পরীর মাঠে বাদামগাছ

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** মানিক বৈরাগী **

শীত ঘাসকে ভালোবাসে- না ঘাস শীতকে ভালোবাসে। শীত ও ঘাস নাকি যুগল যৌনজীবন। ঘাস আর লাল পিঁপড়া দখলে থাকা আবার কোথাও তাজা গোবর থেকে ধোঁয়া উড়ছে। কাঠবাদাম গাছটি এখনো স্বসাহসিকতায় দাঁড়িয়ে আছে অগ্নিকোণে। রাতে ভয়ে তেমন কেউ আসে না এখানে। বাদামগাছের বিভিন্ন ডাল, শাখা, উপশাখায় জিনপরীর নাচখেলা হৈহুল্লোড় চলে। ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছি বাদামতলায়। কুকুর বা শয়তানপথিক কতোবার ঘুমের মধ্যে মুতে দিয়ে গেছে। অনেকেই পীরফকির মনে করে আলুপটল আধুলিমাদুলি রেখে গেছে। স্বাভাবিকতার বিপরীতে হাসতে হাসতে পরের পুকুরে গোসল করে পাকপবিত্র হয়েছি। পদ্মফুলের রহস্য খুঁজতে গিয়ে তলপেট নুনুতে আস্ত মৈষা জোঁক দিব্যি রক্ত চুষে নিচ্ছে। সাপ আর বেজির খেলা দেখতে দেখতেই ভুলে গেছি অনেক দিন ওখানে ঘাও শুকায়নি। বন্ধুরা ঠাট্টা মশকারিতে বলছে, তোর নুনু গেছে- বউ পাবি না। এসব আমি কিছুই মনে করিনি। রক্ত চোষা জোঁকের স্বভাব।

একদা যারা বেশ্যার দালালি করতে করতেই শ্রমিকের অর্থ শোষণ করে অনায়াসে সমাজপতি হয়ে গেছে- কোর্ট-কাচারি, থানা-পুলিশের নির্লজ্জ মুসাহেবি করছে মাদক পাচার করে পবিত্র মসজিদের দানবীরের পদ অলঙ্করণ করছে- বাহাবা নিচ্ছে বেলাজের মতো পানের পিক ফেলছে অথচ ভাদ্রমাসে কুকুর-কুকুরির সঙ্গমের দিকে তাকিয়ে থাকে, তাদের লালা ঝরে। সেসব আমাদের দুকর্ত্রীর ঘাড়ে বসে আছে- এমন দেখতে দেখতে আমাদের এই গৎবাঁধা তুচ্ছ করে যারা পরীরমাঠে শুয়ে থাকে বাদামতলায় পাতাদের হাসি দেখে ফুলের মঞ্জুরিতে মধুকরের উড়াউড়িতে- ঘাসের ডগার শিশিরবিন্দু জমা আর ঝরে পড়ার সময়ক্ষণ মাপে- তাদের মাঝে আমিও একজন। ধুরন্ধর আমলা ধূর্ত রাজনৈতিক যারা প্রতিনিয়ত আলো আঁধারের গলিতে দেশ বিক্রির সুযোগ-সুবিধা কমিশন ভোগে ব্যস্ত তাদের হাতে একটি প্রজাপতিও নিরাপদ নয়। তারা কখনো বুঝেনি প্রজাপতির রঙ বিভিন্ন রূপ কেন? তারাই তো উত্তরমেঘ-পূর্বমেঘকে একঘাটে এনে বাঘ ও মহিষের জল খাওয়ানোর ব্যর্থ প্রচেষ্টা করে আমি ও আমাদের এরকম কোনো স্বপ্ন ছিল না বিগত ৪০ বছর। তারাও চায় না আগামী ২০০ বছর আর কেউ স্বপ্ন দেখবে না। এমন জীবিত জড়দের দেশে ভাঁড় হওয়ার স্বপ্নও দেখি না অতীত, ভবিষ্যতেও নয়।

কবিতার পাণ্ডুলিপি জমতে জমতে হয়তো উইপোকার দখলে গেছে সব। কর্পোরেট পত্রিকার গোষ্ঠীবদ্ধ সম্পাদকের স্তূতিবাক্য ছাপানো অন্য কাজ জেনেও করে না তারা। এখানেও চরম মেধা নৈরাজ্যের কালাকাল। অথচ আমার সামনে ঝাউয়ের পাতারা গান গাইতে গাইতে মাঝিকে পথ দেখায়। এমন রহস্যের কান পেতে পার হয়ে যায় বেলা। গোরস্তানের ফসফরাসের ছুটোছুটিকে ক্ষণিক সাপের পা দেখার মতো চেয়ে থাকি তার দিকে। এটা কোনো চলমান ফরমানি মন মস্তে পারেনি বলেই অনেকের দৃষ্টিতে বা চোখে অকর্মণ্য। ওই সবুজাভ বাদামি মাঠে মৃত্তিকার কানের সঙ্গে বুক লাগিয়ে কতকাল আমি ঘুমিয়ে থাকি। গোধূলির অস্তমিত তীর্যক সূর্যালোক আমাকে কানে কানে বলে বাড়ি ফিরে যাও। তছনছ হয়ে যাচ্ছে তোমার বিছানা-অগোছালো বই-খাতা-কলম। তড়িৎ বেগে বাড়ি ফিরে দেখি তরে তরে সেজেছে যুবতীর মতো আমার বইয়ের র‌্যাক। এত দরদ, এত মায়া হঠাৎ কোনো আবেগি মানুষ তার ভালোবাসার উচ্ছ¡াস দেখে আমি আর্তচিৎকারে কেঁদে উঠেছিলাম। ক্ষুধা ও অর্থের কাছে নত হতে হতে তার কাছে বইগুলো অর্থহীন- চুলার জ্বালানি। আমি বোবা বালকের মতো ছল ছল চোখে খাঁচার পাখির মতো কেঁদেছিলাম। এসব স্বপ্ন ছিল গণহাসপাতালে ফ্লোরে ঘুমুতে ঘুমুতে স্বপ্নের এ তেলেপিঠে আমার কাছে মিথ্যে ঘুরে কাঁদিয়েছিল। অতঃপর আমিও সে পরীর মাঠে সবুজ ঘাসে শুয়ে আছি।

পুঁজির নিপীড়ন সময়ে তারা আজকাল লাবণ্যকে ভিত্তি করে অন্য অনেকের মতোই সময়ের ভেলা ভাসাতে পারতো আরোপিত আলোকজলে। আমিও বা কেমন পুরুষ আস্ত একটি ডিমের ঝোলের তরকারি মরুমানুষের মতো গোগ্রাসে গলাধঃকরণ করছি। মার্কসের লাল চোখ শ্মশ্রæমণ্ডিত অবয়বে হেসে বলছে, তুই দাস ক্যাপিটাল পড়েছিস? আমি এর কোনো অর্থ বুঝিনি, পাইনি এমন কোনো অর্থ- দ্বা›িদ্বক বস্তুবাদ জীবিত-জড়দের কাছে কি প্রতিক্রিয়া করবে। জড়বস্তুর সঙ্গে নদী-মীনের কার্যকারণ সূত্রটি কী? তবুও আমার বাদামিজলের সবুজ কলমিলতার ফুলে টুনটুনি পাখি ছুটোছুটি- বরইগাছের শাখায় কাকের কানে কানে ঈষাণকোণের ছাতিমগাছের শাখায় ময়নার বাসার কারিগরি প্রশিক্ষণের ভেদ দক্ষতা এখনো কেউ অর্জন করেনি। নৃতাত্তি¡ক, ভূ-বিজ্ঞানীরা মায়াশিল্পের রসায়ন এখনো আবিস্কার করেনি। তবে তারা অতিমানব ছিল, তাদের সঙ্গে ঈশ্বরের একটা শৈল্পিক-মানবিক সম্পর্ক ছিল হয়তো। অথবা সে সময়ের ঈশ্বর ছিলেন। যৌনশিল্পের অপার আনন্দকে ক্ষুধার তাড়নায় তাড়িত করে রক্তাক্ত করেনি। এখনো পরীর মাঠে নারীর যৌনাঙ্গ দখলের প্রবৃত্তিতে আধুনিক তালা আবিষ্কারের মেলা বসে। অস্ট্রো-এশীয় লিমুর প্রাণীর লোমকোষে, অনার্য পুরুষের, মায়াদের নীল রক্তধারা মিসরের নীলনদের জলে ভেসে গেছে বহুকাল আগে। তবুও আমি আমাদের পরীর মাঠে হেমন্ত উৎসবে কাঠবাদাম গাছের শাখায় শাখায় লিমুরের ছোটাছুটি দেখি। আমি কী সেই লিমুরের অনার্য জাত। তবুও বউয়ের বুকে ওম নিতে নিতে বিষাদের শব্দরা পাণ্ডুলিপিতে জমা হয় কুয়াশার আলোকরশ্মির শিল্প রূপে যা এখনো আঁকা হয়নি।

আমার বাদামি পরীরা এসো চলো যায়, ঘরে। আমার বইগুলো এখনো সাজানো রয়েছে তোমাদের জন্য। বাইবেল-কুরআনের পাশাপাশি ডারউইনের জাতি-প্রজাতির একটি ছবি চকচক করছে। ডারউইন কানে কানে বলছে, তোমার বাদামিমাঠের প্রজাপতিরা আরো ক’টা দিন থাকার ব্যবস্থা করুক। আমি তোমাদের ফেলে চলে যাবো, বাদামি পরীরা এসো সোনালি ডানায় ভর করে নিয়ে যাও লুসাই চূড়ায়….

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj