কেমন হলো নির্বাচন

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** ইসহাক খান **

রাজনীতির সঙ্গে সাহিত্যের সখ্য বরাবরই অঙ্গাঙ্গি। রাজনীতি ছাড়া সাহিত্য ভাবা যায় না। অনেক লেখক আছেন যারা সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ব্যক্তিগতভাবে আমিও রাজনীতির মানুষ। স্কুল জীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। যদিও আমি এখন আর রাজনীতিতে সক্রিয় নই। তবে লেখালেখিতে রাজনীতি ছাড়তে পারিনি। সক্রিয় রাজনীতি না করলেও কৌত‚হল ষোলআনা। সেই কৌত‚হলের কারণে এবারের জাতীয় নির্বাচনের খুঁটিনাটি জানতে বেশ উন্মুখ ছিলাম। ভোটের আগে আমার এলাকা সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার ভোট নিয়ে নানা জনের সঙ্গে কথা বলেছি। সম্পর্কে ভাতিজা, একজন আওয়ামী লীগ কর্মীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘ভোটের অবস্থা কি?’ উত্তরে সে বলেছিল, ‘টলটলা পানির মতো পরিষ্কার।’

‘কীভাবে?’ আমি জিজ্ঞেস করলে সে হাসতে হাসতে বলেছিল, ‘সোজা হিসেব কাকা, মাইর হবে শব্দ হবে না।’ ওর এই কথায় আমি খুব মজা পেয়েছিলাম। শব্দ করে হেসে উঠেছিলাম।

বলা যায় নির্বাচনের খবর এখন বাসি। ৩০ ডিসেম্বর ভোট হয়েছে। সাংসদরা শপথ নিয়েছেন। মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়েছে। তারাও শপথ নিয়েছেন। দেশ সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে সামান্য কিছু মানুষ [বামাতি এবং জামাতিরা] এখনো জাবর কাটছেন। আদালতে রিট হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই নানাভাবে রসালো স্ট্যাটাস দিচ্ছেন। আমার একজন বামাতি বন্ধু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে বলেছেন, তিনি সিইসিকে পদক দিতে চান। আমি সেই বন্ধুর স্ট্যাটাসে মন্তব্য করেছিলাম, শুধু সিইসিকে পদক দেয়াটা যথাযথ হবে না। এই নির্বাচনে আরো অনেকেই পদক পাওয়ার দাবিদার। আপনি যদি তাদের নাম জানতে চান আমি তাদের নাম বলতে পারি। আমার এমন মন্তব্যের পর সেই বামাতি বন্ধু আর পাল্টা কিছু লেখেননি।

ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন, এবারের নির্বাচন কেমন হলো? কেউ রঙ্গ করে জিজ্ঞেস করেছেন, কেউ বা সিরিয়াসভাবে জিজ্ঞেস করেছেন। আমি এক কথায় জবাব দিতে পারিনি। এক কথায় জবাব দেয়া সম্ভবও না। তবে এবারের নির্বাচন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনের সঙ্গে বহুলাংশে সাযুজ্য রয়েছে ২০১৮ সালের নির্বাচন।

১৯৭০ সালে আমি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে আমি উন্মাদের মতো রাতদিন প্রচারণা চালিয়েছি। চোঙা ফুঁকিয়ে মিছিলে ¯েøাগান দিয়েছি। আমার জয়বাংলা ¯েøাগান সে সময় কর্মীদের ভীষণভাবে উদ্বুদ্ধ করত। ভোটের দিন বাড়ি বাড়ি ঘুরে মহিলা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে এসেছি। এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, কোনো মহিলা ভোট দিতে যাবেন কিন্তু বাইরে যাওয়ার জন্য পরার মতো ভালো কোনো কাপড় নেই। বাড়ি গিয়ে মায়ের কাপড় এনে তাকে পরিয়ে ভোট কেন্দ্রে নিয়ে গেছি। এর কারণ হলো, আমাদের চাওয়া ছিল তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করুক।

আমি তখন ভোটার ছিলাম না। অথচ ভোট দিয়েছিলাম ১০/১২টি। শুধু আমি নই আমরা সবাই মিলে উৎসবের আমেজে ফল্স ভোট দিয়েছি। কেউ বাধা দেয়নি। না পুলিশ না প্রিসাইডিং অফিসার। তারা বরং আগ্রহ নিয়ে আমাদের ভোট দিতে উৎসাহিত করেছে। কারণ তারাও চেয়েছে জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় নৌকাকে জেতাতে হবে। যার সঙ্গে এবারের নির্বাচনের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এবারো সবাই চেয়েছে শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় আসুক। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত থাকুক। বড় বড় ব্যবসায়ীরা চেয়েছে, চলচ্চিত্রের শিল্পীরা চেয়েছে। শুধু চাওয়া নয়, তারা তো সারাক্ষণ মাঠ গরম করে রেখেছে। নাটকের শিল্পীরা চেয়েছে। তারা ভিডিও বানিয়ে ফেসবুকে ভাইরাল করেছে। সরকারি কর্মকর্তারা চেয়েছে। সাবেক আমলারা চেয়েছে। তরুণ ভোটাররা চেয়েছে। পুলিশ, র‌্যাব এবং সেনাবাহিনী তারাও চেয়েছে শেখ হাসিনা আবার প্রধানমন্ত্রী হোক।

নির্বাচন কমিশনের একজন সদস্য মাহবুব তালুকদার, যিনি জামাতের রাজনীতি করেন, তিনিও যদি সিইসি হতেন তাতেও ফলাফলের কোনো হেরফের হতো না। কারণ উনি ছাড়া ওনার সব কর্মকর্তা নৌকার পক্ষে।

আওয়ামী লীগের এমন আকাশ ছোঁয়া বিজয়ে এককভাবে কাউকে পুরস্কৃত করার কোনো সুযোগ নেই। সবারই ভূমিকা এখানে জোরালো। এমনকি বিএনপিরও বড় ভূমিকা রয়েছে। তারা জামাতকে ধানের শীষ দিয়ে নির্বাচন করায় তরুণ ভোটারদের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। আমাদের তরুণরা আমাদের আশার বাতিঘর। তারা স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তারাই শাহবাগে রাতদিন ¯েøাগান দিয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি চাই। বিএনপি নামক দলটি তারা স্বাধীনতার পক্ষের দল বলে দাবি করলেও ভেতরে ভেতরে তারা স্বাধীনতাবিরোধী। শুধু ভেতরে নয় তারা প্রকাশ্যেও স্বাধীনতার বিরোধীর ভূমিকা পালন করেছে। তারা পাকিস্তানের নাগরিক গোলাম আযমকে দেশে আসতে দিয়েছে। তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে রাজনীতি করার সুযোগ করে দিয়েছে। তারা রাজাকার শাহ আজিজকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছে। রাজাকার আব্দুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট বানিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে রক্তাক্ত পতাকা তুলে দিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় তারা বিরোধিতা করেছে। অনেক জনসভায় বিরোধী দলীয় নেত্রী বলেছেন, ‘তারা যুদ্ধাপরাধী নয়, তারা রাজবন্দি। অবিলম্বে তাদের মুক্তি দিতে হবে।’ এমনকি ফাঁসিতে ঝোলা যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদেরও তারা নির্বাচনে নমিনেশন দিয়ে প্রমাণ করেছে তারা মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী। পরাজয়ের অনেক কারণের মধ্যে মনোনয়ন বাণিজ্য একটি কারণ বলে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। কোটি কোটি টাকা গেছে সাত সমুদ্র পেরিয়ে সুদূর লন্ডনে।

ভাতিজার কথাই সত্যি, ‘মাইর হয়েছে, কোনো শব্দ হয়নি।’ সবাই মিলে আধা ছেঁচরা গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেকেটি ঠুকে দিয়েছে। দেশে গণতন্ত্রের নাম গন্ধ নেই। অথচ সবাই গণতন্ত্র-গণতন্ত্র বলে সারাক্ষণ গলা ফাটাচ্ছে। ভাবখানা যে, গণতন্ত্র পেলে সবাই হাতে সোনার হরিণ পাবে। দেশ স্বর্গ হয়ে যাবে।

যে জাতি এখনো গণতন্ত্রের জন্য প্রস্তুত নয়। গণতন্ত্র কি ভালো করে বোঝেই না। তারাও বলে দেশে গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র যে নেই এটাতো রাখঢাক করে বলার কিছু নেই। সোজা কথায় গণতন্ত্র নেই কিন্তু গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। সেটা কোনো আধা ছেঁচরা গণতন্ত্র নয়। পিওর গণতন্ত্র। সেটা করতে হলে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী দল উভয়ই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হতে হবে। যাতে করে নির্বাচনের সময় আমরা উভয়কে যাচাই-বাছাই করার সুযোগ পাই। ‘মাইর হবে, শব্দ হবে না’ এমন ধরনের নির্বাচন স্থায়ীভাবে কারো কাম্য হতে পারে না। স্বাধীনতার পক্ষের বাম এবং অন্যান্য দলগুলো জোট বেঁধে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করুক। যারা আগামীতে ক্ষমতায় যেতে পারবে। দেশে ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হবে। জাতি হিসেবে আমরা আবার প্রমাণ করব আমরা যুদ্ধ করে স্বাধীনতা এনেছি। আমরা গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং উন্নত জাতি।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj