উৎসবের বইমেলা

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** নাসের রহমান **

মেলা শব্দটির সাথে ছোটবেলা থেকে পরিচিত। নিজের গ্রামে মেলা না বসলেও পাশের দুই গ্রামে বছরে একবার মেলা বসতো। একটি স্কুলের মাঠ জুড়ে আরেকটি হাটের উত্তর পাশে বিল জুড়ে রাস্তার দু’ধারে। স্কুলটিতে কয়েক বছর পড়েছে। এ সুযোগে মেলায় যাওয়া সহজ হয়ে উঠে। স্কুলের আশপাশে সব বডুয়াদের বাড়ি। এলাকাটি বডুয়া পাড়া হিসেবে পরিচিত। কিন্তু মেলাটা ছিল সবার। মাটির তৈরি হাঁড়ি পাতিল নানা রকম গৃহস্থালি জিনিসপত্র মেলায় পাওয়া যেতো। ছোটদের খেলনাও বেশ বেচাকেনা হতো। মাটির তৈরি পতুল ঘটি বাটিতে নানা রংয়ের আলপনা তুলে সাজিয়ে রাখতো। খাবারের মধ্যে মুড়ির খৈয়ের চিঁড়ার নানা ধরনের মোয়া পাওয়া যেতো। বাঁশের তৈরি ছোট বড় মাঝারি ধরনের রং-বেরংয়ের বাঁশি বিক্রি হতো। এসব টুকিটাকি ছেলেমেয়েরা না কিনে বাড়ি ফিরতো না। তবে ছেলেমেয়েরা কেউ বাবা-মার সাথে অসতো না। মেলাটা জমে উঠতো বিকেল বেলা, সন্ধ্যার পর পর প্রায় শেষ হয়ে যেতো। বাড়ির দু’তিনজন একসাথে বা পাড়ার কয়েকজন দল বেঁধে মেলায় আসতো। তারা সারা বছরে জমানো পয়সা দিয়ে এসব কিনে নিতে চেষ্টা করতো। স্কুলের পাশে বিলে নাগরদোলা কয়েকটা ক্যাঁ, কোঁ শব্দ করে চলতো। ছেলেদের কেউ কেউ চড়তে ভয় পেতো। অন্যরা চড়লে তারা পাশে থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতো। আরেকটি মেলা বসতো অন্য গ্রামে একটু দূরে কাজীর হাটে, সেটিকে বলতো মন্দাকিনীর মেলা। ঐ এলাকায় হিন্দুদের বসতি ছিল বেশি। তাদের পূজা পার্বণের উৎসব হতো। ঐ মেলায় বেত ও বাঁশের জিনিসপত্র বেশি পাওয়া যেতো। গৃহস্থালি সামগ্রী আর কৃষিকাজের জন্য তারা সারা বছরের প্রয়োজনীয় জিনিস ঐ মেলা থেকে সংগ্রহ করে রাখতো। কিছুটা দূরে হওয়ায় মেলায় যাওয়ার সুযোগ তেমন হতো না। তারপরও একবার গিয়ে মেলায় ঘুরে পাশের এক আত্মীয় বাড়িতে থাকতে হয়েছে। তখন পায়ে হেঁটে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। হালদা খাল পার হয়ে যেতে হতো। এ সময়ে খালে পানি থাকতো হাঁটু পরিমাণ। তাই সহজে পার হয়ে ওপাড়ে যাওয়া যেতো। মেলা বলতে তখন ঐ দুটি মেলা মনের ভেতর ঘুরপাক খেতো।

উপরের ক্লাসে উঠে শহরে এসে দেখে এখানে অন্য ধরনের আরেক মেলা বসে। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারের পাশে মুসলিম হলের চত্বরে কয়েকদিন চলে।

এমনকি সপ্তাহ জুড়ে মেলা চলতে থাকে। তবে এটা পণ্য বেচাকেনার মেলা নয়। সবাই বলে প্রাণের মেলা। আসলে বইমেলা। ছোট ছোট স্টলে বই বিক্রি হয়। স্টলগুলো সাদা কাপড়ে টানানো। লেখক আর বইপ্রেমীরা এ মেলায় ছুটে আসে। শুধু বই নয়, নানা ধরনের ম্যাগাজিন স্মারণিকা এ মেলায় পাওয় যায়। সবচেয়ে বড় কথা সবাই এখানে একবার ছুটে আসে। একজন আরেকজনের সাথে মিলিত হয়ে গল্প গুজব করে। বিকেলের সময়টা তখন অন্যরকম লাগে। যারা লিখে তারা অনেক কষ্টে বছরে একটি বই বের করে এ সময়ে। লেখক বইটি কয়েকটি স্টলে দেয়। কোনো স্টলে নিজে গিয়ে দাঁড়ায় কেউ এলে বইটি দেখার জন্য বলে। অনেকে হাতে তুলে দেখে। কেউ কেউ কিনে। কেউ কয়েক লাইন পড়ে ফেরত দেয়। কেউ শুধু না পড়ে শুধু উল্টায়ে পাল্টায়ে রেখে দেয়। লেখকের মনটা খারাপ হয়ে যায়। তবুও সে দম হারায় না। আর একজন এলে তার দিকে বইটি বড়িয়ে বলে এটা আমার নিজের লেখা বই এবার বেড়িয়েছে। এভাবে একবার বইটি অন্যের হাতে তুলে দিতে চায়। অনেক যতœ করে ধৈর্য নিয়ে লিখতে হয় তারচেয়ে বেশি কষ্ট প্রকাশ করতে। তবে বৎসরে একটির বেশি বের করা যায় না। আবার সে বই বিক্রি করতে এভাবে আকুতি করতে হয়। সেটা ভাবলে কেমন যেন লাগে। মাঝেমধ্যে এসব ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু লেখা যখন ছাপা হয় আর বই পড়ে কেউ যখন বলে তোমার লেখাটা আমি পড়েছি, ভালো হয়েছে। তখন মনটা ভরে যায়। এতকিছু আর মনে থাকে না। আবার নতুন করে লিখতে ইচ্ছা হয়। এভাবে আনেক নতুন লেখক টিকে যায়। বছরের পর বছর লিখতে লিখতে লেখক হয়ে ওঠে। বইমেলায় মেধা আর মননের যে বিপণন হয় সেটা অনেকে ভাবতে পারে না। একুশের এ মেলা দুই সপ্তাহ ধরে চলতো মেলার পূর্ব পাশে একটি মঞ্চের মতো করা হতো। সেখানে বিকেলে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হতো। আলোচনায় বিশিষ্ট জনেরা অংশগ্রহণ করতেন। আমাদের শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির অনেক কিছু জানার সুযোগ হতো।

এরপর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ার শেষ দিকে ঢাকায় একুশের গ্রন্থমেলায় আসা হয়। বাংলা একাডেমি চত্বরে বইয়ের যে এত বড় মেলা হতে পারে তা আগে ভাবতে পারিনি। মেলায় এত বেশি প্রকাশক আর স্টল আসতো তা চত্বর পেরিয়ে আশপাশে জায়গা করে নিতো। প্রকাশক লেখক আর পাঠকদের সমাগম হতো সবচেয়ে বেশি। মাসব্যাপী অমর একুশের এ গ্রন্থ মেলাটি এক সময় সাধারণের প্রাণের মেলায় পরিণত হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম গ্রন্থমেলায় যেন তাদের প্রাণের স্পন্দন খুঁজে পেতে শুরু করে। শুধু ঢাকায় যারা থাকে তারা নয়, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বইপ্রেমীরা এ মেলায় ছুটে আসে। লেখক শিল্পী, সাহিত্যেক মননশীল মানুষদের জন্য একুশের বইমেলাটি যেন তাদের মিলনমেলায় পরিণত হয়। একের সাথে অপরের যোগাযোগ, পরিচয়, কুশল বিনিময় এ মেলাকে আরো প্রাণবন্ত করে তোলে। ধীরে ধীরে বছরের পর বছর মেলার ব্যাপ্তি এত বেশি হয়ে যায় নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আর ধরে রাখা যায় না। মেলায় বইয়ের সাথে সাথে কারুপণ্য থেকে শুরু করে নানা হস্তশিল্পের সমাহার ঘটে। রাস্তার পাশজুড়ে ফুটপাথ ধরে এসব পণ্যের পসরা সাজিয়ে মেলা প্রাঙ্গণকে যেন কারুকাজময় করে তোলে। এতে বই মেলায় যে মূল আকর্ষণ তাতে কোনো বিরূপ প্রভাব না পড়লেও লেখক পাঠকের যে মিলনমেলা সেখানে কিছুটা বিঘ্ন ঘটে। তারুণ্যের উচ্ছ¡াসে একুশের বইমেলা যেন অন্য এক জোয়ারে ভাসতে থাকে। পরবর্তীতে আরো বৃহত্তর পরিসরে বইমেলা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পৌঁছে যায়। রাস্তায় আর ফুটপাথে কেউ আর পসরা সাজিয়ে বসতে পারে না। বইমেলা যেন আগের প্রাণ ফিরে পায়। বাংলা একাডেমির চত্বরে ছোটদের বইয়ের অপূর্ব সমাহার আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল বই মেলায় লাখ তারুণ্যের পদচারণায় মুখরিত হয়ে যেন আনন্দ ধারা বয়ে যায়।

মেলা এখন আনন্দ উৎসবের। উৎসবমুখর পরিবেশ না হলে এখনকার মেলা আর জমে উঠে না। এখন অনেক কিছুর মেলা হয়। মেলার যেন শেষ নেই। পণ্য সামগ্রী থেকে শুরু করে ফ্ল্যাট বাড়ি পর্যন্ত এখন মেলা ছাড়া বিক্রি হয় না। আসলে বিক্রির চেয়ে প্রচার প্রসারে জন্য মেলার কোনো বিকল্প নেই। এ জন্য বড় ছোট মাঝারি সব শিল্পপণ্য এখন মেলায় প্রদর্শিত হয়। আগের সে গ্রামীণ মেলা আর খুঁজে পাওয়া যায় না। মাটির কোনো জিনিসের ব্যবহার এখন আর তেমন নেই। মাটির তৈরি হাঁড়ি পাতিলের পরিবর্তে এলুমিনিয়ামের ডেক ডেকসি ব্যাবহার করে সবাই। বাঁশ বেতের পরিবর্তে প্লাসটিক সামগ্রী জায়গা করে নিয়েছে অনেক আগে। বাঁশ বেত আগের মতো সহজে আর পাওয়া যায় না। মূল্যও অনেক বেশি। তাই সবাই প্লাস্টিক আর ম্যালামাইনের জিনিসপত্র ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে।

ছাত্রাবস্থায় বিজ্ঞান মেলার খুব জোয়ার ছিল। সাইন্স পড়–যা ছেলে মেয়েরা বিজ্ঞান মেলায় নানা রকম উদ্বাবন নিয়ে মেতে উঠত। একবারে নতুন কিছু উদ্ভাবন করে ফেলত। বিজ্ঞান মেলায় প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় পুরস্কার দেওয়া হতো। এখনো আছে নিশ্চয়। বিজ্ঞান তো আর থেমে নেই, এগিয়ে চলছে। তবে ডিজিটাল মেলার জোয়ারে বিজ্ঞান মেলার কথা তেমন শোনা যায় না। বড় বড় শহরে জেলা ও উপজেলায় এখন ডিজিটাল মেলা বসে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল মেলাই তরুণ-তরুণীদের বেশি আকর্ষণ করার কথা। গ্রামেগঞ্জে সর্বত্রই ছেলেমেয়েদের হাতে তথ্যপ্রযুক্তি পৌঁছে গিয়েছে। মোবাইল ছাড়া এখন আর চলে না। সবার হাতে হাতে মোবাইল দেখা যায়। এ মোবাইল সেটের জায়গায় যদি একটি করে বই থাকতো। তাহলে কেমন হতো? তা কি করে সম্ভব। এটা মোবাইলের যুগ। তবুও অনেক বই প্রকাশিত হয়। নতুন নতুন অনেক লেখক তৈরি হয়। একুশের গ্রন্থমেলা দেখলে মনে হয় না বই কখনো থেমে যাবে, বইয়ের বিকল্প অন্য কিছু হতে পারে। তরুণ প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা যেভাবে মেলায় ভিড় জমায় এতে আশা জাগে তারা এ বইমেলাকে আরো অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আগের দিনের সেসব ছোট মেলা হারিয়ে গেলেও স্বাধীনতার বইমেলা নতুন লেখকদের প্রেরণা জোগাবে। নতুন নতুন পাঠক তৈরি করবে। শুধু কি তাই? আরো অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের একটি সোনালি অতীত আছে। রক্তে রাঙানো অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে। কোনো জাতিকে ভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়নি। যা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃত। গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করেছি, বিজয় অর্জন করেছি। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত এ মহান মুক্তিযুদ্ধ। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের অনন্য দলিল ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’। স্বাধীনতার বইমেলা এসব গৌরবগাথায় আমাদের নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের উজ্জীবিত করে একুশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভেতর দিয়ে আগামী দিনের স্বপ্ন।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj