ঢাকার বাইরেও নারীরা ছিল সোচ্চার

সোমবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ঢাকার বাইরে যেসব নারী ভাষা সৈনিক সেদিন ভাষা আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন মমতাজ বেগম ও প্রতিভা মুৎসুদ্দি তেমনি দুই নারী।

মমতাজ বেগমের আসল নাম কল্যাণী রায় চৌধুরী। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সারাদেশ যখন উত্তাল সেই হাওয়া লেগেছিল নারায়ণগঞ্জেও। ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করলেন মমতাজ। শুধু তাই নয়, আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন তার স্কুলের শিক্ষক, ছাত্রী ও সাধারণ নারীদের। ২১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে শহরের রহমতউল্লা মুসলিম ইনস্টিটিউটের সামনে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সমাবেশ চলছিল। সমাবেশের প্রধান বক্তা মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম। তখনই ঢাকা থেকে খবর এলো ২১ ফেব্রুয়ারিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের ছাত্র মিছিলে গুলি করা হয়েছে। গুলিতে কয়েকজন মারাও গেছেন। মুহূর্তেই জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। চারদিকে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্কুলের ছাত্রী ও শিক্ষকদের বিশাল মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন মমতাজ বেগম। সেখান থেকেই বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। শহর হয়ে ওঠে উত্তপ্ত। মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে একুশে ফেব্রুয়ারির মিছিলের আগে কখনো নারায়ণগঞ্জে নারীদের মিছিল সংঘটিত হয়েছে বলে জানা যায় না। সেই মিছিলটিই ছিল নারায়ণগঞ্জে নারীদের সংঘটিত প্রথম মিছিল।

এই সাহসী ভূমিকার জন্য মুসলিম লীগ সরকারের রোষানলে পড়েন মমতাজ বেগম। তাকে গ্রেপ্তার করার নির্দেশ দেয় প্রশাসন। তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হয়। এ খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। খবর পেয়ে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে এবং বিভিন্ন মিলের শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে মিছিল করে আসে নারায়ণগঞ্জ কোর্ট প্রাঙ্গণে। শহরজুড়ে শুরু হয় মানুষের বিক্ষুব্ধ আলোড়ন। মমতাজ বেগমকে বহনকারী ঢাকাগামী গাড়িটি চাষাঢ়া মোড়ে এলে হাজার হাজার মানুষ গাড়ির পথ রোধ করে দাঁড়ায়। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের পথে বড় বড় ১৬০টি গাছ কেটে ব্যারিকেড তৈরি করে ছাত্রছাত্রীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পাঞ্জাব রেজিমেন্ট নারায়ণগঞ্জে আসে। শুরু হয় পুলিশের নির্মম অত্যাচার। লাঠির আঘাতে রক্তাক্ত হয় হাজারো মানুষ। গ্রেপ্তারও করা হয় নির্বিচারে। শেষ রক্ষা হলো না। ট্রাকের পর ট্রাক পুলিশ এসে ঢাকার কারাগারে নিয়ে গেল তাকে। ১৯৫৩ সালের শেষদিকে দেড় বছর কারাভোগের পর মুক্তি পান মমতাজ। ২০১২ সালে তাকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করেন সরকার।

ভাষা আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। বায়ান্নতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলনে চট্টগ্রামে হাতেগোনা যে কয়জন নারী সক্রিয়ভাবে অংশ নেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি তাদের অন্যতম। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে বক্তব্যের প্রতিবাদে চট্টগ্রামে যে মিছিল বের হয় সেই মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন তিনি। তখন থেকেই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষার সপক্ষে অনুষ্ঠিত আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এই ভাষা সৈনিক। এ ছাড়া বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজের সঙ্গে বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নেয়া, পোস্টার লেখা এবং অভিভাবকদের বাধাকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষার দাবিতে রাজপথে নেমেছিলেন প্রতিভা মুৎসুদ্দি। অকুতোভয় এই ভাষা সৈনিক ভাষার অধিকার বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কারাবরণও করেন। ২০০২ সালে পেয়েছেন একুশে পদক।

একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার ঘটনার প্রতিবাদে ২২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ মিছিল ও সমাবেশ করে। এবং তা প্রায় সপ্তাহখানেক অব্যাহত ছিলো। ঢাকায় ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে চট্টগ্রামে নারীদের প্রথম প্রতিবাদ মিছিলে তার অংশগ্রহণ ছিল সক্রিয়। সেই মিছিল ছাড়া অন্য কর্মসূচিতেও নারীরা ট্রাকে করে শহর প্রদক্ষিণ করতেন। প্রতিভা মুৎসুদ্দি চট্টগ্রামের কলেজ থেকে অন্য সহপাঠীদের নিয়ে এসব কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতেন।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj