রাইসোনা : কমলেশ রায়

বুধবার, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

রাই। রিদিমার ছোটবোন। আদরের ছোটবোন।

রিদিমা তাকে ডাকে রাইসোনা। বেশি আদরের সময় বলে, ওরে আমার বুনুটা। ওরে আমার রাইসোনাটা।

রাই হলো রিদিমার কাজিন। তার বাবাই আর ‘তা’-এর মেয়ে।

রিদিমাকে রাই ডাকে দিদিভাই। দিদিভাইকে তার খুব পছন্দ। দিদিভাইয়ের সব কিছু তার ভালো লাগে।

দিদিভাই যা করে সেও তাই করে।

রিদিমা ডাকে বাবা। সেও আমাকে ডাকে বাবা। রাই বলে, আমার দুই বাবা। দিদিভাইয়ের বাবা আর আমার বাসায় আরেকটা বাবা।

কচিমুখের এমন মজার কথা শুনে সবাই হাসে। রাইও হাসে। খিলখিল করে। হাসলে রাইকে আরো সুন্দর দেখায়।

আর রিদিমা বলে, তার দুই মা। নিজের মা আর তা।

সে আরেকটু মজা করে বলে, মা আর তা। দুইয়ে মিলে মাতা।

রিদিমার ‘তা’ হলো তার মায়ের ছোটবোন। নাম বিদিতা। মুখে যখন আধোবুলি, তখন থেকে রিদিমা তাকে ডাকে ‘তা’।

রাই বেড়াতে এলে রিদিমার আনন্দ আর দেখে কে। দুই বোন মিলে খেলে। পুতুল খেলে। রান্না করে। ছোট ছোট হাঁড়িপাতিলে। খেলার রান্না। রান্নার খেলা। কত কী যে রাঁধে। মাছ ভাজা, চিকেন ফ্রাই, পোলাও, চিংড়ির মালাইকারি, পায়েস। এ ছাড়াও চকোলেট বানায়, আইসক্রিম বানায়। ঘর সাজায়। গল্প করে। কপট ঝগড়া করে। কখনো কখনো একটু মান-অভিমানও হয়।

রাই খুব দুষ্টু। সে মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে দিদিভাইকে রাগিয়ে দেয়। রিদিমা সুন্দর করে খেলার ঘর সাজাল। রাই সুযোগ বুঝে কিছু জিনিস এলোমেলো করে দেয়। রিদিমা রেগে যায়। রাই হাসে। দুষ্টুমিমাখা হাসি।

রিদিমা আরো রেগে যায়। রাই এবার বেঁকে বসে। রাগের ভান করে। বলে, দিদিভাই আমি আর খেলব না।

কেন খেলবি না?

তুমি আমাকে বকলে কেন। যাও, আমি আর খেলব না। রাই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে।

রিদিমা মুশকিলে পড়ে যায়। বোনের রাগ কমাতে চেষ্টা করে। বলে, ঠিক আছে, আমার ভুল হয়েছে বুনু। তারপর রাইকে জড়িয়ে ধরে। আদর করে দেয়।

তুই তো আমার সোনা বুনু। আমার রাইসোনা। রিদিমা বোনের নাক টিপে দেয়।

রাই মিটিমিটি হাসে। মুখে বলে, দিদিভাই ছাড়ো। আমার লাগছে তো।

ওরে দুষ্টু, তোর লাগছে না। দুষ্টু কোথাকার। এবার রিদিমা হাসে।

রাইও হাসে। দুই বোন মিলে হাসে। আবার খেলতে শুরু করে।

অ্যালবামে রাই একটা ছবি দেখেছে। আমার কাঁধে রিদিমা। এরপর থেকে রাই বাসায় এলেই আমার কাঁধে উঠবে। কাঁধে চড়া তার চাইই চাই। নিতে না চাইলে বলবে, ‘বাবা, দিদিভাইকে তো তুমি কাঁধে নিয়েছো। তাহলে আমাকে নেবে না কেন?’

রাই মজার সব কাণ্ড করে। আমাকে তার এ গল্পটা বলেছে রিদিমা।

আইসক্রিম খাচ্ছিল রাই। পাশে তার প্রিয় বিড়াল। নাম পিষু। আদরের নাম। রাই রেখেছে। পিষু বারবার তাকিয়ে দেখছিল। কী খাচ্ছে এত মজা করে?

রাই ভাবল তার পিষুরও আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে। এদিকে সে তো তার আইসক্রিমের ভাগ সহজে কাউকে দিতে চায় না। আবার আদরের পিষু বলে কথা। তাই সে বলল, পিষু তোমার তো আইসক্রিম খাওয়া চলবে না। আমার তো দাদু আছে। ডাক্তার। ঠাণ্ডা লাগলে ওষুধ দেবে। তোমার কী দাদু আছে? তোমাকে ওষুধ দেবে কে? তুমি আমার আইসক্রিমের দিকে তাকাবেই না। যাও এখান থেকে।

পিষু তার কথা শুনল না। বরং পায়ের কাছে এসে লেজ নাড়াতে লাগল। রাই খেপে গিয়ে বলল, পিষু তুমি যতই লেজ নাড়াও, আইসক্রিম তোমাকে আমি দেব না।

রাইয়ের কথা শুনে আশেপাশে যারা ছিল তারা হেসে ফেলল।

হঠাৎ ছেদ। দুই বোন দুইখানে। দুই দেশে। রাই তার মা-বাবার সঙ্গে কানাডা চলে গেছে।

দুইবোন এখন ভিডিও কলে কথা বলে। প্রতিদিন কথা বলে। অনেক কথা। সারাদিন যত কথা জমে থাকে সব কথা। কে কী করল সেসব কথা। কে কী খেলল সেই কথা।

রিদিমা একা একা অনেক কিছু বানায়। পুরনো জিনিসপত্র দিয়ে। খেলনা বানায়, শোপিস বানায়। তাতে রং করে। দেখতে আরো সুন্দর লাগে সেগুলো। ভিডিও কলে দেখায় রাইকে। শুরুর দিকে রাই ঠিক বুঝতে পারেনি সে দূরদেশে চলে গেছে। তাই একদিন বলে, দিদিভাই জিনিসটা সুন্দর হয়েছে। রেখে দাও, কাল যখন আসব খেলব।

ধীরে ধীরে সে বিষয়টা বুঝতে পেরেছে। এখন বলে, দিদিভাই একটা বাক্সের মধ্যে সবকিছু রেখে দাও। এরপর যখন আসব বের করে খেলব।

আচ্ছা। রিদিমা নরম গলায় বলে।

সেদিন ছিল ছুটির দিন। রিদিমা খেলছিল। তার পুতুলঘরে। আমি গিয়ে বললাম, কী করো সোনামা?

খেলছি। দেখতেই তো পাচ্ছো। রিদিমা জবাব দেয়।

বাহ্! ঘরটা সুন্দর করে সাজিয়েছো তো। আমি বলি।

তোমার পছন্দ হয়েছে?

অনেক পছন্দ হয়েছে।

জানো বাবা, এখন আমি সুন্দর করে ঘর সাজাই। সেরকমই থাকে। কেউ এলোমেলো করে না। করবে কে? যে করত সেই রাইসোনাটাই তো দেশে নেই। রিদিমার গলা ধরে আসে। তার চোখও কী ছলছল?

ভালো তো। তোমার ঘর এখন সুন্দর থাকে। আমি বলার জন্যই বললাম। ব্যাপারটা এড়াতে চাইলাম।

এই ভালো আমি চাই না। এই সুন্দর ঘর আমার পছন্দ না। তুমি রাইসোনাকে এনে দাও। ও এলোমেলো করুক। আমি আবার সাজাই। রিদিমার গলায় উপচে পড়া আবেগ। সে তার মুখটা দুই হাঁটুর মাঝে নিয়ে গেল।

আমি গিয়ে ওর পিঠে হাত রাখলাম। রিদিমা ফোঁপাচ্ছে।

আমি অসহায়ের মতো বসে রইলাম। ওর কষ্ট আমাকেও ছুঁয়ে গেল। বুকটা মোচড় দিচ্ছে। চোখ পুড়ছে। ওর মতো কাঁদতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু বড়দের যে যখন-তখন কাঁদতে মানা। বড়রা তাই কান্না আড়াল করে। কারণ কান্না তো লজ্জার ব্যাপার!

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj