কালো মানুষের দেশে

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** রফিকুর রশীদ **

লুসাকা।

তিন অক্ষরের ছোট্ট শব্দ। মিষ্টি নাম। মানুষের নয়, স্থানের নাম। আফ্রিকা মহাদেশের এক প্রান্তের প্রায় আলোচনার বাইরে থাকা জাম্বিয়া নামের দেশের রাজধানী শহর লুসাকা। জনপ্রিয় ক্রিকেট খেলার সুবাদে জিম্বাবুয়ের নাম সারা দুনিয়ায় যতটা প্রচারিত এবং পরিচিত, পাশাপাশি দেশ জাম্বিয়ার সে পরিচয়-পরিচিতি নেই। জাম্বিয়ার নাম বললে অনেকে ভুলক্রমে জিম্বাবুয়ে বলে ধরে নেয়, এমন দৃশ্য অনেক দেখেছি। ভুলটা ধরিয়ে দিতে গেলেও কেউ কেউ বিরক্ত হয়, কেউবা ঘাড় দুলিয়ে বলে- ‘ওই হলো বাপু, জাম্বিয়া আর জিম্বাবুয়ে তো একই কথা। দুটোই তো কালো মানুষের দেশ!’ তা বটে। সাদৃশ্যের এই জায়গা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। তাই বলে দুটো স্বাধীন দেশের পৃথক অস্তিত্বকে গুলিয়ে ফেললে চলবে কেন! কালো মানুষ কি শুধু এই দুটো দেশেই বাস করে! কালো মাটির অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা মানুষগুলো শুধু আফ্রিকা কেন, সেই কবেই তো ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর দেশে দেশে। তাহলে তো মানতেই হয় সব দেশে এই কালো মানুষের ঘরবসতি আছে, আছে আত্মীয়-স্বজন।

হ্যাঁ, ইতিহাসের সত্য আমাদের মানতেই হয়- জাম্বিয়া এবং জিম্বাবুয়ের মধ্যে সম্পর্ক আছে বই কী! এ যেন একই বৃন্তে দুটি কুসুম, যেনবা এক মায়ের দুই জমজ সন্তান। ১৯৬৪ সালের পূর্বে এই দুই দেশের মিলিত নাম ছিল রোডেশিয়া। স্বাধীনতা লাভের পর দুই দেশের পৃথক দুটি নাম হয়েছে জিম্বাবুয়ে আর জাম্বিয়া। ভাবনাতে দোলা লাগে- একি আমাদের বাংলা ভেঙে দুভাগ হবার মতো ঘটনা! ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে দীর্ঘকাল শাসিত হয়েছে বাংলা। এই বাংলা মুলুকের দুঃসাহসী সূর্য সন্তানেরা বারবার কাঁপিয়ে দিয়েছে ইংরেজ শাসনের ভিত। ফলে শাসক-সম্প্রদায় ১৯০৫ সাল থেকে বঙ্গভঙ্গ নিয়ে যে নাটকের সূচনা করে ১৯৪৭ সালের মধ্যে আগস্টে র‌্যাডক্লিফের নিষ্ঠুর ছুরিতে বাংলাকে কেটেছিঁড়ে ভাগ করে সে নাটকের যবনিকাপাত ঘটায়। পূর্ব আর পশ্চিম বাংলা দুটি পৃথক রাষ্ট্রের সঙ্গে শেকলবন্দি হয়ে যায়। স্বাধীনতাকামী বাঙালি কবি অন্নদা শংকর রায় তখন তীব্র পরিহাস করে ছড়া লেখেন- ‘তেলের শিশু ভাঙলো বলে খুকুর পরে রাগ কর…।’ রোডেশিয়া ভাঙার দুঃখে কোনো আফ্রিকান কবি এমন তীব্র কটাক্ষপূর্ণ কবিতা লিখেছেন কিনা আমার জানা নেই। তবে আমাদের মানে বাংলাদেশের অধিবাসীদের গভীর আনন্দ এবং অহঙ্কার এই যে, ১৯৭১-এ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমাদের সেই ভগ্নাংশই পাকিস্তান নামক বর্বর রাষ্ট্রের শেকল ছিঁড়ে বেরিয়ে এসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করে।

ভারতসহ পৃথিবীর আরো অনেক দেশে বাংলাভাষী মানুষ ছড়িয়ে আছে সত্যি, তবু এই যে- তিরিশ লাখ শহীদের রক্তে ধোয়া স্বাধীন বাংলাদেশই বাঙালির দেশ বলে পরিচিতি পেয়েছে। আমি সেই সবুজ শ্যামল স্বাধীন দেশের সবুজ প্রচ্ছদের পাসপোর্ট বুকে নিয়ে রওনা দিয়েছি কেনেথ কাউন্ডার দেশ জাম্বিয়ার উদ্দেশে।

কেন জাম্বিয়া?

এশিয়ার এক প্রান্তের ছোট্ট এক দেশের মানুষ আমি। ‘ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া’- সেটাই সত্যি আমার জন্য, সেই আমি চলেছি আফ্রিকার অনগ্রসর অচেনা এক দেশ জাম্বিয়ায়। কী আছে সেখানে? কিসের টান, কে আছে সেখানে?

তাই তো, বিরাট প্রশ্ন বটে- কিসের টান, কী আছে সেখানে, দূর আফ্রিকায়? বেশ কিছুদিন থেকে ‘গ্লোবাল ভিলেজ’ নামের নতুন এক গ্রামতত্ত্বের কথা শোনা যাচ্ছে।

কী যে তার মানে, ষোলো আনা বুঝি না। সারা দুনিয়া মিলে কি তবে একটি মাত্র গ্রাম হয়ে যাবে? গ্রামের মানুষ হয়েও মনে প্রশ্ন জাগে- কাকে বলে গ্রাম? আড়ে-দিঘে লম্বা-চওড়া আমাদের গ্রামে তো দেখেছি গ্রামবাসীর চেহারা, ভাষা, খাদ্য, পোশাক, সামাজিক রীতিনীতি, বিশ্বাস-সংস্কার সবকিছু প্রায় একই রকম। এত বড় পৃথিবী যদি একটি ভিলেজে পরিণত হয়, তাহলে আর আফ্রিকার জাম্বিয়ার সঙ্গে এশিয়ার বাংলাদেশের বৈচিত্র্য থাকলেও পার্থক্য কেন থাকবে? সব তো মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে, দৃশ্যমান সীমানা প্রাচীর হারিয়ে যাবে! দুনিয়া জোড়া সমগ্র মানব সমাজের মধ্যে সমতা স্থাপনের মহার্ঘ্য স্বপ্ন এসে ধরা দেবে হাতের মুঠোয়। হায় ‘গ্লোবাল-ভিলেজ’ তত্ত্ব! তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এখনো শুরু হয়নি বটে, তবু প্রতিনিয়ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যুদ্ধের হুমকির মধ্যেই তো বাস করছে দুনিয়ার মানুষ। ধর্মের নামে, সাম্প্রদায়িকতার নামে, ক্ষমতা ও প্রতিপত্তির নামে দেশে-দেশে মানববিধ্বংসী বিভেদ তো বেড়েই চলেছে। দুনিয়া জোড়া একক গ্রাম হয়ে ওঠার কোনো লক্ষণ তো প্রতীয়মান হচ্ছে না।

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশের ইতিহাস পাঠ করতে গিয়ে কোথায় যেন পড়েছিলাম- আফ্রিকার কোনো এক রহস্যঘেরা দুর্গম অঞ্চল থেকেই মানবযাত্রার সূচনা হয়, অথৈ অন্ধকার থেকে জেগে ওঠে উজ্জ্বল আলোর বিন্দু। কত শত কোটি বছর পূর্বে শুরু হয়েছিল সেই অভিযাত্রা আমি তার কীইবা জানি! আফ্রিকার পথে রওনা হবার কালে, কেন জানি না নিজেকে সেই মহাকালের যাত্রীদলের পেছনের সারির সঙ্গী মনে হচ্ছে। মনের ভেতরে প্রবল চনমনে কৌতূহল- অচেনাকে চেনার, অজানাকে জানার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘আফ্রিকা’ কবিতায় যে লিখেছেন, ‘হায় ছায়াবৃতা, কালো ঘোমটার নিচে অপরিচিত ছিল তোমার মানবরূপ, উপেক্ষার আবিল দৃষ্টিতে….’ না, উপেক্ষা নয় আমি প্রবল আগ্রহ এবং গভীর মনোযোগ দিয়েই দেখতে চাই সেই ‘অপরিচিত মানবরূপ’।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj