তাইয়েব সালেহর উপন্যাস নিয়ে

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** স্বকৃত নোমান **

সুদানি ঔপন্যাসিক তাইয়েব সালেহর উপন্যাস ‘সিজন অফ মাইগ্রেইশান টু দ্য নর্থ’ মূলত দুটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে। এক. যৌনতা, দুই. রাজনীতি। উপন্যাসে যৌনতার যে খোলাখোলি বর্ণনা তিনি দিয়েছেন, সুদানি সমাজের প্রেক্ষাপটে আরব উপন্যাসে তা খুঁজে পাওয়া সত্যিই কঠিন। যেমন, “কী আর বলব, তার ঐ জিনিসটা একটা জিনিস ছিল বটে, ইয়া লম্বা আর মোটা, একটা আস্ত গোজের মতো, যখন ভেতরে ঢুকিয়ে দিত, তখন নিজেকে সামলাতে পারতাম না। আমার দুই উরুর মাঝে বসে আমার স্বামী যখন সঙ্গম শুরু করত তখন যৌন আনন্দে এত জোরে চিৎকার দিতাম যে, সে শীৎকারের শব্দ শুনে মাঠে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা পশুরাও ভয় পেয়ে যেত।”

শুধু তাই নয়, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সা’ঈদের ইংরেজ প্রেমিকাদের সঙ্গে সঙ্গমের যে খোলাখুলি বর্ণনা দিয়েছেন লেখক, সুদানের কোনো লেখক এর আগে সম্ভবত সাহস করেননি। এই কারণে, অর্থাৎ উপন্যাসটিতে যৌন সম্পর্কের অনেক খোলামেলা বর্ণনা থাকার কারণে ১৯৯০-এর দশকে ইসলামি শাসনামলে উপন্যাসটি সুদানে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। উপন্যাসটির বিরুদ্ধে ইসলামি শাসকদের অভিযোগের কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সা’ঈদের ইংরেজ প্রেমিকা জ্যঁ মরিসের সাথে যৌন সম্ভোগের যেসব দৃশ্য উপস্থাপন করা হয়েছে সেগুলো ইসলামি সংস্কৃতিতে শোভন নয়।

অর্থাৎ তাইয়েব সালেহ আরব বিশ্বের প্রচলিত ট্যাবুকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। আরব বিশ্বের তিন ট্যাবু হচ্ছে- যৌনতা, ধর্ম ও রাজনীতি। তাইয়েব সালেহ এই তিন সামাজিক সংস্কারের দুটিকে- যৌনতা ও রাজনীতি- তাঁর উপন্যাসের উপজীব্য করেছেন। প্রধানত এই কারণেই, আমার মনে হয়, তার এই উপন্যাসটিকে বিশ শতকের সেরা আরবি উপন্যাস বলা হয়ে থাকে। নইলে যে ধারায় তিনি উপন্যাসটি লিখেছেন সেই ধারা বিশ্বসাহিত্যের প্রেক্ষাপটে নতুন কিছু নয়। এই ধারা আরব বিশ্বের উপন্যাসের জন্য নতুন। এ কারণেই তার উপন্যাসটি শ্রেষ্ঠত্বের দাবি রাখে।

সুদানি সমাজের প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাস নিঃসন্দেহে একটি দুঃসাহসিক শিল্পকর্ম।

সুদানি সমাজের প্রেক্ষাপটে নারীদের কোনো মূল্য নেই। নারীদের সেখানে বর্বর কায়দায় খৎনা করানো হয়। পুরুষরাই, সে পুরুষ অন্ধ বোবা পঙ্গু যাই হোক না কেন, নারীদের ওপর কর্তৃত্ব করে। নারীদের আলাদা কোনো সত্তা নেই, তারা পুরুষের ব্যবহার্য সামগ্রী মাত্র। ব্যবহার করো, আর ছুড়ে ফেলে দাও। তাইয়েব সালেহ তাঁর এই উপন্যাসে দেখিয়েছেন নারীরও যে আলাদা সত্তা আছে, তারাও যে স্বাধীনভাবে স্বামী নির্বাচনের অধিকার রাখে। জোর করে বিয়ে দেওয়ার পনেরো দিনের মাথায় প্রতিবাদস্বরূপ বৃদ্ধ স্বামী ওয়াদ রাইয়েছকে হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করে মুস্তাফা সা’ঈদের বিধবা স্ত্রী হোসনা বিনত মাহমুদ। হোসনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যে লোকটি তার স্বামী হিসেবে আবির্ভূত হয় তাকে হত্যা এবং নিজের আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে সুদানের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতি ধিক্কার জানিয়েছে হোসনা। এটি তার বিদ্রোহ। হোসনা চরিত্রের মধ্য দিয়ে পুরুষতান্ত্রিকার বিরুদ্ধে নারীর এই বিদ্রোহের উল্লেখ করে আরব উপন্যাসের ধারায় তাইয়েব সালেহ নিজেকে বিশিষ্ট করে তুলেছেন।

উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মুস্তাফা সা’ঈদের চরিত্র চিত্রণের মধ্য দিয়ে যা বোঝাতে চেয়েছেন ঔপন্যাসিক (আমি আদৌ নিশ্চিত নই লেখক তা বোঝাতে চেয়েছেন কিনা) তা পাঠক হিসেবে আমার কাছে খুবই স্থ‚ল মনে হয়েছে। হ্যাঁ, প্রাচ্যকে নারীর মতোই যে বলাৎকার করেছে পাশ্চাত্য, তা অস্বীকার করছি না। সেই বলাৎকারের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন মুস্তাফা সা’ঈদ লন্ডনে গিয়ে একাধিক নারীকে পটিয়ে-পাটিয়ে বিছানায় নিয়ে, হত্যা করে, আত্মহত্যায় বাধ্য করে। মুস্তাফা সা’ঈদ তার শিশ্ন দিয়ে আফ্রিকাকে স্বাধীন করে ফেলার স্বপ্ন দেখেছেন। উপনিবেশিকরা তাদের উপনিবেশে যেমন সহিংসতা চালায়, উপনিবেশের প্রজা হিসেবে মুস্তাফা সা’ঈদও তেমনি ইউরোপের নারীদের উপর সহিংসতা চালিয়ে প্রতিশোধ নিয়েছেন। যৌনতাকে করেছেন তার অস্ত্র আর ইউরোপীয় নারীদের করেছেন প্রতিশোধ গ্রহণের হাতিয়ার।

প্রতিশোধের এই মাধ্যকেই স্থূল বা হাস্যকর বলতে চাচ্ছি আমি। কেননা প্রাচ্যকে বলাৎকার করেছে প্রাশ্চাত্য মগজ দিয়ে, শিশ্ন দিয়ে নয়। শিশ্ন দিয়ে যদি প্রাচ্যবাসী প্রাচ্যকে স্বাধীন করতে চায়, উপনিবেশিকদের হটাতে চায়, প্রতিশোধ নিতে চায়, এটি হাস্যকর নয় তো কী? এতে প্রাচ্যের বর্বরতারই প্রকাশ পায়। তাইয়েব সালেহ যদি প্রাচ্যের, অর্থাৎ আরব বিশ্বের, এই বর্বরতা দেখানোর জন্য মুস্তাফা সা’ঈদ চরিত্রটি নির্মাণ করে থাকেন, তাহলে ঠিক আছে। কেননা আরব বিশ্বের তেলের মহাজন শেখরা এখনো ‘শিশ্নাচার’ থেকে বেরুতে পারেনি। তাদের কাছে জীবনের মানেই হচ্ছে নারী সম্ভোগ আর উদরপূর্তি। কিন্তু তিনি যদি রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মুস্তাফা সা’ঈদের মাধ্যমে পাশ্চাত্যকে বলাৎকারের জন্য চরিত্রটি নির্মাণ করে থাকেন, তাহলে একটু ঔদ্ধত্য হলেও বলবো, তাইয়েব সালেহ নিজেই ‘শিশ্নাচার’ থেকে বেরিয়ে ‘মগজাচারে’ আসতে পারেননি। তথাকথিত ‘যৌন-রাজনীতির’ তত্ত্ব হাস্যকর। উপন্যাসটি পড়ে আমার মনে হয়নি তাইয়েব সালেহ দ্বিতীয়টি করতে চেয়েছেন। আমার মনে হয়েছে তিনি একটি বিকারগ্রস্ত চরিত্র অঙ্কন করতে চেয়েছেন, যে চরিত্রের নাম মুস্তাফা সা’ঈদ, যে নিজ দেশকে ভুলে, নিজের সংস্কৃতিকে ভুলে ইউরোপে গিয়ে ভোগ-বিলাসে গা ভাসাতে চেয়েছে, নিজের প্রজাত্ব ঘোচাতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। শিশ্ন দিয়ে আফ্রিকা স্বাধীন করার স্বপ্নটি ছিল তার বিকার। এই বিকার থেকে শেষ পর্যন্ত সে ফিরে এসেছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে এসেছে নিজভূমিতে।

তাইয়েব সালেহ তাঁর সমাজের প্রেক্ষিতে নিঃসন্দেহে প্রথাবিরোধী ঔপন্যাসিক। তাঁর ‘সিজন অফ মাইগ্রেইশান টু দ্য নর্থ’ উপন্যাসটি পড়ে এটিই মনে হচ্ছে। উপন্যাসটি পড়তে লেগেছে মাত্র দুদিন। সব মিলিয়ে ১৭ ঘণ্টা। দেড়শ পাতার উপন্যাস। অনুবাদ করেছেন ডা. মো. মিজানুর রহমান। খুবই ভালো অনুবাদ। কিন্তু কিছু কিছু শব্দের প্রয়োগ দেখে এই সন্দেহও তৈরি হয়েছে- এটি কি বাংলাদেশের কারো অনুবাদ, নাকি কলকাতার কারো? কারণ প্রয়োগকৃত শব্দগুলো কলকাতার স্টাইল। কে জানে, অনুবাদক হয়তো ইচ্ছে করেই ঐ স্টাইল রেখেছেন। ঐ স্টাইল রাখা যাবে না এমন তো কথা নেই।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj