জ্বলে ওঠো আপন শক্তিতে… : লাভলী ইয়াসমিন জেবা

সোমবার, ৪ মার্চ ২০১৯

নারী এক সম্পূর্ণ মানবসত্তা। হস্ত, পদ, কর্ণ, নাসিকা, মস্তিষ্ক, কাম, ক্রোধ, কামনা, বাসনা ইত্যাদি সব নিয়েই সে এক পূর্ণ আত্মা এবং এটাই সত্য, চিরন্তন সত্য। তবে কেন না পাওয়ার বেদনা, অপূর্ণতার হাহাকার, না বলা স্বপ্নের হঠাৎ জেগে ওঠার পরক্ষণেই নিভৃতে নিভে যাওয়ার নিষ্ঠুর লুকোচুরি খেলা নারীকে কষ্ট দেয়, ব্যথিত করে, বঞ্চিত করে। কেন প্রকৃতির এই অমানবিক আঘাত? কেন নিজেকে মানুষ হিসেবে প্রমাণের পরীক্ষা দিতে হয় বারবার? কেন তবে নামতে হয় অধিকার আদায়ের যুদ্ধে? এ যুদ্ধ কার সঙ্গে? কে তার প্রতিপক্ষ? সেকি সে নিজেই, নাকি তার পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা আছে বলেই হয়তো আমরা আর জানতে চাই না। জেগে আছি বলেই ঘুমিয়ে থাকার ভান করি। অতলে গভীরে যেতে চাই না- ওখানে যে আরো অন্ধকার, আরো কালো। অন্ধকারকে আমরা কম বেশি সবাই ভয় পাই, তাই এড়িয়ে চলি। কিন্তু যে অন্ধকার মানুষের নিজের ভেতরে নিত্য বিরাজ করে তা থেকে মুক্তির উপায় কি? অন্তরের সংকীর্ণতা, সংকোচতা, মলিনতা গ্রাস করে প্রথমত সেই মানুষটিকেই, হোক সে নারী বা পুরুষ।

প্রতিটি মানুষের ভেতরেই দুমুখী চিন্তা-চেতনা কাজ করে- অন্তর্মুখী ও বহির্মুখী। অন্তর্মুখী ধারার মানুষ ভাবে অনেক বেশি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার প্রকাশ ঘটাতে পারে না। লালিত স্বপ্ন, অভিলাষ, জেগে উঠার প্রাণশক্তি এমনকি নিঃশব্দে নিত্য চর্চিত প্রতিবাদের ভাষাও আস্তে আস্তে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। অনেকটা হাল ছেড়ে দেয়া নাবিকের মতো, নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার জন্য সময় গোনা। এটাই কী তবে জীবন? সত্যিকারের মানবজীবন!

অন্যদিকে বহির্মুখী ধারার মানুষ যা ভাবে তা প্রকাশ করে বা প্রকাশের চেষ্টা করে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে নারী-পুরুষ উভয়ের মধ্যেই এই প্রবণতা একইভাবে দেখা যায়। কিন্তু প্রকাশের সুযোগ, অর্জনের ধরন কি এক হয়? স্পষ্টতই বলতে হয় ‘না’- এক হয় না। কারো জন্য প্রাপ্তি, কারো কাছে বঞ্চনা। কারো জন্য প্রশংসা, কারো প্রতি অসম্মান। কারো কাছে অর্জন, কারো জন্য বেদনা। কেন এই বিদ্বেষ, বিভেদ? কে হয় এই প্রতিহিংসা বা প্রবঞ্চনা শিকার?

চলমান পরিস্থিতির পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, আজো আমাদের পরিবারে এবং সমাজে নারীরাই বঞ্চিত, নিপীড়িত, পিছিয়েপড়া জনগোষ্ঠীর প্রথম সারিতে। কিন্তু কেন? পুরুষশাসিত সমাজব্যবস্থা, পরিবারে পুরুষের কর্তৃত্ব, সিদ্ধান্তগ্রহণের মালিকানা পুরুষের মুঠোয়, নারীর সম্মান, সম্ভ্রমের নিশ্চয়তা বিধান তাও পুরুষের জিম্মায়! তবে নারীর আছে কি? চোখের জল, কষ্ট-চাপা মুখের হাসি, পরিবারের জন্য কুশল কামনা আর সবার উপরে সবকিছু মেনে নেয়ার অসীম ধৈর্যশক্তি। প্রশ্ন রয়ে গেল বিবেকের কাছে, নৈতিকতাবোধের কাছে- নারী তাতে কী পেয়েছে? নিবেদিতপ্রাণ নারী কি পেয়েছে তার যোগ্য সম্মান, প্রশ্নাতীত সমঅধিকার, প্রতিভা বিকাশের ন্যায্য সুযোগ বা নিরাপদ মর্যাদার আসন। সহজ উত্তর; না, এখনো কাক্সিক্ষত মাত্রায় নয়। কবে এই অর্জন সম্ভব- তাও জানি না।

অধিকার ও মর্যাদা কেউ কাউকে দেয় না; অর্জন করতে হয়। সত্য, দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নিলাম। জীবনে সার্থকতা অর্জনের পথ সুগম নয়। চলার পথে কাঁটা থাকবে, কালো থাবার ভয় থাকবে, অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া, হোঁচট খেয়ে পিছলে পড়া- অতঃপর আবার ওঠে দাঁড়ানো। এমন অবস্থায় কেউ এসে হাত ধরতে পারে আবার নাও পারে। তবে কি থমকে গিয়ে থেমে যাওয়া! না, আর নয়। শিরদাঁড়া সোজা করে, অদম্য মানবিক শক্তিতে জেগে ওঠো নারী। যেতে হবে অনেক দূর। সমানে হাতছান দিচ্ছে চেতনার অগ্নিশিখা। প্রভাতের ¯িœগ্ধ আলোয় তাকে প্রজ¦লিত করে তুলো; স্বমহিমায়, আপন শক্তিতে। সফল হোক নারীর পূর্ণ মানবজীবন অধিকার, মর্যাদা, সম্মান আর প্রত্যাশিত অর্জনের নতুন সুরে, নতুন রংয়ে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj