যে কোনো নূরজাহান আমার মা : আঁখি সিদ্দিকা

সোমবার, ১১ মার্চ ২০১৯

আমার মা নূরজাহান। পৃথিবীর আলো। পৃথিবীকে আলো করা পর্যন্ত মা যেতে পারেননি। তবে আলো করেছেন আমাদের পৃথিবী। আকাশের সীমানা থেকে এক ঝলক রোদ যেমন ঝুলে পড়েছে আমাদের ছোট্ট মফস্বল শহরে তেমনি মায়ের হাতের সদ্য মাজা বাসন কোসনের আলোয় আলোকিত দেখি আমার মায়ের সামান্য সংসার। মা বরাবরই আমদের এই ছোট ছোট দুটি গোলপাতার ঘরকে আলোকিত করার জন্য নিজে অন্ধকারে থেকেছেন। কত বছরের পুরনো আমাদের কলতলা মায়ের হাতে পড়ে আজো চকচক করছে কেবল বেড়ে ওঠা কদম পাতার মতো। বাবার নামে বা কাজে কোন জ্যোতি না থাকলেও তাকে মাসহ সেজদা দিতাম। কারণ মা ছিল আমাদের গোত্রের মানে প্রজার মতো। বাংলাদেশের নামমাত্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সরকার আর সাধারণ জনগণের মতো। সমাজের অন্যতম প্রতিনিধি আমার বাবার ধর্ম নামক অদৃশ্য পাথর… ভয়ঙ্কর সব নিয়মকানুন, আমার মাকে ধীরে ধীরে টেনে বের করে এনেছে তার ব্যক্তিগত জীবন থেকে। এই নূরজাহানকে এই সংসারের শৃঙ্খলে বাঁধার আগে কথা ছিল পড়তে পারবে। ৮ম শ্রেণির নূরজাহান নিজ বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল রবীন্দ্রনাথ নজরুল শরৎ আরো অনেককে। তাদের ফেলে দেয়া হয় উঠোনের সামনে জলা পুকুরটিতে। তারা ওখান থেকে নুরজাহানের জন্য কবিতা আর গল্প লেখে। বিয়ের সাজে নুরজাহানের কপালে ছিল লাল রংয়ের টিপ। শাশুড়ি ছাফ বলে দিলেন এই বাড়িতে ঢাকাইয়া বেল্লালাপনা চলবে না। টিপের রং তোলো। মা আমার ছোট আয়না হাতে ঘষে ঘষে টিপের রং তুলে দাগ করে দিলেন কপাল। সেই দাগ আজো মায়ের কপালে। ধর্মে জন্মনিয়ন্ত্রণ জায়েজ নাই আবার পুত্র সন্তান না হলে বংশের আলো ধরাবে কে? একে একে ছোট্ট শরীরটায় হলো পাঁচ কন্যা সর্বশেষে এক পুত্র সন্তান। বলা হলো.. মায়ের কন্যা সন্তানরা পড়তে পারবে না… চুপি চুপি মেয়েদের পড়ানো আর কন্যাদের আবৃত্তি আর নজরুল সঙ্গীত শোনার দায়ে মাকে পোহাতে হয়েছিল অসম্মান আর অকথ্য নির্যাতন। নূরজাহানরা মরে যাচ্ছে… নারীরা মরে যাচ্ছে কেউ কেউ আবার ধুঁকে ধুঁকে বাঁচছে। তাদের মৃত্যু আর বেঁচে থাকার মাঝে দৃশ্যত পার্থক্য থাকলেও অন্তর্গত কোনো পার্থক্য নেই।

আমরা নারীরা আসলেই একেকজন নূরজাহান। আমাদের জন্য গর্ত খোঁড়া হয়। আমাদের জন্য বিচিত্র বিচিত্র ফতোয়া জারি করা হয়। আমরা ঘরে বসে থাকার জিনিস। এখন নাকি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া হচ্ছে। বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে। দৃশ্যত এগুচ্ছে। আসলে কি অন্তর্বর্তীকালীন ঘটনা কি? জন্মের পর নারী একেকজন পুরুষ অভিভাবক দ্বারা শাসিত হয়, বিয়ে নামক ঘটনার দ্বারা নিবেদিত হয় স্বামী নামক অভিভাবকের কাছে। হৃদয় আর শরীর সঁপে দেয়া পর নারী তালাক দেয়াও হয়। তালাক দেয়ার পর খোরপোষের ব্যবস্থা আছে নারীকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যাতে সে বেঁচে থেকে অন্য পুরুষের ভোগের জন্য সমর্পিত হতে পারে। নারীর জন্য শিক্ষা আছে, স্বাস্থ্য …স্বনির্ভরতা ও সচেতনতা আছে তা কেবল অন্তঃসারশূন্য চৈতন্য। যে নারী ভাবে সে নুরজাহানের মতো অত্যাচারিত নয়, সে মিথ্যা ভাবে। বোধোদয় হলে সে নিশ্চয়ই বুঝবে সেও আসলে আমার মা নুরজহান। তখনই তার রুখে দাঁড়ানোর আসল সময়। তবুও নূরজাহানরা রুখে দাঁড়ায়, এগিয়ে যায়, প্রতিবাদ করে, আলোকিত করে আমার মায়ের মতো তার নিজের সংসার, সমাজ ও পৃথিবী। তাই তো আমাদের মা আর বনফুলের পাপড়ি নয়, সারাদিন ঝরে ঝরে পড়ে না। আমাদের মা আর ধানক্ষেত নয়, সোনা হয়ে বিছিয়ে থাকে না। আমাদের মা আর দুধভাত নয়, আমরা আর দুধভাত পছন্দ করি না। আমাদের মা আর ছোট্ট পুকুর নয়, পুকুরে সাঁতার কাটতে আমরা কবে ভুলে গেছি। কিন্তু আমাদের মা আজো অশ্রæবিন্দু, গ্রাম থেকে নগর পর্যন্ত আমাদের মা আজো টলমল করে। বিশ্বের সব মা ভালো থাকুক। ভালো থাকুক সব নূরজাহান।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj