বাধা এসএমপি নীতিমালা : গ্রামীণফোনের শেয়ারদর কমেছে ২৫ শতাংশ

শনিবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : তাৎপর্যপূর্ণ বাজার ক্ষমতাসম্পন্ন অপারেটর বা এসএমপি পরিগণিত হওয়ায় গ্রামীণফোন লিমিটেডের প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। গত নভেম্বরে চূড়ান্ত হওয়া এসএমপি প্রবিধানমালার ধারাবাহিক প্রয়োগ দেশের টেলিকম খাতে কোম্পানিটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়া, নতুন পণ্য জনপ্রিয় করা কিংবা প্রতিযোগিতামূলক অফার দিয়ে আরো বেশি গ্রাহক টানায় বাধা হয়ে দাঁড়াবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। এই এসএমপি নীতিমালার আশঙ্কায় গত এক বছরে দেশের দুই স্টক এক্সচেঞ্জে গ্রামীণফোনের শেয়ারদর এক-চতুর্থাংশের বেশি কমে গেছে। অবশ্য এসএমপি হিসেবে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক বিটিআরসির কাছ থেকে প্রথম দফা বিধিনিষেধ পাওয়ার পর গত মঙ্গলবার দরপতন এড়াতে সক্ষম হয়েছে গ্রামীণফোন।

বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গ্রামীণফোনের শেয়ারদর ছিল ৫১০ টাকার ঘরে। ব্যবসা প্রবৃদ্ধি, মুনাফা, লভ্যাংশ সবই সন্তোষজনক ছিল। কর বিবাদ আর প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো মাথায় নিয়েই এগোচ্ছিলেন বিনিয়োগকারীরা। তবে প্রতিক‚ল টেলিকম রেগুলেশনের গুঞ্জন শুরু হয় তখনই। প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির শেয়ার থেকে মুনাফা তুলে নেয়া শুরু করেন। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এক বছরে গ্রামীণফোন শেয়ারের দর ২৫ শতাংশের বেশি কমে ৩৮০ টাকার নিচে নেমে এসেছে, যেখানে স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকগুলো এর তিন ভাগের এক ভাগ পয়েন্ট হারিয়েছে। ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির উপাত্ত ও এর গুণগত নানা দিক পর্যালোচনা করে দেশি-বিদেশি প্রায় সব প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পছন্দের তালিকায় শীর্ষ একটি কোম্পানি বহুজাতিক সেলফোন অপারেটর প্রামীণফোন লিমিটেড। বিনিয়োগকারীদের ক্রমবধর্মান আগ্রহে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দুই বছরে কোম্পানিটির শেয়ারদর ২২৫ থেকে ৫১০ টাকার ঘরে উন্নীত হয়। প্রতি বছরই কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডাররা ভালো নগদ লভ্যাংশ পেয়ে আসছেন।

তবে বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রথম ধাক্কা হিসেবে আসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে দেশের শীর্ষ টেলিকম অপারেটর কোম্পানিটির ক্রমবর্ধমান কর বিবাদ। কর কর্তৃপক্ষ ও অন্য নিয়ন্ত্রকদের সঙ্গে বিবাদ গ্রামীণফোনের জন্য নতুন কিছু ছিল না। তবে সা¤প্রতিক বছরগুলোয় সম্মিলিত অঙ্কটি ক্রমেই বড় হচ্ছে। ২০১৭ সালের শেষদিকে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) চিঠি দিয়ে এনবিআরের বৃহৎ করদাতা ইউনিট (এলটিইউ) কর্মকর্তারা জানান, ভ্যাট ও এর সুদ বাবদ গ্রামীণফোনের কাছে সরকারের ২ হাজার কোটি টাকার বেশি পাওনা রয়েছে। এনবিআরের এ দাবির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত ও আপিল বিভাগে মামলা চলমান রয়েছে। তবে কোম্পানিটি বিশাল এ বিবদমান অঙ্কের বিপরীতে কোনো সঞ্চিতি সংরক্ষণ করেনি। মামলাগুলোর রায় সরকারের পক্ষে গেলে কোম্পানির পক্ষে এ দায় শোধ করা কঠিন হবে, বিপদে পড়বেন শেয়ারহোল্ডাররা। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর সমাপ্ত হিসাব বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে কোম্পানিটির বহিঃনিরীক্ষকও এ বিষয়ে শেয়ারহোল্ডারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। প্রতিবেদনের নোট ৪২-এ দেখা যায়, সুদাসলে এনবিআরের দুই হাজার কোটি টাকা দাবির বাইরেও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক বিটিআরসির সঙ্গে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রদেয় অর্থ নিয়ে বিবাদে রয়েছে কোম্পানিটি।

২০১৮ সালের প্রথম প্রান্তিকে এসে এসবের সঙ্গে যুক্ত হয় শেয়ারবাজারের সার্বিক বিক্রয় চাপ। সে বিক্রয় চাপ আরো জোরালো করে সদ্য কার্যকর হওয়া এসএমপি নীতিমালার গুঞ্জন। ২০১৮ সালজুড়েই বিষয়টি নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা ছিল বিনিয়োগকারীদের মধ্যে। গত নভেম্বরে এসএমপি নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার সময় পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গ্রামীণফোনের শেয়ার দর সাড়ে ৩শ টাকায় নেমে আসে।

এ সংক্রান্ত প্রবিধানমালায় বলা হয়, গ্রাহক সংখ্যা, বার্ষিক রাজস্ব বা বিটিআরসি কর্তৃক বরাদ্দকৃত তরঙ্গসহ অন্যান্য সম্পদ যে কোনো একটি মানদণ্ডে ইন্ডাস্ট্রির ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করলেই দেশে নিবন্ধিত টেলিকম অপারেটররা এসএমপি গণ্য হবে। প্রতিযোগিতার পরিবেশ উৎসাহিত করতে বিটিআরসি সময়ে সময়ে তাদের করণীয়-বর্জনীয় সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করবে। মোট দাগে এর ১৮টি ক্ষেত্র বেছে নেয়া হয়।

ভারত-পাকিস্তানের মতো এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অনেক দেশেই নিয়ন্ত্রকরা এমন বিধিনিষেধ আরোপ করে ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিযোগিতার পরিবেশ জোরদার করে বলে জানা যায়। গত সোমবার, এসএমপি সম্পর্কিত প্রথম নির্দেশনাটি আসে। প্রতিযোগীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে থাকা গ্রামীণফোনের ক্ষেত্রে কোনো প্যাকেজ, অফার, কলরেট কিংবা নতুন পণ্য বা সেবার তথ্যাদি জানিয়ে বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। বিটিআরসি আরো বলে, অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্বতন্ত্র ও একক স্বত্বাধিকার চুক্তি করতে পারবে না কোম্পানিটি। কল ড্রপের হার প্রায় সাড়ে ৩ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। চতুর্থ পয়েন্টে বলা হয়, এমএনপি বা মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি সুবিধার আওতায় অন্য কোনো অপারেটরের গ্রাহক গ্রামীণফোনে এলে তারা ৩০ দিন পরেই গ্রামীণফোন ছাড়তে পারবেন। তবে গ্রামীণফোনের গ্রাহকরা ফিরতে চাইলে তাদের অবশ্যই বিধি মোতাবেক ৯০ দিন অপেক্ষা করতে হবে।

এসএমপি এরই মধ্যে গ্রামীণফোনের নতুন গ্রাহক ও মার্কেট শেয়ার অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং আগামীতে কোম্পানিটির প্রাইসিং, কস্টিং, সব বিষয়েই প্রতিক‚ল নির্দেশনা আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন শেয়ারহোল্ডাররা।

এ প্রসঙ্গে, স্থানীয় একটি ব্রোকারেজ হাউসের বিনিয়োগ বিশ্লেষক ও কৌশলপ্রণেতা বলেন, গ্রামীণফোনের সঙ্গে আরো কোম্পানি বাংলাদেশে টেলিকম ব্যবসার লাইসেন্স পেয়েছে। রেগুলেশনও সবার জন্যই সমান ছিল। তবে ব্যবসার সক্ষমতায় সবাই সমান ছিল না। প্রযুক্তি, ব্যবস্থাপনা, অর্থসংস্থান, বিপণন ইত্যাদি সার্বিক দক্ষতার জোরেই কোম্পানিটি এসএমপি হয়েছে। আরোপিত এসএমপি রেগুলেশন কোম্পানিটির প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে শেয়ারহোল্ডাররা আশা করবে, এর ম্যানেজমেন্ট সেগুলো সামলে নেবে এবং লভ্যাংশ প্রদানের সক্ষমতায় পেছাবে না।

অর্থ-শিল্প-বাণিজ্য'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj