আদুরে প্রাণী কোয়ালা

বুধবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৯

অভিযাত্রীর দল এগিয়ে চলছেন অরণ্যের গভীরে। দলের বেশিরভাগ মানুষই প্রাণী পর্যবেক্ষক। আছেন কিছু পর্যটক আর শৌখিন ভ্রমণপিপাসু। শিকারিরাও আসতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের কঠোরভাবে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে। সবার মধ্যে একটা ঢিলেঢালা ভাব। নতুন কোনো প্রাণী দেখলেই সেটাকে নিয়ে মেতে উঠছেন পর্যবেক্ষকরা। সামান্য একটা শুয়োপোকাও যে একদল মানুষকে উৎফুল্ল করে তুলতে পারে সেটা তাদের দেখে বিশ্বাস করতে হয়। আশপাশের প্রকৃতির চেয়ে পর্যবেক্ষকদের কাণ্ডই দলের বাকিদের বেশি আনন্দ দিচ্ছে। বিপজ্জনক কোনো প্রাণী এই এলাকায় নেই জেনেও গাইডরা সতর্কতার ভাব দেখাচ্ছে। এমন সময় এক দম্পতি এসে পর্যবেক্ষকদের জানালেন, তারা একটা বিচিত্র প্রাণী দেখেছেন। স্ত্রী বলছেন, সেটা একটা ছোট আকারের ভালুক বা পাণ্ডা। স্বামী বলছেন, সেটা ক্যাঙ্গারু গোত্রের কোনো প্রাণী। কারণ প্রাণীটা পেটের থলেতে বাচ্চাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রাণীটা আকারে ছোট হলেও মোটেই ভিতু নয়। তারা কাছে গেলেও পালানোর চেষ্টা করেনি ওটা। ‘কোনদিকে গেলে পাওয়া যাবে ওটাকে?’ জিজ্ঞেস করতেই বাঁ-দিকের ইউক্যালিপটাসের বনটির দিকে নির্দেশ করলেন দম্পতি। পর্যবেক্ষকের দল ছুটলেন সেদিকে। আবিষ্কার করলেন পৃথিবীর সুন্দরতম প্রাণীগুলোর একটিকে। নাম তার কোয়ালা।

কোয়ালা হচ্ছে ‘মারসুপিয়াল’ গোত্রের স্তন্যপায়ী প্রাণী। এই গোত্রের প্রাণীরা পেটের থলেতে শাবকদের নিয়ে বেড়ায়। সেই হিসেবে এরা ক্যাঙ্গারুর জাতভাই। কিন্তু কোয়ালারা আকারে অনেক ছোট। ক্যাঙ্গারুর মতো লাফালাফি করতেও এরা অনিচ্ছুক। পুরুষ কোয়ালা ওজনে ১২ কেজি পর্যন্ত হয়। মেয়ে কোয়ালার ওজন হয় সাড়ে ৮ কেজি পর্যন্ত। চলাফেরা দেখে খুবই অলস আর দুর্বল মনে হয়। কিন্তু এদের শরীরের পেশি বেশ মজবুত। শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে এরা অস্ট্রেলিয়ার বনভূমির গাছগুলোতে রাজত্ব করে বেড়ায়। কোয়ালারা তেমন একটা পানি পান করে না। এদের ‘কোয়ালা’ নামটি সম্ভবত এখানকার আদিবাসীদের দেয়া। যার অর্থ ‘নো ড্রিঙ্ক’ বা ‘পানবিমুখ’। আদিবাসীরা সরাসরি কোনো কোয়ালাকে পানি পান করতে কমই দেখেছে। আসল ব্যাপরটা অবশ্য অন্যরকম। প্রাণীগুলো এমন সব গাছের পাতা খায়, যেগুলো থেকেই ওদের শরীরের পানির চাহিদা মিটে যায়। আবার কিছু খাবারের ব্যাপারে কোয়ালারা অন্য তৃণভোজীদের থেকে অনেক এগিয়ে। ইউক্যালিপটাস গাছের পাতা অনেক প্রাণীর জন্যই বিষাক্ত। কিন্তু কোয়ালারা মজা করেই ইউক্যালিপটাসের পাতা খেয়ে থাকে।

প্রাণী হিসেবে এদের বৈশিষ্ট্যও বিচিত্র। লোমশ ছোট এই আদুরে চেহারার প্রাণী দিনে প্রায় সাড়ে ১৪ ঘণ্টা ঘুমায় এবং আরও পাঁচ ঘণ্টা ‘বিশ্রাম’ নেয়। সে হিসেবে এদের সবচেয়ে আলসে প্রাণীও বলা যায়। প্রায় সব প্রাণীরই যেখানে একটি করে বুড়ো আঙুল থাকে, সেখানে কোয়ালাদের সামনের পায়ে আছে দুটো করে বুড়ো আঙুল!

নিরীহ এই প্রাণীদের খাবারের চাহিদা সামান্য এবং তা যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায়। কিন্তু তারপরও কোয়ালারা বাস করছে ঝুঁকির মুখে। সুন্দর চামড়ার লোভে প্রতি বছর চোরা শিকারিরা নির্বিচারে হত্যা করে অসংখ্য কোয়ালা। লোভীদের হাত থেকে নিরাপদে থাকুক প্রকৃতির এই আদুরে সন্তান।

:: অনন্ত আহমেদ

ইষ্টিকুটুম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj