বিশ্ব ভালোবাসা ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস : যশোরের গদখালীতে ৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আলমগীর কবীর, যশোর থেকে : আজ পহেলা ফাল্গুন। রাত পোহালেই বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। আর ক’দিন পর পালিত হবে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এ দিবসগুলোর বাজার ধরতে ব্যস্ত সময় পার করছেন যশোরের গদখালী এলাকার ফুলচাষিরা। যশোরের গদখালীর ফুল ব্যবসায়ীদের কাছে পুরো ফেব্রুয়ারি মাসটি ব্যবসার উৎসব হিসেবে বিবেচিত।

তবে ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি এই দুদিনে ফুল বিক্রি অন্যতম উচ্চতায় পৌঁছে বলে জানান ফুলচাষিরা। এ সময়কে কেন্দ্র করে এখানকার ফুল ব্যবসায়ীদেরও থাকে বিশেষ প্রস্তুতি। ইতোমধ্যে তাদের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ফুল সরবরাহ সম্পন্ন করেছেন তারা।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির তথ্য মতে, এবার যশোরে পাইকারি পর্যায়ে ৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। যশোরে প্রায় ৬ হাজার ফুলচাষি ১ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন প্রকার ফুল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গ্যালোরিয়াস শতকরা ৪০ ভাগ চাষ করেন এখানকার ফুলচাষিরা। তার পরই ২০ ভাগ চাষ হয় রজনীগন্ধা। গোলাপ হয় ১৫ ভাগ। তাদের উৎপাদিত জারবেরা, গাঁদা, জিপসি, রডস্টিক, কেলেনডোলা, চন্দ্রমল্লিকাসহ ১১ ধরনের ফুল সারাদেশের মানুষের মন রাঙাচ্ছে।

এ দিবসকে ঘিরে আগে থেকেই যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার গদখালী, পানিসারা, নাভারণ, নিরবাসখোলা এলাকার জমিতে সেচ প্রদান, গোলাপের কুঁড়িতে ক্যাপ পরানো, সার-কীটনাশক, আগাছা পরিষ্কার করাসহ ফুলের আনুষঙ্গিক পরিচর্যা করে থাকেন চাষিরা। তাদের লক্ষ্য এ মাসের প্রতিটা ফুলের বাজার ধরা।

পানিসারা মাঠপাড়া এলাকার ফুলচাষি তবিবর জানান, ফুল চাষে আসা বংশপরম্পরায়। আমার বাবা ফুল চাষ করতেন। এখন আমিও ফুল চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আমি ৪ বিঘা জমিতে ফুল চাষ করেছি। তার মধ্য রজনীগন্ধা ২ বিঘা ও ১ বিঘায় গোলাপ ও ১ বিঘায় জারবেরা। এই ফুলের বাজার ধরতে সকাল-বিকেল ফুলের পরিচর্যা করেছি। গদখালীতে কথা হয় তরুণ ফুলচাষি আশরাফুল ইসলাম চান্দুর সঙ্গে। তিনি বলেন, ৪ বিঘায় গোলাপ, ২ বিঘায় জারবেরা ও ১ বিঘায় গ্যালোরিয়াস ও রডস্টিক চাষ করেছি। আমরা গোলাপের কুঁড়িতে ক্যাপ পরিয়ে রাখি, যাতে ফুল একটু দেরি করে ফোটে। বসন্ত দিবস, ভালোবাসা দিবস আর ২১ ফেব্রুয়ারিতে যাতে ফুল বাজারে দেয়া যায়। প্রতিটি গোলাপে ক্যাপ পরানোসহ খরচ পড়ে প্রায় ৪ টাকার মতো। যদি ৭-৮ টাকা বিক্রি করা যায় তাহলে মুনাফা বেশি পাবেন বলে তার আশা। ফুল চাষের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি সফলভাবে ফুল চাষ করে যাচ্ছেন।

নাভারণের ফুল চাষি ও ব্যবসায়ী নজরুল আলম জানান, তিনি ফুল ব্যবসার সঙ্গে ফুল চাষও করছেন। তার চাষের মধ্য জারবেরা, গাঁদা, জিপসি, রজনীগন্ধাসহ বেশ কয়েকটি ফুল চাষ করছেন লাভজনকভাবে। কিন্তু তার জারবেরা ফুলে মাকড় পোকা বিস্তার করেছে। সেই সঙ্গে সাদা মাছি। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শমতো কীটনাশক দিয়ে এই পোকামাকড় বিস্তার নষ্ট করার চেষ্টা করেছি। গত দু-তিনমাস ব্যবসাটা কিছুটা খারাপ গেছে। এ দিবসগুলোতে ৩-৪ লাখ টাকার মতো ফুল বিক্রি করতে পারব। ইতোমধ্যে প্রায় দুই লাখ টাকার ফুল বিক্রি সম্পন্ন করেছি।

বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার সোসাইটির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলাসহ গোটা জেলায় বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ হচ্ছে।

১৯৮৩ সালে গদখালীতে মাত্র ৩০ শতক জমিতে ফুল চাষ শুরু হয়। এখন চাষ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে। দেশে ফুলের মোট চাহিদার ৭০ ভাগই যশোরের গদখালী থেকে সরবরাহ করা হয়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এই ফুল এখন যাচ্ছে দুবাই, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়াতেও।

বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা এই ফুল চাষকে কেন্দ্র করে। প্রায় ২০ হাজার কৃষক ফুলচাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কেবল যশোরেই প্রায় ৬ হাজার ফুলচাষি রয়েছেন। সামনের দিবসগুলোকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭০ কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সারা বছর টুকটাক ফুল বিক্রি হলেও মূলত ফেব্রুয়ারি মাসের তিনটি উৎসবকে সামনে রেখেই জোরেশোরে এখানকার চাষিরা ফুল চাষ করে থাকেন।

কিন্তু কিছু অসাধু ব্যক্তির প্লাস্টিক ফুল আমদানি বা তৈরির জন্য ব্যবসাটি কমে যায়। এ প্লাস্টিক বাজারজাতকরণ যদি সরকার বন্ধ করত তা হলে ফুল চাষ আরো বৃদ্ধি পেত এবং চাষিরা লাভবান হতেন। এ ছাড়া ঢাকায় স্থায়ী ফুলের বাজার স্থাপন করতে পারলে ফুলের চাষ ও ব্যবসার প্রসার ঘটবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj