স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় উপজেলা নির্বাচন

শুক্রবার, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গন্ধ শেষ হতে না হতেই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের ঘোষণা দেন নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে তফসিল, মার্চের মধ্যেই প্রথম ধাপের নির্বাচন হওয়ার কথা। সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে মার্চেই উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সুশাসন ও শুদ্ধাচার গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত, যার অন্যতম ভিত্তি হচ্ছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। এ ধরনের নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব সাংবিধানিকভাবে নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত থাকলেও অন্যান্য অংশীজনের ভূমিকাও এ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ। এসব অংশীজনের মধ্যে রয়েছে প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী বাহিনীসহ সরকারের বিভিন্ন অঙ্গ, ক্ষমতাসীন দল, জোট, বিরোধী রাজনৈতিক দল, জোট, প্রার্থী, নাগরিক সমাজ, সংবাদ-মাধ্যম ও নির্বাচন পর্যবেক্ষক।

স্থানীয় সরকার নিয়ে বহুবার বলা হয়েছে। কিন্তু এটি নিয়ে বারবার বললেও পুরনো হয় না। যেহেতু কার্যকর স্থানীয় সরকার ছাড়া একটি দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা পায় না। একটি পরিবার ধ্বংস করতে চাইলে পরিবারটির একতাকে নষ্ট করতে হয়। একটি সমাজকে ধ্বংস করার আগে তার মূল্যবোধ ধ্বংস করতে হয়। একইভাবে একটি দেশকে ধ্বংস করার আগে তার দীর্ঘদিনের সংস্কৃতিকে আঘাত করতে হয়। একটি রাষ্ট্রের সংস্কৃতিকে আঘাত করা মানেই সেই দেশটির ইতিহাস-ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে দেয়া। বাঙালির প্রাচীন সংস্কৃতিতে রয়েছে দীর্ঘকালের সামাজিক রীতিনীতি, স্থানীয়তা, আত্মীয়তা ও আঞ্চলিকতার বন্ধন। অর্থাৎ স্থানীয়রা দীর্ঘকাল ধরে এক ধরনের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে বসবাস করে আসছে। আর যদি সেই স্থানীয়তে তথা ‘স্থানীয় সরকার’ দলীয়করণ করা হয় তাহলে মুহূর্তেই সেই গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যাবে। যদিও আমরা মনে করি, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ হলো স্থানীয় সরকার। স্থানীয় সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক লোকাল গভর্নেন্সের (সিডিএলজি) মতে, উপজেলা পরিষদ হচ্ছে মধ্যবর্তী প্রশাসনিক ইউনিট। বাংলাদেশের স্থানীয় ইউনিটগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করা যায় : ১. গ্রামীণ স্থানীয় ইউনিট যেমন- ইউনিয়ন এবং উপজেলা , কারণ এসব ইউনিট আইন মোতাবেক গ্রামীণ এলাকা নিয়ে গঠিত; ২. নগরীয় স্থানীয় ইউনিট, যেমন- পৌরসভা ও নগর করপোরেশন, কারণ এসব ইউনিট আইন মোতাবেক শুধু নগরীয় এলাকা নিয়ে গঠিত; এবং ৩. গ্রামীণ-নগরীয় স্থানীয় ইউনিট, যেমন- ৭টি বিভাগ, ৬৪টি জেলা। কিন্তু বাংলাদেশে স্থানীয় ইউনিটের প্রকারভেদকরণ যথার্থভাবে করা যায়নি বলে স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ যথার্থভাবে করা সম্ভব হয়নি এবং তার ফলে ক্ষমতা ও দায়িত্ব যথার্থভাবে নির্ধারিত ও বণ্টিত হয়নি, হচ্ছে না। তাই স্থানীয় ইউনিট ও স্থানীয় সরকারের প্রকারভেদকরণ যথার্থভাবে করতে হবে এবং সেসব ইউনিটে গঠিত স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা ও দায়িত্ব সেভাবে প্রদান করতে হবে।

কাগজে-কলমে স্থানীয় সরকার নিরপেক্ষ থাকলেও বিগত কয়েক বছর নির্বাচনগুলো দলীয় মনোনয়ন নিয়েই রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাই নির্বাচনে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছেন। বিষয়টি প্রকাশ্য স্ববিরোধিতা এবং স্থানীয় সরকার আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হলেও সরকারের ভূমিকা ছিল নীরব। স্থানীয় সরকার স্বাধীন ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে করার বিরোধিতা করে স্থানীয় বিষয়ের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর ডেমোক্রেটিক লোকাল গভর্নেন্সসহ (সিডিএলজি) সুধীসমাজের বরাবরই আপত্তি ছিল। এর সপক্ষে অন্য বিষয়ের মধ্যে যুক্তি ছিল, স্থানীয় সরকারের জন্মলগ্ন থেকেই নির্বাচন নির্দলীয় ছিল। কালের বিবর্তনে এ ঐতিহ্য হারিয়ে যায়। সিটি করপোরেশনসহ কিছুসংখ্যক পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচন অলিখিতভাবে দলীয় ভিত্তিতে শুরু হয়। আইনে বিষয়টি স্বীকৃত না হলেও বাস্তবে বিষয়টি দৃশ্যমান ছিল। ২০১৪ সালে আ.লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সংশোধিত আইন অনুযায়ী দলীয় প্রতীকেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন যেভাবে চলছে এভাবেই থাকা সমীচীন। তা না হলে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়বে। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, দলীয় ব্যানারে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বাড়বে। ফলে স্থানীয় সরকার স্বাধীনের নামে চলবে হরিলুট ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি বা স্তম্ভ স্থানীয় সরকার হলেও বাস্তবে কতটুকু বাস্তবায়ন হচ্ছে এটি আমরা সবাই জানি। আর যখন দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হয় তখন রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় অনেক কর্মকাণ্ড করে পাড় পেয়ে যায় অপরাধীরা। আর দলীয় ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে এবং তা বাস্তবে রূপ নিলে এটি একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা ছাড়া আর কিছুই হবে না। যা বর্তমানে দেখা যাচ্ছে তার বাস্তবতা।

আমরা দীর্ঘকাল ধরে দেখে আসছি, গ্রামের সম্পৃতি, সেখানে থাকে না তেমন কোনো ভেদাভেদ, থাকে না কোনো দ্ব›দ্ব, থাকে না হিংসা। আর যদি তারা দলীয়ভাবে একে অপরকে মূল্যায়ন করা শুরু করে তাহলে সমগ্র দেশটি দলবাজিতে ডুবে যাবে। আমরা জানি, জাতীয়তে তথাকথিত গণতন্ত্রের নামে এক ধরনের অসুস্থ রাজনীতির চর্চা রয়েছে। সে রাজনীতি স্থানীয়তে চালু হোক এটা আশা করা উচিত নয়। এ অবস্থার পরিবর্তনের জন্য স্থানীয় ও জাতীয়তে একই সঙ্গে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন শুরু করা খুবই প্রয়োজন। প্রথমে স্থানীয়দের সরকার আলাদা করে সব কাজ স্থানীয়দের হাতে ছেড়ে দিতে হবে (যেমন- ইউনিয়ন সরকার, উপজেলা সরকার, জেলা সরকার, নগর সরকার)। আর যদি সরাসরি দলীয়করণ করা হয় তাহলে স্থানীয় সরকার যেমন স্বশাসিত থাকবে না, তেমনি সহিংসতাও বৃদ্ধি পাবে। সবশেষ আইন অনুযায়ী উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় ইউনিটিগুলোতে দলীয় মনোনয়ন এবং প্রতীকে নির্বাচন করার ফলে স্থানীয়তে বিরোধ চলমান রয়েছে। ভবিষ্যতে এর ধারাবাহিকতা থাকলে, মারামারি, হানাহানি, সহিংসতা থাকবেই এবং সেখানে নতুন নেতৃত্ব যেমন তৈরির ক্ষেত্রে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি জনগণ তাদের পছন্দের প্রার্থীকেও মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত করতে পারছে না। যারা আমেরিকা, কানাডা ও ইউরোপের উদাহরণ দেন তারা ভুলে যান যে, সেসব দেশে বহু আগেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা রয়েছে। সে জন্য প্রথমে একটি গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা দ্বারা ‘নাগরিক শ্রেণি’ গড়ে তুলতে হবে।

একটা সময় ছিল যখন নির্বাচনের হাওয়া বইতে শুরু করত তখন মানুষের মনে আনন্দের দোলা দিত। এখন আর তেমন দেখা যায় না। কারণ সমাজ বা রাষ্ট্রে টাকা আর পেশিশক্তির মহড়া সর্বত্র চলেছে। আর যেটুকু ছিল তা স্থানীয় সরকার দলীয়ভাবে করার ঘোষণার পর ভেস্তে গেছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে জাতীয় দৈনিকগুলোতে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। তবে বেশির ভাগ বিশ্লেষণকারী বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয়ভাবে হওয়ার জন্য যে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ দরকার তা বর্তমানে অনুপস্থিত। কারণ আমাদের দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো গণতন্ত্রের ঠিকানা খুঁজে পায়নি। এই নির্বাচন নিয়ে একশ্রেণির রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন বিশ্বের অনেক দেশে তো স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হয়, তাহলে আমাদের দেশে হতে বাধা কোথায়? যারা বিদেশিদের উদাহরণ বারবার টেনে এনেছেন, তারা কেন ভুলে যান ওই সব দেশের রাজনৈতিক সহনশীলতার সংস্কৃতি আর আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিত্র পুরোপুরি উল্টো। এখানে শাসক দল নিজের স্বার্থে পছন্দমতো পদ্ধতি প্রয়োগ করতে ভুল করে না।

দলীয় পরিচয়ে নির্বাচন হলে সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই বেশি হবে। যা ইতোধ্যেই বেশ কয়েকটি নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে গেছে। দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলে তৃণমূলে কোন্দল সংঘাত খুনাখুনি বাড়বে, রাজনৈতিকভাবে ‘স্থানীয় সরকার’ নির্বাচন হলে তৃণমূলে একটি বিশেষ দলের লোকজনের হাতে ক্ষমতা ও অর্থ থাকবে, দলের নেতাকর্মীরা নির্বাচনের অংশ নেয়ার আগে মনোনয়নের দৌড়ে হানাহানিতে লিপ্ত হবে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে পারে, কারণ দুর্নীতি, দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি, এক পেশি মনোভাব ইত্যাদি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় সরকারকে গ্রাস করার আশঙ্কা থাকে, বাংলাদেশে আইনের শাসন না থাকায় নির্বাচনে আইন লঙ্ঘন হতে দেখা যায়, নতুন নেতৃত্ব কিংবা সঠিক নেতৃত্ব সৃষ্টিতে বাধা, স্থানীয় পর্যায় জনপ্রিয়তা না থাকলেও প্রভাবশালী, অঢেল টাকার মালিকদের দলীয়ভাবে মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচিত হওয়া, প্রকৃত রাজনীতিকরা বঞ্চিত হয়ে পড়ে, দলীয় প্রতীকে হলে ক্ষমতাসীন ব্যতীত অন্য দল নির্বাচনে না আসা, এক দল অন্য দলের নেতাকর্মীদের প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ হওয়া ইত্যাদি।

স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হলে প্রভাবশালী, বিত্তশালী ও রাজনৈতিক দাপট থাকা খারাপ লোক নির্বাচিত হয়ে আসার সুযোগ প্রশস্ত হবে। তাই গণতন্ত্রের জন্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আধুনিক মানুষের মধ্যে আকুতির শেষ নেই। দীর্ঘদিন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য এ দেশে সংগ্রাম চললেও বাস্তবে তার প্রয়োগ খুবই দুর্বল। তাই আধুনিক সমাজ বা রাষ্ট্রকে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক পন্থায় গড়ে তুলতে হবে। গণতান্ত্রিক সমঅধিকারের ভিত্তিতে নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় দেশ গড়তে হলে স্থানীয় সরকারকে স্বশাসিত এবং স্বাধীন করতে হবে। মনে রাখা দরকার, গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকারের মাধ্যমেও জাতীয়তে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। সে জন্য উপজেলা নির্বাচন নির্দলীয় করা হলে বিরোধী দলসহ যোগ্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। স্থানীয়ভাবে সমঅধিকার, সহমর্তিতা এবং আন্তরিকতা অব্যাহত থাকবে।

শফিকুল ইসলাম খোকন : সাংবাদিক ও লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj