জীবনানন্দ যাপন

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** পিয়াস মজিদ **

মনে আছে গত শতাব্দীর কথা। ১৯৯৯-একটি শতাব্দী এবং সহ¯্রাব্দও যখন হেলে পড়েছে নতুন এক সহ¯্রাব্দ-শতাব্দীর দিকে। জীবনানন্দের জন্মশতবর্ষের বছরও বটে।

কুমিল্লায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উৎসাহী সদস্য আমি; ইতিহাস দর্শন সাহিত্যের গভীর সব পাঠচক্রের নিয়মিত শ্রোতা। বুঝি না বুঝি, শুনে যাই শুধু। শ্রæতির ভেতর ঢুকে পড়ে মিনার্ভার পেঁচার দীপ্ত উড়াল কিংবা চারবাক দর্শনের আহত ডানা, আধুনিক কবিতার হাড়গোড়, প্রথাভাঙা আখ্যানের ধড়। এরই মাঝে আড্ডার কোনো এক অগ্রজ বাংলা একাডেমির উত্তরাধিকার পত্রিকার ঢাউস জীবনানন্দ জন্মশতবর্ষ সংখ্যা হাতে নিয়ে আসেন ঢাকা থেকে কুমিল্লায়। উল্টেপাল্টে আমি মুগ্ধ, বিস্মিত। এত সব অনন্য শিরোনামের লেখা আর লেখার সাথে চিত্রকরদের আঁকা অভিনতুন যত ছবি। মনে আছে সংখ্যাটি নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যায় রীতিমতো। বয়সে ছোট বলে আমি এর ভাগ পাই বহু পরে। ততদিনে কবি আরিফ হাসান রানীর দিঘীর পাড়ে বসে সমুখের নারকেল বীথিতে সমাগত সন্ধ্যার সঙ্গে মিলিয়ে পড়ান-

সময়ের কাছে এসে সাক্ষ্য দিয়ে চলে যেতে হয়

কী কাজ করেছি আর কী কথা ভেবেছি…

বুঝি এ এক অন্যতর কবি, অন্যতর তার ভূমি ও আকাশ, জল ও পাতাল।

লালাপুকুর পাড় বলে এক এলাকায় কোনো এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে তার বাসায় গেলাম এক দুপুরে। সবাই যখন শেষকৃত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত ভীষণ আমার তখন বারবার চোখ যাচ্ছিল সে বাড়ির ছোট্ট বুককেসে রাখা এক মায়াময় বইয়ের দিকে, শুদ্ধতম কবি, লেখক- আবদুল মান্নান সৈয়দ। তখনো জানি না কে এই ‘শুদ্ধতম কবি’! পরে জানা হলো জীবনানন্দ দাশ। এ বইয়ের লেখক মান্নান সৈয়দের সঙ্গে বছর কয়েক বাদেই যে স্থাপিত হবে নিবিড় যোগাযোগ- তা কি জানতাম তখনো!

শহর কুমিল্লায় দেখেছি শান্তনু কায়সারকে। তাঁর এত এত বইয়ের মধ্যে আমার বিশেষভাবে ভালো লাগতো এই বইটির নাম- গভীর গভীরতর অসুখ গদ্যসত্তার জীবনানন্দ। গদ্যের বিপুল সম্ভার যে অনাদৃত স্বর্ণস্ত‚পের মতো জমা ছিল মরচে পড়া সব ট্রাঙ্কের ভেতরে- সে তথ্য জেনে চমকে উঠেছি আর ক্রমে ক্রমে প্রবেশ করেছি তার গদ্যের গহন অরণ্যে।

একুশে বইমেলা থেকে কিনে মাহবুব মামা আমার বোন রূপাকে উপহার দিয়েছিলেন জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। আমার বোন সে বই পড়তো কি না জানি না তবে আমি পড়তাম প্রায়শই, বুঝে বা না বুঝে। তখন বিদ্যমানে বসত করেও হারিয়ে যেতাম দূর পৃথিবীর গন্ধে, চলাফেরার ধূসর রাস্তা তখন হয়ে উঠত সবচেয়ে করুণ, সবচেয়ে সবুজ, সবচেয়ে সুন্দর। তারপর আদালতপাড়ার সরকারি পাঠাগারে পেলাম মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের প্রকাশিত অপ্রকাশিত কবিতাসমগ্র।

কুমিল্লা থেকে পত্রিকা বেরুত, এখনো বের হয় দৈনিক রূপসী বাংলা। প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক- কবি আবদুল ওহাব। কবি বলেই হয়তো পত্রিকার নাম রেখেছেন এমন। জীবনানন্দের বইয়ের নামধারী এই পত্রিকাতে প্রকাশিত আমার প্রথম কবিতার নাম ছিল ‘জীবনানন্দ দাশকে কিছু প্রশ্ন’। সংরক্ষণে নেই এখন কিন্তু অন্তর্গত বয়ানটি মনে আছে আজো- রূপসী বাংলা হেজে মজে গেছে, বনলতার সেনরা পথে পথে নির্যাতিত- এসব দেখে শুনে আপনি কেমন আছেন জীবনানন্দ? এমন জিজ্ঞাসা জাতীয় কিছু একটা ছিল সে কবিতাচেষ্টা।

তারপর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে জীবনানন্দকে পেলাম একান্ত অনুভাবনে, বিশদে-বিস্তারে। এখানকার প্রকৃতি, সকাল-সন্ধ্যা, দুপুর-বিকেল আর রাতের কড়ানাড়ার ভেতর চুপটি করে বসে পেতাম জীবনানন্দকে, তার সপ্তসিন্ধু এবং দশ দিগন্তকেও। একই ক্যাম্পাসের সৃজনী প্রতিবেশী মোহাম্মদ রফিক জীবনানন্দ নিয়ে একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকের একটি বই লিখলেন, সেলিম আল দীন লিখলেন ‘রূপসী বাংলার ভূমিরেখা’ নামের অনন্য-উন্মোচক এক গদ্য। তাঁদের লেখার ভাবনারেখাও আমাকে ছুঁয়ে গেছে ভীষণ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বেকার আমি ঢাকার রাস্তায় হাঁটছি উদ্দেশ্যহীন। হঠাৎ কবি বেলাল চৌধুরীর ফোন, জীবনানন্দগ্রন্থ কবি-লেখক, সম্পাদক ডা. ভূমেন্দ্র গুহ বক্তৃতা দেবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সেমিনারে। আমি ভাবলাম জীবনানন্দের চিকিৎসা বিষয়ে কিছু বলবেন কিন্তু গিয়ে শুনি ভারতবর্ষে শল্যচিকিৎসার আদিঅন্ত বিষয়ে বলছেন তিনি, জীবনানন্দের কথা সেখানে একেবারেই আসেনি। তবু ভূমেন্দ্রের কণ্ঠনিঃসৃত ধ্বনির উড়ে আসায় আমি যেন আসতে দেখলাম আমার জীবনানন্দকেও, হয়তো এই শ্বাসে মিশে আছে ১৯৫৪-এর অক্টোবর-প্রান্তিকের তার বিদায়বেলার শ্বাস। ভূমেন্দ্র গুহের মতো ময়ূখ গোষ্ঠীর তরুণরাই তো শুশ্রƒষার দীপ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন তার জীবন- অন্ধকারে।

গল্প লিখবো ভাবিনি কখনো। এক সকালে কুমিল্লার বাড়ি থেকে ঢাকা ফিরছি বাসে। অসহ্য যানজটে বন্দি যাত্রাবাড়ীতে, বাসের জানালা দিয়ে বাইরে চেয়ে দেখি- ‘বনলতা হোটেল’; হঠাৎ মনে হল ভেতর-গোঁজা জীবনানন্দ কতভাবে বিস্তারিত এই ঢাকায়! মাথার খাতাতেই যেন লেখা হয়ে গেল ‘নগর ঢাকায় জনৈক জীবনানন্দ’ গল্পটি। প্রকাশ হলে আশাতীত পাঠপ্রতিক্রিয়া পেয়েছি, দু-দুজন পরিচালক টেলিছবি করার প্রস্তাব নিয়ে এলেন। শেষ পর্যন্ত এই নামে টেলিছবি করলেন আশুতোষ সুজন, প্রচারিত হলো চ্যানেল আইয়ে- একটি ছোট্ট চরিত্রে অভিনয় করতে হলো আমাকেও। এতটা তো আমি ভাবিনি। আর এতটা বিষয়নির্ভর গল্পও আমি লিখতে চাইনি। আমি চেয়েছি মনের ভেতরকার নির্জন মিছিলের ছবি গল্পের ভাষায় আঁকতে, এই সময়ে বসত করেও চির সময়ের আখ্যান বুনে যেতে। তবু জীবনানন্দের হাত ধরেই আমার হাতে লেখা হলো এমন একটি বিষয়নির্ভর অজীবনানন্দীয় গল্প। পরে নগর ঢাকায় জনৈক জীবনানন্দ শিরোনামেই প্রকাশিত হলো আমার প্রথম গল্পের বই। যে জীবনানন্দ আমার কাছে ছিল বিজন উদযাপনের বিষয়, সে চলে এলো এতটা প্রকাশ্যে আমার। আসুক, জীবনানন্দই তো আমাদের সমূহ অপ্রকাশের ভার।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj