বেঁচে থাকো, বাঁচিয়ে রাখো…

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

এক.

আমাদের ছোটবেলায় ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’- হৃদয়ে বসতি নেয়া এই গানটির সঙ্গে সঙ্গে আরও যে দু’একটি গান খুব অল্প সময়েই শিখেছিলাম, তার একটি ছিল ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কী ভুলিতে পারি’। এই গানগুলো শিখতে কেন যেন সময় লাগতো না। কেননা আমরা সারারাত ধরে মাইকে শুনতে শুনতে অনেকটাই মুখস্ত করে ফেলতাম এবং কীভাবে কীভাবে যেন মনে নিয়ে ছিলাম যে এগুলো সারা জীবনই মনে রাখতে হবে, কারণ এগুলো সারা জীবনের গান। মফস্বলে ফেব্রুয়ারি মাস আসলেই মনে হতো একুশে ফেব্রুয়ারি খুব কাছেই। তখনও ১৪ ফেব্রুয়ারির ভালোবাসা দিবসের ঝাঁঝ আসেনি আমাদের জীবনে। সত্যিকারের সাদা কালোতে শোক পালনের আব্রুতেই মোড়া ছিল আমাদের শৈশবের একুশ।

তখন ফেব্রুয়ারিতেও খানিকতা শীত পড়তো। কয়েকদিন আগ থেকে আমরা বিভিন্ন জনের বাসায় গিয়ে গিয়ে গানটির ঘরোয়া অনুশীলন করতাম। সেই অনুশীলনে যতো না সুর ঠিক আছে কিনা দেখা হতো তার চেয়ে বেশি জোর ছিল গানটি মুখস্ত করার। কারণ এই গান আমরা প্রভাত ফেরিতে গাইবো। তখন ছোটদের সংগঠন ছিল কচিকাঁচার মেলা এবং খেলাঘর। মনে পড়ে প্রভাত ফেরির রাতে কারো চোখে ঘুম নেই। কারণ একুশ তখনো বাণিজ্যিক হয়ে উঠেনি। মনের আঙিনাতেই অতি গভীর নড়াচড়া ছিল তার। ছোটরা হাতের কাছে যা পেত তা দিয়েই শহীদ মিনার বানাতো। মনে আছে একবার পাশের বাড়ির এক ছোট ভাইকে রাতে নিয়ে আসা হয়নি ঠাণ্ডা বলে, সকালেও যেতে পারেনি প্রভাত ফেরিতে। সব শেষে বাড়ি ফিরে গিয়ে দেখি সে ম্যাচের কাঠি দিয়ে নিজেই এক শহীদ মিনার বানিয়েছে পড়ার টেবিলে আর সেটির সামনে রেখে দিয়েছে একটি গাঁদা ফুল।

সে সময়গুলোতে ফুল বাজারে বিক্রি হতো না। মফস্বল শহরগুলোতে একুশে ফেব্রুয়ারির আগে সারা রাত ধরে আশপাশের বাড়ি থেকে ফুল চুরি করা হতো। কী আশ্চর্য অন্য সময় যারা ফুল চুরি নিয়ে বকা দিতেন তারাও কেন যেন সেই রাতের জন্য ভীষণ রকমের ভালো হয়ে যেতেন। এমন দিনে তো ফুল চুরি হবেই- এটি মেনে নিতেন। সারা বিকেলজুড়ে আমরা লাঠি, কঞ্চি, জোগাড় করতাম। ভাত টিপে টিপে বানাতাম আঠা। রাত এগারোটার পর শুরু হতো ফুলের ডালা বানানোর কাজ। মূলত আমাদের চেয়ে একটু বড়, কৈশোরে পা গেড়ে থাকারাই করতো কাজটা। আমরা পরম আনন্দ নিয়ে তাদের ফুট-ফরমাশ খাটতাম। তখন অন্য এক আবেগ ছিল, মনে হতো সবই করতে পারবো। কাগজের ওপর কালি দয়ে, ‘শহীদ দিবস অমর হোক’ লিখা হতো।

সকাল হলেই প্রভাত ফেরিতে যাওয়ার প্রস্তুতি। আগের দিনই সাদা জামা ধুয়ে রাখতেন মায়েরা। আমরা খালি পায়েই যেতাম, আমরা দেখে শিখে গিয়েছিলাম প্রভাত ফেরিতে খালি পায়েই যেতে হয়। আমাদের পায়ে কিছু বেঁধে যাবার চিন্তা ছিল না, প্রথম প্রহরে ঘর থেকে বের হবার ভয় ছিল না। সাদা জামার ওপর কালো ব্যাজ লাগানো হতো। সেই ব্যাজ লাগানোতেও শরীর ফুটো হবার কোনো শঙ্কা ছিল না। পুরো প্রভাত ফেরিতে আমরা সেই অমর গানটিই গাইতাম। সেই সময় সেই পথে কেউ ¯েøাগান দিতো না। এমনকি শহীদ মিনারেও কোনো রাজনৈতিক দলের ¯েøাগান হতো না। শুধুমাত্র মাইকে সংগঠনের নাম ঘোষণা করা হতো। আর সারা দিন রাস্তার মোড়ে মোড়ে বাজতো সালাম সালাম হাজার সালামসহ অনেক দেশাত্মবোধক গান।

দুই.

এখন ফেব্রুয়ারি এলেই সবাই নড়েচড়ে ওঠে। ফেব্রুয়ারির প্রথমদিন থেকেই ঢাকায় শুরু হয় একুশের মাসব্যাপী বইমেলা। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহার নিয়ে টিভিগুলো সব টকশো সাজায়। বাংলা ভাষা নিয়ে গর্বটা যেন এই মাসেই ভর করে। খালি পায়ের প্রভাত ফেরি সেই কবেই হারিয়ে গেছে! প্রভাত ফেরির জায়গায় স্থান পেয়েছে বাণিজ্যিক একুশ। এখন আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি গাইতে গাইতে একুশে প্রথম প্রহরে খুব কম লোকজনেই যায়। গানের পরিবর্তে এখন শোনা যায় দলীয় রাজনীতির ¯েøাগান। নেতানেত্রীর নামে ¯েøাগান। কে কার আগে ফুল দিবে সেটির প্রতিযোগিতা হয়, ছবি তোলা, মিডিয়ার সামনে যাওয়ার জন্য ছটফট করতে থাকে অনেকেই।

তিন.

একুশকে ঘিরে বুটিক শপগুলো এখন ব্যস্ত। কয়েকদিন আগে এক সহকর্মী সেই বুটিকের একটির একুশে ফেব্রুয়ারির পণ্যের মডেল হবার ছবি পোস্ট করলেন। একুশ এখন অনেকটাই পণ্য হয়ে গেছে। একুশকে পুঁজি করে হচ্ছে ব্যবসা। এখন একুশে ফেব্রুয়ারির আগে শপিংমলগুলোতে কেনাকাটার ধুম পড়ে। তারাও একুশকে কেন্দ্র করে তাদের বাণিজ্য ছক সাজায়। আগের চির পরিচিত কালো পাড়ের শাড়ির জায়গায় স্থান পেয়েছে নানা বর্ণমালার শাড়ি, নানা কারুকাজে, নানা বাহারি শাড়ি। ছেলেদের পোশাকেও এসেছে নানা ডিজাইন। এসেছে বাচ্চাদের জন্যও নানা ডিজাইনের একুশের পোশাক। একুশকে ঘিরে সবাই উৎসবের মতো কেনাকাটা করে। একুশের বিকেলে এখন টিএসসিজুড়ে মেলা বসে, আগে যেটা হতো পহেলা বৈশাখ কিংবা বিজয় দিবসে।

এখন আর কারো ফুলের তোড়া নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। সঠিক সময়ে হাতে এসে যায় সব। একুশ যেন আজ আর কোনো শহীদ দিবস নয়, শোকের দিনও নয়। ইংরেজিতে কয়েক বছর ধরেই অনেকেই একুশে ফেব্রুয়ারিকে অবজারভেশনের জায়গায় সেলিব্রেশন লেখা শুরু করেছে। অনেকেই যুক্ত দেখান যে একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর শুধু শোকের দিন নয় এখন এটি আনন্দের দিনও কারণ এই দিনটি বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পালনের দিন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

চার.

মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের লড়াইয়ে বাঙালিরা অগ্রগামী সৈনিক। অথচ আমাদের দেশের বাংলা বাদে আরও যেসব আদিবাসী ভাষা আছে বাঙালিরা তাদের সেই মর্যাদা দেয় না। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের চাওয়া তারা বাংলায় সব করুক। বাঙালিদের সামনে আদিবাসী মানুষেরা তাদের নিজের ভাষায় কথা বললে বেশির ভাগ বাঙালিই হয়তো বিরক্ত হন। তারা বাংলা ভাষায় গান গাইলে বাঙালিরা খুশি হয়, বলে ‘কী সুন্দর গাইলো!’ অথচ খুব কম বাঙালি শিল্পীই আছেন যারা বাংলাদেশি আদিবাসী ভাষায় গান করেন কিংবা গাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। অথচ বাঙালি অনেক শিল্পীই উর্দু, হিন্দি, ইংরেজি ভাষায় গান গেয়ে প্রতিদিন কতই না বাহবা কুড়ান। কিন্তু কেউই মনে করে না যে আমাদের দেশের এই ভাষাগুলোর গান গাওয়া যেতে পারে। সবাই মনে প্রাণে চায় এ দেশের আদিবাসীরা বাংলা ভাষায় কথা বলবে, গান গাইবে কিন্তু বাঙালিরা তাদের ভাষায় বলবে না, তাদের ভাষায় গাইবে না। তাদের সংস্কৃতি তারাই রক্ষা করবে। বহু বছর আগে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস লিখেছিলেন ‘চাকমা উপন্যাস চাই’। আজও আদিবাসীদের নিজস্ব ভাষায় দুই/একটি উপন্যাস বের হলেও সেটি হয়তো তাদের এলাকা কেন্দ্রিক রয়েছে। তবে আদিবাসীরা তাদের ভাষা রক্ষা করতে চেষ্টা করছে তাদের মতো করেই। চাকমা ভাষায় বহুদিন থেকে বের হচ্ছে চাকমা লিটল ম্যাগাজিন ‘আলাম’, নেত্রকোনার বিরিশিরি কালচারাল ইনস্টিটিউট থেকে বের হয় ‘জানিরা’, মনিপুরী ভাষায় বের হয় ‘পৈরী’। তবে বাংলাভাষার পাশাপাশি এখনও অস্বীকৃতই আছে আমাদের দেশের আদিবাসী ভাষাগুলো। সরকারিভাবে এই পর্যন্ত করা হয়েছে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাক প্রাথমিকের বই। আরও পাঁচটি আছে প্রক্রিয়াধীন। মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থেকে কিছু কাজ হচ্ছে আদিবাসী ভাষা নিয়ে। তবে কোনোটিই এখনও ঠিকমতো লিখিতরূপে চর্চার স্বীকৃতি পায়নি। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, ইউনেস্কো বলছে পৃথিবী থেকে অচিরেই বিদায় নিবে ৩০০০ মতো ভাষা, যার মধ্যে আছে আমাদের আদিবাসী বেশিরভাগ ভাষা।

পাঁচ.

বছর কয়েক আগে বাংলাদেশের একজন খ্যাতিমান কবি এবং একজন সাহিত্যিক একটি মোবাইল কোম্পানির বিজ্ঞাপনে বলেছিলেন মানুষ বেঁচে থাকে ভাষায়। আর ভাষা বেঁচে থাকে লেখনীতে। অর্থাৎ সেই ভাষায় রচিত সাহিত্যকর্মের মধ্য দিয়ে। আমাদের দেশের বাংলা ভাষার পাশাপাশি অন্য ভাষাগুলোকে বাঁচানোর দায়িত্বও তবে আমাদেরই। সব মানুষ যেন তাদের নিজেদের মাতৃভাষায় বেঁচে থাকতে পারে, সেই পরিসরও যে আমাদেরই তৈরি করতে হবে।

জোবাইদা নাসরীন : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj