতম সম্মানটুকু প্রদর্শন করা যায় জ্ঞান যেমন বিতরণ করলে বিতরণকারীর ভাণ্ডার তাতে শূন্য হয় না বরং সমৃদ্ধ হয়। অন্যকেও আলোকিত করা যায় তেমনি অন্যকে গুরুত্ব দিলে নিজের গুরুত্ব তাতে বৃদ্ধিই পায়, লোপ পায় না। অতিশয় হস্তি লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে। তেলাপোকার মতো টিকে থেকে লাভ কি? নিজে নিজের ভীত মজবুতপূর্বক পরিবার সমাজ সংসারের অবস্থানকেও পরিবর্তিত করা সহজতর। সর্বোপরি জেন্ডার ভারসাম্যের মাধ্যমেই সম-উন্নয়ন সম্ভব।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj