ড. আলাউদ্দিন আল আজাদ

সোমবার, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ভাষাসংগ্রামী, মুক্তিযোদ্ধা আলাউদ্দিন আল আজাদ বাংলাদেশের শিক্ষা, শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ১৯৩২ সালের ৬ মে নরসিংদী জেলার রায়পুরা থানার রামনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম গাজী আবদুস সোবহান এবং মাতার নাম আমেনা খাতুন। তিনি ১৯৪৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক, পরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বিএ অনার্স এবং ১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে এমএ পাস করেন। ১৯৭০ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি এবং ১৯৮৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আরেগন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তুলনামূলক সাহিত্যে সম্মানসূচক প্রশংসাপত্র লাভ করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদ ছাত্রাবস্থায়ই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন। তিনি ১৯৪৭-৪৯ সালে ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সাহিত্য সম্পাদক ও কলেজ বার্ষিকীর সম্পাদক মনোনীত হন। ১৯৫৩-৫৪ সালে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ইউনিয়নের সেক্রেটারি জেনারেল এবং হল বার্ষিকীর সম্পাদক ছিলেন। ১৯৫৭-৬০ সালে ঢাকা জেলা যুবলীগের সভাপতি ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সহসভাপতি নির্বাচিত হন।

১৯৫৫ সালে নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৬-৬৭ সাল পর্যন্ত সিলেট এমসি কলেজ ও চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। পরবর্তীকালে শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক, ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি উপদেষ্টা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৯-৯২ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নজরুল গবেষণা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আলাউদ্দিন আল আজাদ রচিত প্রথম নাটক ‘ধন্যবাদ’ (১৯৫১) এবং প্রথম উপন্যাস ‘তেইশ নম্বর তৈলচিত্র’ (১৯৬০)। সতেরো বছর বয়সে প্রকাশিত হয় প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘জেগে আছি’ (জানুয়ারি, ১৯৫০)। সব্যসাচী লেখক আলাউদ্দিন আল আজাদের কবিতা, নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষণা, চলচ্চিত্র, ভ্রমণকাহিনী, জীবনী, শিশু সাহিত্য ও বিদেশি রচনাবলি মিলিয়ে মোট গ্রন্থ সংখ্যা ১২০টি। তাঁর রচনাবলি বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতি-স্বীকৃতি অর্জন করেছে। তিনি ছিলেন দর্শকনন্দিত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব, দক্ষ সংগঠক এবং বাংলাদেশের ছাত্র, যুব ও শান্তি আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী ও নেতা।

তাঁর প্রগতিশীল ভূমিকার কারণে পাকিস্তান আমলে দুবার কারাবরণ করেন। সাহিত্যকর্মে গৌরবময় অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ইউনেস্কো পুরস্কারসহ বহু সম্মাননা ও পদকে ভূষিত হয়েছেন। ভাষা শহীদদের স্মৃতি স্মারক, বাঙালি জাতির অস্তিত্বের প্রতীক মহান শহীদ মিনার নিয়ে তিনিই সর্বপ্রথম রচনা করেন ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় কবিতা ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রহত্যা ও রক্তাক্ত ঘটনার পর তারই উদ্যোগে প্রকাশিত হয় একুশের প্রথম বুলেটিন। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের দিনলিপি নিয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের আলোকে রচনা করেন ‘ফেরারি ডায়েরি’। একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার পর কয়েকজন সাংস্কৃতিক কর্মী রাতের মধ্যেই একটি বুলেটিন প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও পলাশি ব্যারাক এলাকায় বিলি করেন। সন্ধ্যায় আলাউদ্দিন আল আজাদ, মুস্তফা নূরউল ইসলাম, ফজলে লোহানী, হাসান হাফিজুর রহমান, পাটুয়াটুলির সওগাত অফিসের বিপরীত গলিতে অবস্থিত পাইওনিয়ার প্রেসে যান। দুটি টেবিলে বসে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে তাঁরা ছাত্র হত্যার সংবাদের হেডলাইনের সংক্ষেপিত প্রবন্ধ, নিবন্ধ লিখে ফেলেন। তাৎক্ষণিক একটি বুলেটিন তৈরি হয়ে যায়। বড় এক শিট কাগজে যত শিগগিরই সম্ভব রাতের মধ্যে ছেপে ফেলার ব্যবস্থা করে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ফিরে আসেন। এ বুলেটিনের ভাষ্যে একটি মন্তব্য জুড়ে দেয়া হয় ‘বিপ্লবের কোদাল দিয়ে আমরা অত্যাচারী, শাসকগোষ্ঠীর কবর রচনা করব।’ ওই মন্তব্যটি লিখেছিলেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। তাঁর মতে, এটাই ছিল একুশের প্রথম বুলেটিন। ২০০৯ সালের ৩ জুলাই আলাউদ্দিন আল আজাদ ইন্তেকাল করেন।

এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

লেখকদ্বয় ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস গবেষক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj