নির্মিত হয়নি ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা

শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

প্রায় সাত দশক আগে ভাষার জন্য জীবন দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বাঙালি জাতি। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামে নেমেছিল এই ভূখণ্ডের মানুষ। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ৬৮ বছর পেরিয়ে গেলেও নির্মিত হয়নি ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে কোনো পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। সেলুলয়েডের ফ্রেমে গাঁথা হয়নি বাঙালির জীবনের সেই অমর মহাকাব্য। ২০১০ সালে রোকেয়া প্রাচী নির্মাণ করেছিলেন তথ্যচিত্র ‘বায়ান্নর মিছিলে’। ভাষা শহীদ আবুল বরকতকে মুখ্য প্রেক্ষাপট ধরে মূলত ভাষা আন্দোলনকেই তুলে ধরা হয়েছে এ তথ্যচিত্রটিতে। রোকেয়া প্রাচী বলেন, মাতৃভাষার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর মমত্ববোধ থেকেই নির্মাণ করা হয়েছে ‘বায়ান্নর মিছিলে’। কেন পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা নির্মাণ হয়নি? রোকেয়া প্রাচী বলেন, ভাষা আন্দোলন অনেক বড় ক্যানভাস। এর জন্য অনেক প্রস্তুতি এবং বাজেটের দরকার। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তৌকীর আহমেদ নির্মিত ‘ফাগুন হাওয়ায়’ নামের একটি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়ে নির্মিত হলেও ছবিটির গল্প ভাষা আন্দোলনকে ঘিরে নয়। তৌকীর আহমেদ বলেন, আমি এমন একটি ছবি নির্মাণ করেছি যা কিনা ভাষা আন্দোলনের চেতনাকে স্পর্শ করবে। পাশাপাশি সিনেমাটিতে একটা অনবদ্য প্রেমের গল্প ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমি শুধু বলতে চাই, একুশে ফেব্রুয়ারির কোনো তথ্যচিত্র নির্মাণ করিনি, কোনো ইতিহাসও তুলে ধরতে যাইনি। আমি শুধু ওই সময়ের একটা ঘটনা দিয়ে একুশের চেতনাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেছি। যেখানে প্রেম আছে। চেতনা আছে। একটা মিষ্টি গল্প আছে।’

ভাষায় আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণের আগ্রহের কথা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন নির্মাতা। তবে প্রায় পাঁচ দশক আগে একজন ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, তিনি জহির রায়হান। পরাধীন পাকিস্তানেই ১৯৬৫ সালে জাহির রায়হান নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন মহান একুশ নিয়ে চলচ্চিত্র। কিন্তু সেই সিনেমা নির্মাণের জন্য অনুমতি পাননি। তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো স্বাধীন দেশে একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতেন। জহির রায়হান একুশে ফেব্রুয়ারি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে না পারলেও ১৯৭০ সালে ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে একুশে ফেব্রুয়ারির দৃশ্য সংযোজন করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা/আমি তোমায় ভালোবাসি’ ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু সরকার এই গানটির প্রথম ১০ লাইনকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের স্বীকৃতি দেন। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান সরকার রেডিও-টিভিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করার মাত্র কয়েক বছর পর জহির রায়হান গানটি ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করেন। এটি ছিল সাহসের অনন্য উদাহারণ। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রে জহির রায়হান ব্যবহার করেছিলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি’। পরবর্তী সময় এই গানটি একুশের গান হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পায়। এ ছাড়া ছবিটিতে ব্যবহার করা কাজী নজরুল ইসলামের কালজয়ী গান ‘কারার ওই লৌহ কপাট’ এবং খান আতাউর রহমানের বিখ্যাত গান ‘এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে’ দারুণ আলোচিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের পটভূমি নিয়ে জহির রায়হান লিখেছিলেন উপন্যাস ‘আরেক ফাল্গুন’। জহির রায়হান ছাড়া ভাষা আন্দোলন পটভূমি নিয়ে সিনেমা নির্মাণের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি তেমন কাউকে। তবে শহিদুল ইসলাম খোকন স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তার ‘বাঙলা’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে কিছুটা চেষ্টা করেছিলেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকজন চলচ্চিত্র নির্মাতা ভাষা আন্দোলন নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা আর পরবর্তী সময়ে বাস্তবের মুখ দেখেনি। ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসার কথা বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে জানিয়েছেন চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা। নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়ে সিনেমা নির্মিত হওয়া উচিত।’ স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে ভাষা আন্দোলন নিয়ে সিনেমা নির্মাণের জন্য সরকারি প্রচেষ্টা শুরু হতে পারে বলে মনে করেন মোরশেদুল ইসলাম।

বিনোদন হাইলাইটস'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj