তোমার রগে আমার প্রেম

শুক্রবার, ১৮ জানুয়ারি ২০১৯

** নীতুল জান্নাত নীতি **

নীলরোদ,

আমরা যে হারিয়ে গেছি বিষাদের সন্ধ্যার আসরে, নীল মদের কাচে ঝাপসা আলোয় সে কি তুমি জানো? অহেতুক তুমি ছুটেছো তবুও, খুঁজেছো মিঠে আশ্বাস পাশে থাকার। গুনতে ভুলে গেছো ছেঁড়া ঘুঙুরের প্রতিটি মুক্তো। হারিয়ে গেছি আমিও দেয়ালে দেয়ালে, অহেতুক তুমি ছুটেছো তবুও মিঠে ছলনার ভিড়ে। নীলরোদ, বিষাদের রোজ দুপুরে একলা ঘরে গুমরে কেঁদেছ তুমি, অথচ দেখনি!

সেই কান্নার প্রতিটি নোনা জলে ডুবেছি আমি। অথচ প্রাণহীন এই আমরা এক নীল রঙের ভোরে কাছাকাছি এসেছিলাম, তোমায় আলতো করে ছুঁয়ে ডেকেছিলাম ‘নীলরোদ’। অর্থহীন ভালোবাসা, অর্থহীন তার নাম। তবুও অহেতুক ডেকে উঠি তোমায়, জেগে উঠতে তুমিও মুহূর্তে মৃদু হাসিতে, ঝলমলিয়ে ওঠা এক মুঠো রোদ্দুর হয়ে। আয়নায় রোজ সিঁথিপাটিতে, বা মেহেদী রাঙা হাতে লুকোই তোমায় রোজ। পুকুরে ঢিল ছুড়ে জাগানো আলোড়নে এক টুকরো নীল আকাশ ঢেলে দেই, তোমার আমার পৃথিবী থেকে। হারিয়ে যেতে দেই রোজ, যদি ফিরে এসো এই তপস্যায়।

প্রাসাদে তখনও ঘুঙুর বাজে পায়ে পায়ে, প্রদীপের আলোয় হাসে কেউ বা কারা। তবলার ধ্বনি আমার বুকে করুণ কান্না হয়ে বাজে, বিলীন হই তোমার রক্তাভ নেশায় চোখ দুটোয়। নিভু নিভু প্রদীপগুলোর ছায়ায় আমি গল্প আকি নাচের আনাচেকানাচে, কাকে খুঁজে বেড়াতাম, আর কেই বা গøাসের প্রতিচ্ছবিতে এঁকেছিল আমায়।

একবার নীলপদ্ম পেতে ইচ্ছে করলো আমার, মনে পড়ে? তারায় তারায় ছড়িয়ে গেলো আমার ইচ্ছেগুলো, ঠিক যেমন রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিলে আমার। পদ্মের মেলায় নীলপদ্ম আর খোঁজা হয়নি তোমার। দমে গেলাম আমিও। নেচে গেছি ঘূর্ণিময় মিঠে সন্ধ্যা হয়ে, বিষাদের সন্ধ্যাতারা তখনো উকি দিয়েছিল তোমার আমার নীল বেদনার চার দেয়ালে। কাছে থেকেও হারিয়ে যাচ্ছিলাম আমি। ভয় করছিলাম তোমায় হারাবার। তখনো অপেক্ষা চলতো পারাবারের বুকে ঢেউ আসবে বলে। ফিসফাস শব্দে পাখিরা গেয়ে যেত তোমার হারাবার গল্প। বকুনিতে হয়তো পাখিদের ফিরিয়ে দিতাম তবুও সন্ধ্যা প্রদীপের নিষ্প্রাণ ঘ্রাণ আমায় ছাড়লো না। তোমার ছায়াহীন হবার গল্প ছড়িয়ে পড়েছিল দুলে ওঠা প্রতিটি স্বপ্ন চারায় চারায়। নীলরোদ, আমি ভুলে যেতে লাগলাম সাজঘরে যেতে। একলা ঘরে কাজল চোখে গুনগুনিয়ে সিঁথিপাটি করতে। নীলপদ্ম আর পাওয়া হলো না বুঝি আমার। এই রাজ্যে আমাদের খবর কেউ রাখেনি। কেউ ভাবেনি কোনো বিষাদের নূপুরধ্বনি তুলে রোজ হারিয়েছি আমি, কতখানি ক্ষরণ বুকে জাগিয়ে বেঁচেছি আমরা দুই পৃথিবীর চার দেয়ালে। তখনো হয়তো গেয়ে চলেছে পাখিরা ডালে ডালে, রোদ্দুরেরাও নেই থেমে উঠোন জুড়ে গড়াতে। রাজ্যজুড়ে আলোর মেলা, চারদিকে তুমি আমি তবুও দেখো, আমরা পথহারা! আমাদের ঝড় উঠেছিলো প্রণয় কাঁদিয়ে, সে খবর কেউ জানে না। আমরা গুমরে কেঁদেছি- সে খবর আগেই মিলিয়ে গেছে সবুজ ঘাসের বুকে এক বিন্দু শিশিরের মতো। অভিমানের যে দেয়াল তুলেছি আমরা, তার ব্যবধানে অপেক্ষা করেছি রোজ। অপেক্ষা করেছি একটা দীর্ঘশ্বাস শোনার, আলতো করে ছুঁয়ে দেখার বাসনায় কেটে গেছে প্রহরকাল। আমরা আর ফিরিনি, নীলরোদ। আর ফিরিনি মৃত সেই প্রাচীর টপকে। শুধু চেয়ে দেখেছি দেয়াল, দেয়ালের বুকে নিষিদ্ধ আলপনা, ছুঁতে তাকে মানা যে বড়! ডাকঘরের চিঠিরা পৌঁছে যায় ঠিকানাময়, আমাদের নিঃশব্দ কথামালাগুলো আর সাজেনি কবিতায়। তবুও ছুটে গেছিলাম আমি তোমার কাছে। হেরে গেলে! ব্যর্থ প্রেমিক তুমি। ঠিকভাবে অজুহাতও দিতে পারলে না। চলে গেলে নিঃশব্দের ঝড় বুকে নিয়ে। আর এপাড়ে আমি শুধুই একা তখন, দীর্ঘশ্বাসের আড়ালে। আমার আর নীলপদ্ম পাওয়া হলো না! তারপর আমার আর ফেরা হয়নি নাচঘরের চারদেয়াল থেকে। মুছে যায়নি আর ‘নর্তকী’ তকমাখানি। কাজলটানা চোখে এখন আমি হাজারো নীলরোদের প্রতিচ্ছায়া দেখি, ক্ষতবিক্ষত হই রোজ। অভিমানের দেয়াল ভাঙা কি এর চেয়েও কঠিন ছিল? চোখ বুঁজলে আমি দেখি তোমায় কোনো এক নীল সমুদ্রের কিনারায় বসে একলা আকাশ বুনতে। ঢেউ হয়ে ছুঁতে ইচ্ছে করে বড্ড। তোমার নয়নতারা কেমন আছে সে খবর রাখতে আজো ইচ্ছে হয় তোমার? আমার কান্নারা কি আজো কাঁপন ধরায় তোমার অধরে? শূন্য চিঠি বুকে নিয়ে তুমিও কি দীর্ঘশ্বাস লুকোও? মিথ্যে আশ্বাসে রোজ কি জানালা খুলে আকাশ দেখো? নাকি আমরা একেবারেই ফুরিয়ে গেছি ভিড়ের এই শহরে?

নীলরোদরা বুঝি এভাবেই হারিয়ে যায় অনন্তে আর নয়নতারারা রোজ হারায় বদ্ধ জলসার আলো আঁধারিতে? অহেতুক স্বপ্ন! মিঠে শাস্তি আজ কড়া চাবুক হয়ে আমাদের তাড়া করে। তবুও দেয়াল পেরোই না আমরা। অভিমানের প্রাচীরটা যে বড্ড গভীর! সোনালি সেইসব বিকেল, নীলমদের সন্ধ্যাগুলো, ঘুঙুরের বাজনার চেয়েও বড্ড ভারী।

নীলরোদ, আমরা আর ফিরবো না। হারিয়ে যেতে দিয়েছি একে অপরকে, তাই শূন্য চিঠিতেই না হয় দীর্ঘশ্বাস আড়াল করে বেচে থাকি সন্ধ্যাতারা হয়ে। আমরা আর ফিরবো না এই শহরে। এ শহর শুধুই অভিমানের, দেয়ালের এপাড় আর ওপাড় মিলিয়ে ভালো থাকার মিছে অভিনয়ের।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj