সংস্কৃতিকর্মীর সংগ্রাম

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** ফরিদ আহমদ দুলাল **

সংস্কৃতির সম্পর্ক মানুষের জীবনাচারের সাথে, যে কারণে কেউ চাইলেই কাউকে তার সংস্কৃতির শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টির পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বাঙালির ভাষার ওপর আঘাত হানলো তখনই প্রতিবাদে ফুঁসে উঠলো গোটা বাংলা; আর ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই বাঙালি এগিয়ে গেল স্বাধিকারের পথে। ভাষা যেহেতু সংস্কৃতির প্রধানতম অনুষঙ্গ, সঙ্গত কারণেই বাঙালি তার ভাষার অসম্মান সহ্য করতে পারেনি। সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হলে কোনো জাতিই তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারে না। সংস্কৃতির প্রবহমানতার সাথেই জাতির অস্তিত্বের সম্পর্ক। একজন সংস্কৃতিকর্মী তাই সমাজের অতন্দ্র প্রহরী। সংস্কৃতি যেমন প্রবহমান সংস্কৃতিকর্মী তেমনি নিত্য ক্রিয়াশীল।

সংস্কৃতিকর্মীর পরিচয় অনেক বিস্তৃত। এক অর্থে মাঠের রাখাল থেকে ধর্মপ্রচারক, সৃজনশীল শিল্পকর্মী থেকে নিমগ্ন দার্শনিক সবাই সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতি সব সময়ই প্রাগ্রসর চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। পৃথিবীর প্রাণিকুলের মধ্যে একমাত্র মানুষেরই রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতিজগৎ; যে কারণে মানুষকে সৃষ্টির সেরা জীব বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। মানুষের এই শ্রেষ্ঠত্ব কেবল কিতাবে থাকলেই তাকে শ্রেষ্ঠ হিসেবে মেনে নেয়া যায় না, শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ তার নিজেকেই করতে হয়। কেননা মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করেছে মানুষ নিজে; সুতরাং শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ করতে হবে তাকে তার আচরণে, তার ব্যবহারে, তার সৃষ্টিশীলতায়-উদ্ভাবনে- তার প্রাগ্রসরতায়, তার শিষ্টাচারে-ন¤্রতায়, তার মননে-মনীষায়, তার ব্যক্তিত্বে ও বিনয়ে। শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের জন্য চাই সংস্কৃতিমান হয়ে ওঠার প্রয়াস এবং সাফল্য। সংস্কৃতিমান না হলে কেউ শিষ্ট হতে পারে না, সংস্কৃতিমান না হলে কেউ ন¤্র-বিনয়ী-ব্যক্তিত্ববান হতে পারে না, সংস্কৃতিমান না হলে কেউ সৃষ্টিশীল হতে পারে না; সংস্কৃতিমান না হলে কেউ সহিষ্ণু হতে পারে না, সংস্কৃতিমান না হলে কেউ চলিষ্ণু হতে পারে না; কেননা সংস্কৃতি মানেই প্রগতি-সংস্কৃতি মানেই প্রাগ্রসরতা। সংস্কৃতিকে তুলনা করা যায় প্রবহমান নদীর সাথে। প্রবহমান নদী যেমন নিত্য বয়ে চলে সংস্কৃতিও তেমনি নিত্য প্রবহমান। যা প্রবহমানতাকে ধারণ করতে জানে তার নামই তো সংস্কৃতি। আমরা যদি সংস্কৃতির স্বরূপ সন্ধান করতে পারি এবং জীবনচর্চায় সমন্বয় করতে পারি, তাহলেই আমরা হয়ে উঠতে পারি সম্পন্ন মানুষ। কেননা মানুষের মানুষ হয়ে ওঠা আর মানুষের সংস্কৃতির সাথেই আছে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের আবশ্যিক পূর্বশর্ত। এবং এভাবেই ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি দুর্বোদ্ধতা ও জটিলতার আবর্তে আবৃত হয়ে যায়, যে আবর্ত থেকে সংস্কৃতি শব্দটিকে সাধারণ্যে গ্রহণীয় এবং প্রাঞ্জল করে তুলবার দায়িত্বটি পালন করতে হয় সংস্কৃতিকর্মীকে; বোধগম্য কারণেই সংস্কৃতিকর্মীর পরিচয় অনেকটাই বিস্তৃত হয়ে পড়ে। একজন কবি যখন সংস্কৃতিকর্মী হন তখন তিনি নিজেকে কেবল কাব্যচর্চায় সীমাবদ্ধ রাখেন না, সমাজ-প্রগতির স্বার্থে তিনি লড়াই করেন গদ্যে-বাগ্মিতায়-চিন্তনে ও সমাজতত্ত্ব গবেষণায়ও। একইভাবে একজন রাজনৈতিক নেতা যখন সংস্কৃতিকর্মী হয়ে ওঠেন, তখন সমাজ-রাষ্ট্র তার কাছে পেতে পারে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

পরিবার হচ্ছে মানুষের প্রথম সংগঠন, পরিবার বিস্তৃত হয় সমাজে- সমাজ থেকে রাষ্ট্রের দিকে যাত্রা, এরপর পৃথিবী। পৃথিবীর দেশে দেশে মানুষ প্রতিনিয়ত নিজেকে এগিয়ে নেয়ার কাজে সংগ্রামশীল; নিজেকে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যমেই মানুষ তার পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে চায়। মানুষের এই এগিয়ে চলার সংস্কৃতিই তাকে গুহাজীবন থেকে ডিজিটাল পৃথিবীতে নিয়ে এসেছে। মানুষের এই সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন মনীষী চিন্তা-চেতনা-দর্শন দিয়ে মানুষকে নতুন জীবনের দিশা দিয়েছেন। মনীষীদের দেখানো পথ যে সবাই সব সময় গ্রহণ করেছে তা নয়; বিশেষত দ্ব›দ্বমুখর সমাজে প্রচলিত ব্যবস্থার বিপক্ষে যখন কেউ নতুন কথা- নতুন চিন্তা- নতুন দর্শন দিয়ে মানুষকে আলোকিত করতে চেয়েছেন তাঁকে সমাজের মানুষ সব সময়ই সহজভাবে মেনে নেয়নি। যিনি নতুন তত্ত্বের উদ্ভাবক তাঁকেই নিজের দর্শনকে প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে বহু সাধনায়। তাঁরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন মানুষের কল্যাণ বিবেচনায়- তাঁরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন নিজের বিশ্বাসকে স্থিতি দিতে। সভ্যতার ইতিহাসে সেসব ত্যাগী মানুষের তালিকায় যুক্ত হয়েছে অসংখ্য উজ্জ্বল নাম। তাঁদের নাম যুক্ত হয়েছে মহাকালের আবর্তে। আজকের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় আজ যা পরিত্যক্ত-পশ্চাৎপদ, অতীতকালের দার্শনিকদের নিজ নিজ সময়ে তাই ছিল আধুনিক- তাই ছিল অগ্রসর।

দেশে দেশে সংস্কৃতিকর্মীকে নিজের ভাষা-কৃষ্টি-লোকাচার-লোকজ্ঞানকে আত্মস্থ করে দেশজ আবহের আলোকে নিজস্ব সমাজ-জলবায়ু-আবহাওয়া বিবেচনায় সমাজ-পরিপার্শ্বকে এগিয়ে নিতে তৎপর থাকতে হয়। সব সময় সে উদ্যোগ সযতœ-প্রয়াশ নাও হতে পারে। স্বতঃস্ফূর্তভাবেও সমাজের মানুষ নিজেদের পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখে। সমাজের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকার মাধ্যমেই প্রধানত প্রচলিত লোকবিশ্বাস-লোকজ্ঞান আর লোকাচারগুলো টিকে আছে যুগ যুগ ধরে। আমাদের লোকভাষা, প্রবাদ-প্রবচন, লোকগান-লোকছড়া, লোকধাঁধা-শিলুক, লোকমেলা, লোকচিকিৎসা, লোকউৎসব, লোকখেলা আর লোকাচারগুলোকে সমকালের সাথে সমন্বয় করাই সংস্কৃতিকর্মীর দায়িত্ব। সমন্বয় করার কাজটি যে সমাজ যতটা সাফল্যের সাথে বাস্তবায়ন করতে পারে সে সমাজ ততটাই এগিয়ে থাকে।

সংস্কৃতি বিষয়ক অসাধারণ গ্রন্থ ‘সংস্কৃতি-কথা’য় মোতাহের হোসেন চৌধুরী যখন বলেন, ‘ধর্ম্ম সাধারণ লোকের কালচার, আর কালচার শিক্ষিত, মার্জিত লোকের ধর্ম্ম’ তখন আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে সমাজতাত্তি¡ক মোতাহের হোসেন চৌধুরী ধর্মকে সংস্কৃতির চেয়ে কম গুরুত্ব দিয়েছেন, মনে হতে পারে ধর্মকে কিছুটা পশ্চাৎপদ বিবেচনা করেছেন তিনি; প্রকৃত প্রস্তাবে ধর্ম তো সংস্কৃতির বাইরে কিছু নয়, কিন্তু ধর্ম যখন ‘অর্থডক্স’ হয়ে যায়, ধর্ম নিজেই যখন সমাজের বোঝা হয়ে পড়ে তখন সেই ধর্মের আদ্যোপান্ত বদলে নেয়ার প্রয়োজন পড়ে মানুষের সংস্কৃতিমান থাকার স্বার্থেই। পৃথিবীতে তেমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বিভিন্ন সমাজে বারবার হয়েছে। সমাজে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান-সংস্কার-রীতি-নীতি যখন মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তেমন পরিস্থিতি থেকে সমাজকে নতুন পথের দিশা দিতে যিনি বা যাঁরা এগিয়ে আসেন তিনি বা তাঁরা সমাজ সংস্কারক হিসেবে পরিচিতি পান; এবং সমাজ-সংস্কারক মনীষীরা যতক্ষণ সমাজকে এগিয়ে নেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকেন, তাঁর সে সময়ের কাজটিই সংস্কৃতিকর্মীর কাজ। আপাতদৃষ্টিতে তেমন পরিস্থিতিতে সংস্কৃতিকর্মীর কাজকে ধর্মবিরোধী অথবা ধর্মীয় চেতনাবিরোধী মনে হতে পারে; কিন্তু ধর্মের মর্ম থেকে যখন তথাকথিত ধার্মিকগণ সরে যান তখন তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াটাই বরং তাকওয়াসমৃদ্ধ ধার্মিকের কাজ। মুহাম্মদ (দ.) যখন ইসলাম প্রচার শুরু করেন তখন খোদ ক্বাবাগৃহে ৩৬০টি মূর্তির অস্তিত্ব ছিল। এর অর্থ তৎকালীন আরবেও ধর্মচর্চা ছিল কিন্তু ধর্মের মর্ম থেকে বিচ্যুত বিপর্যস্ত সে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রচলিত ব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে নতুন চিন্তাকে জায়গা দেয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছিল মানুষের স্বার্থেই। স্বস্তির প্রবহমান ধারা প্রতিস্থাপনের স্বার্থেই সাংস্কৃতিক এ সংগ্রামটি করেছিলেন স্বয়ং মুহাম্মদ (দ.)। পৃথিবীর ইতিহাসে কেবলমাত্র মুহাম্মদ (দ.)-ই নন, যুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন সমাজে পরিত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন অসংখ্য মনীষী-দার্শনিক-সমাজকর্মী এবং যাঁরাই সমাজকে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়েছেন তাঁরাই সংস্কৃতিকর্মী।

সমাজে অনাচার-দুর্বৃত্তায়নের প্রতিবাদ করবে কে? সংস্কৃতিকর্মী। সমাজে সন্ত্রাস-বিশৃঙ্খলা-মাদকাসক্তি; রুখে দাঁড়াবে কে? সংস্কৃতিকর্মী। সমাজে অনৈক্য-বিভেদ, অসহিষ্ণুতা দূর করতে অবদান রাখবে কে? সংস্কৃতিকর্মী। ঐক্যের কথা-সহিষ্ণুতার কথা বলবে সংস্কৃতিকর্মী। সমাজে প্রতিহিংসা-সম্প্রীতি সংকট; সম্প্রীতির জন্য চিৎকার করবে কে? সংস্কৃতিকর্মী। সমাজে মহামারি-দুর্ভিক্ষ- সমাজে হতাশা-বঞ্চনা; সাহস জোগাবে কে? সংস্কৃতিকর্মী। অর্থ দাঁড়াচ্ছে যা-কিছু শুভ, যা-কিছু কল্যাণকর সব কিছুর জন্য তৎপর একমাত্র সংস্কৃতিকর্মী! অন্যভাবে বলতে পারি শুভ-কল্যাণ-প্রগতি আর অগ্রসরতার জন্য যারা লড়েন তারাই তো সংস্কৃতিকর্মী। যে কারণে সংস্কৃতিকর্মীর সংগ্রাম নিত্য চলমান; যে কারণে সংস্কৃতিকর্মী সমাজের জন্য অনিবার্য একজন। জুতো সেলাই থেকে চণ্ডিপাঠ- যদি তা হয় শুভ উদ্যোগ সবই করবে সংস্কৃতিকর্মী। সংস্কৃতিকর্মী তাই অকুতোভয়- সংস্কৃতিকর্মী তাই সংসপ্তক-যোদ্ধা। সংস্কৃতির এ সূত্রটি সমাজের প্রাগ্রসরজনদের উপলব্ধিতে আনা চাই; বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj