বাসন্তী সাজে বর্ণিল মেলা

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

শরীফা বুলবুল : মাঘের শেষদিন বিকেলে মেলার ঝাঁপি খোলার সঙ্গে সঙ্গেই ঢল নামে প্রাণের মেলায়। হিম হিম হালকা হাওয়ায় গতকালও বসন্তের আমেজে তরুণীরা বাসন্তী রংয়ের শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে হাতে-খোঁপায় হলুদ গাদা ফুলসহ বাহারি ফুলে নিজেদের সাজিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গণে। সেই সঙ্গে হাতে বাজে রিনিঝিনি শব্দে কাঁচের চুড়ি। অনেকে আবার পরিবারসহ মেলায় এসেছেন বসন্তের সাজে। পুরুষরাও বসন্তের সাজ পোশাকে সেজেছেন কেউ কেউ। আর মাঘের শেষে ফাগুনের আগমনে মেলা নতুন করে জমে উঠবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রকাশকরা। আর সেই আশাতেই অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন তারা।

গতকাল মেলার ১২তম দিনের চিত্রটা ছিল এমনই। এদিন যারা মেলায় এসেছেন তাদের প্রত্যেকের হাতেই ছিল ব্যাগভর্তি বই। গতকাল বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার পরও ঢল নেমেছিল মেলা প্রাঙ্গণ ছাড়াও দোয়েল চত্বর, শাহবাগ-টিএসসি সড়কেও তরুণ-তরুণীদের জমিয়ে আড্ডা দিতে দেখা গেছে। তাদের অনেকের হাতে আর খোঁপায় ছিল হলুদ গাঁদা ফুল। আর প্রায় সবাই লাল, হলুদ, সবুজ, বেগুনি, কমলা বা সাদা রংয়ে নিজেদের সাজিয়েছেন বাসন্তী সাজে। বইমেলা প্রাঙ্গণে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সমৃদ্ধি সংহিতার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমরা প্রতিদিনই মেলায় মিলিত হচ্ছি। বন্ধু-বান্ধবরা মিলে খুব মজা করছি। পছন্দের বই কিনছি। যদিও বসন্ত এখনো আসেনি, হাওয়া তো বইছে। তাই বাসন্তী সাজেই এলাম, বন্ধুরাও এসেছে। বসন্ত আর বইমেলা দুটোই আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ হয়ে গেছে।

গতকাল মেলায় চ্যানেল আইয়ের লাইভে এসেছিলেন বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীন। এ ছাড়া তা¤্রলিপি প্রকাশনীর সামনে বসে কথাসাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবালকে অটোগ্রাফ শিকারিদের অটোগ্রাফ দিতে দেখা গেছে। সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ড. ইয়াসমীন হকও।

মূলমঞ্চের আয়োজন : বিকেলে গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় কবি-অনুবাদক মনিরউদ্দীন ইউসুফ : জন্মশতবর্ষ শ্রদ্ধাঞ্জলি শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন হাসান হাফিজ। আলোচনায় অংশ নেন শফিউল আলম, রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং মোহাম্মদ আবদুল হাই। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ। প্রাবন্ধিক বলেন, মনস্বী, বহুমাত্রিক একজন লেখক ছিলেন মনিরউদ্দীন ইউসুফ। সাধারণ কোনো লেখক নন, সাধকই বলতে পারি তাকে। আমৃত্যু ব্রতী ছিলেন জ্ঞান ও সাহিত্য সাধনায়। সুদীর্ঘ সাহিত্যজীবনে তিনি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় সৃজনকর্মে গভীর অভিনিবেশ, নিষ্ঠা ও মৌলিকত্বের পরিচয় রেখে গেছেন। যে মেধা, ঐকান্তিক অধ্যবসায়ে তার সাহিত্যকৃতি উজ্জ্বল এবং বিচিত্রগামী হয়েছে, আমরা পেয়েছি সোনালি ফসল। প্রকৃতার্থেই তিনি ছিলেন সব্যসাচী একজন লেখক। অঙ্গীকার, প্রত্যয়, একাগ্রতা, শ্রম দিয়ে তিনি আমাদের সাহিত্য অঙ্গনকে ঋদ্ধ করে গেছেন। বিশ্ববিশ্রæত একাধিক লেখকের শাশ্বত কালজয়ী রচনার সঙ্গে তিনি আমাদের প্রত্যক্ষ পরিচয় ঘটিয়ে দিয়েছেন। তার মেধাবী অনুবাদে আমরা সেগুলোর মূল্যবান আস্বাদ লাভে সমর্থ হয়েছি। বর্তমানকালে আমাদের দেশে তার মতো এরকম নিবেদিতপ্রাণ, অনুকরণীয় সাহিত্য ব্যক্তিত্বের বড্ড অভাব।

আলোচকরা বলেন, শাহনামা অনুবাদ মনিরউদ্দীন ইউসুফের অসামান্য কীর্তি। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বসাহিত্যের ধ্রæপদী সৃজনকর্মের সঙ্গে তিনি বাঙালি মননের যোগাযোগ স্থাপন করেছেন। শুধু এই অনুবাদ নয়, তার কবিতা, প্রবন্ধ এবং অন্যান্য রচনায় একজন সংবেদী মানুষের পরিচয় মুদ্রিত রয়েছে, যাকে অনায়াসে শুভ ও কল্যাণ-চেতনার প্রতীক বলে আখ্যায়িত করা যায়।

সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ বলেন, মনিরউদ্দীন ইউসুফ একজন বিস্মৃত মনীষা। বাংলা একাডেমি তার অনুবাদে ছয় খণ্ডে শাহনামা প্রকাশ করছে যা দেশে ও বিদেশে বিপুলভাবে আদৃত হয়েছে। জন্মশতবর্ষে তাকে নিয়ে এ স্মরণ-আয়োজন মূলত তার অসামান্য কীর্তির প্রতি আমাদের শ্রদ্ধার নিদর্শন। লেখক বলছি অনুষ্ঠানে নিজেদের নতুন প্রকাশিত গ্রন্থ বিষয়ে আলোচনায় অংশ নেন আখতারুজ্জামান আজাদ, মোহিত কামাল, বেগম আকতার কামাল, হামিম কামাল এবং নাসরিন সিমি।

কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ করেন কবি জাহিদুল হক এবং জাহিদ হায়দার। আবৃত্তি পরিবেশন করেন নাজমুল আহসান এবং জিনিয়া ফেরদৌস। সঙ্গীত পরিবেশন করেন শিল্পী কল্যাণী ঘোষ, বিশ্বজিৎ রায়, ফারহানা ফেরদৌসী তানিয়া, সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা, রাজিয়া সুলতানা, নাজমুল আহসান তুহিন, উম্মে রুমা ট্রফি এবং সঞ্জয় কুমার দাস।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj